ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রিয় জেমস

প্রিয় জেমস
×

এক ফ্রেমে পার্থ বড়ুয়া, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস ও শাফিন আহমেদ

পার্থ বড়ুয়া, সংগীতশিল্পী

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো একজন মানুষ যুগের পর যুগ একই রকম আছে– এমন উদাহরণ খুঁজে বের করা খুব কঠিন। কিন্তু আমি একজনকে চিনি, যে শুরু থেকে একই রকম আছে; পরিচয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত তার খুব একটা পরিবর্তন চোখে পড়েনি। সবসময়ই বাড়িয়ে দিয়েছে বন্ধুত্বের হাত। সম্পর্ক গাঢ় হতে হতে বদলেছে সম্বোধন– ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’। সেই মানুষটি হলো ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস; গানপাগল মানুষরা যাকে নগর বাউল জেমস বলেই চেনেন। এর বাইরেও ‘গুরু’, ‘রকস্টার’ থেকে শুরু করে আরও কত যে বিশেষণ থাকে তার নামের পাশে, সেই হিসাব কষা কঠিন। কারণ একটাই, গানের ভুবনে জেমস অনেক বড় তারকা। তবে আমার মতো কিছু মানুষের কাছে সংগীত সহযোদ্ধার পাশাপাশি বিশেষ একজন, যার কাছে প্রাণ খুলে বলা যায় সব কথা; ভাগাভাগি করে নেওয়া যায় সুখ-দুঃখ। জেমস নামে সেই বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় আশির দশকের দ্বিতীয় ভাগে; কৈশোরের খোলস ছেড়ে তারুণ্যে পা রাখা এই আমরা অনেকে যখন, সংগীত সৃষ্টির নেশায় আসক্ত। জেমসের সঙ্গে সাক্ষাৎ ফান্টির [দেশের স্বনামধন্য ড্রামার এহসান এলাহী] মাধ্যমে। ‘জেমস, ও হলো পার্থ, ভালো কি-বোর্ড বাজায়। অনেক দিন ধরে আমরা একসঙ্গে প্র্যাকটিস করছি।’ ঠিক এভাবেই ফান্টি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল জেমসের সঙ্গে। জেমসের মুখে ছিল এক চিলতে হাসি, যে হাসিতে সে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আমার সম্পর্কে কিছুটা জানাশোনা আছে। ফান্টির সঙ্গে বন্ধুত্বটা কত গাঢ়– তা কথায় বলে বোঝানো যাবে না। নতুন কী করা যায়, আর কী শেখা যেতে পারে, এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম দুই বন্ধু। এই আমি যেমন সুযোগ পেলেই গিটারের তালিম নিতে ছুটে যেতাম বাচ্চু ভাইয়ের [আইয়ুব বাচ্চু] কাছে; তেমনি ফান্টিও। ছুটত কোনো না কোনো মিউজিশিয়ানের কাছে। এভাবেই দিন কাটছিল আমাদের। একদিন শুনলাম, ফান্টি ফিলিংসে ড্রামার হিসেবে যোগ দিয়েছে। শুনে খুশি হয়েছিলাম। তখন আমি ‘ম্যাসেজ’ ব্যান্ডে যোগ দিইনি। ‘সোলস’ ব্যান্ডে যোগ দেওয়া আরও পড়ে। মাঝে সেই সময়গুলোতে গানে গানে চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়িয়েছি। কি-বোর্ড ছিল নিত্যদিনের বাদ্যযন্ত্র। মূলত কি-বোর্ডিস্ট হিসেবে আমার যা কিছ পরিচিতি। সেই সুবাদে ফিলিংসে অতিথি হিসেবে বাজানোর ডাক পেয়েছিলাম। 

গিটারে জেমস, ড্রামসে ফান্টি আর কি-বোর্ডে আমি এবং সঙ্গে ফিলিংসের বেইজ গিটারিস্ট সম্ভবত আলী মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মিউজিক করে গেছি। এভাবেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনের পর দিন আমরা প্র্যাকটিস করে গেছি। ব্যান্ডসংগীতের প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এতটুকু ছাড় দিইনি। নব্বই দশকের শুরুতেও ভাবিনি, সময় আমাদের পরিচয় কীভাবে তুলে ধরবে। জেমস তখনও ফিলিংসে বাজায়, আমি যোগ দিয়েছি সোলসে। চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছে জেমস। আমি তখনও সেখানেই পড়ে আছি। একদিন বাচ্চু ভাই [আইয়ুব বাচ্চু] বলল, চল ঢাকায় যাই, গান নিয়েই নতুনভাবে শুরু করি জীবনযুদ্ধ। বাচ্চু ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকা এসে সত্যিই জীবন যাবে, কল্পনাও করিনি। যদিও অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। জীবিকার তাগিদে কত শিল্পীর সঙ্গে যে কাজ করতে হয়েছে, তাঁর লেখাজোখা নেই। সেই সময়ে অনেকে ব্যান্ডেও  অতিথি কি-বোর্ডিস্ট হিসেবে বাজিয়েছি। এই নিয়েই যখন দিন কাটছিল, তখন আবার জেমসের সঙ্গে দেখা। ওর বাবা মোজাম্মেল হোসেন ছিলেন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান। বাসা ছিল পুরোনো পাসপোর্ট অফিসের পাশে। ওদিকে সুযোগ পেলে আড্ডায় বসতাম আমরা। গানের বাইরে রাজ্যের যত বিষয় আছে, তা নিয়ে গল্পের ঝাঁপি খুলতাম। এমনিতে জেমসকে সবাই দেখেন, জেমস কথাবার্তা খুব কম বলে। কিন্তু তারা জানেন না, আড্ডায় বসলে এই মানুষটি কীভাবে আসর জমিয়ে ফেলে। এভাবে গল্প-আড্ডার মাঝ থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয় নানা ধরনের অ্যালবামের পরিকল্পনা। আর্কের আশিকউজ্জামান টুলুর কাছ থেকে আসে দেশের প্রথম মিক্সড অ্যালবাম ‘স্টারস’-এ গান গাওয়ার প্রস্তাব। পরের বছর কেউডেন্স ব্যান্ডের আলী আফজাল নিকোলাস শোনান, সাত গিটারিস্টকে নিয়ে মিক্সড অ্যালবামের পরিকল্পনা। ‘টুগেদার’ নামে সেই অ্যালবামে প্রথম আমি আর জেমস একসঙ্গে কাজ করি। আমার কণ্ঠে রেকর্ড হয়, ‘চাই না তোমাকে’ আর ‘যন্ত্রণা’ শিরোনামে দুটি গান। জেমস গায় তার বিখ্যাত ‘পলাশীর প্রান্তর’ গানটি। এর কাজ শেষ হতে না হতেই স্টুডিওতে তার কণ্ঠে রেকর্ড হতে থাকে বিষাদী আর্তনাদমাখা গান ‘নাটোর স্টেশন’। চেনা ভুবনে মানুষ কীভাবে একজন মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়ার কথাগুলো জেমস বলেছে ঠিক এভাবে, ‘হায় চিরচেনা প্রিয় এই স্টেশনে, কেউ আমাকে চিনল না....।’ 

আরও পড়ুন

×