ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

পুতুলগুলো তাদের ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গেল...

পুতুলগুলো তাদের ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গেল...
×

ষাট-সত্তর দশকের নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে আড্ডা-অনুষ্ঠানে [বাঁ থেকে] উজ্জ্বল, ফরিদুর রেজা সাগর, আলমগীর, ববিতা, সুচন্দা, শবনম ও আবদুর রহমান

ফরিদুর রেজা সাগর

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ১৫:২৯ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ | ১৫:৩৪

যাদের আমরা পর্দায় দেখি–পর্দা মানে সিনেমা, নাটক, ইউটিউব, টেলিভিশন কিংবা যে কোনো ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে। সারাজীবন যাদের আলোছায়ায় দেখেছি, তারা যখন বাস্তবে আমাদের সামনে আসেন তখন অন্যরকম মনে হয়। তখন বুঝি তারাও তো আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদেরও সুখ আছে, দুঃখ আছে, আছে আনন্দ বেদনা। আমরা তাদের পর্দায় দেখি অসত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করতে দেখি।

দেশকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেসব কাজ করতে। আমাদের দেশে যেসব নাটক সিনেমা তৈরি হয়, সেগুলোর কাহিনি মূলত এমনই থাকে। আবার কিছু কাহিনি থাকে প্রেম ভালোবাসা নিয়ে। এই ভালোবাসার গল্প শাশ্বত প্রেমের গল্প। কখনও চিরায়ত কোনো লোককাহিনি নিয়েও তৈরি হয় সিনেমা, নাটক। আমরা তেমনই কাহিনি দেখেছি–শিরি ফরহাদ, লাইলী মজনু, রহিম বাদশা, কমলার বনবাস, মধুমালার মতো সিনেমায়। আবার টেলিভিশনে আরব্য রজনীর কাহিনি নিয়ে তৈরি হয়েছে সিন্দাবাদের মতো চরিত্র।

শুধু যে আমাদের দেশেই এমন কাহিনি তৈরি হয়েছে তাই নয়। নিউইয়র্কের পটভূমিতেও আলাদিন কিংবা আরব্য রজনীর কাহিনি নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে শো হচ্ছে। সেখানেও আলোছায়ার একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এই আলোছায়ার কথা বারবার মনে হওয়ার কারণ কতগুলো পুতুল। আমার ঘরে প্রচুর পুতুল রয়েছে। কিছু আছে কাপড়ের পুতুল। একসঙ্গে অনেক পুতুল দেখতেও আনন্দ লাগে। পুতুল যে শুধু ছোটদেরই আনন্দ দেয় তা কিন্তু নয়; বড়দেরও আনন্দ দেয়। ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নেয়।

সম্প্রতি সাংবাদিক আবদুর রহমান ষাট-সত্তর দশকের নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে একটি আড্ডা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। অবাক কাণ্ড! যে পাঁচজন এসেছিলেন, তাদের ভেতর দুজন ছিলেন সহোদরা। বাকিরা বললেন–তাদের কারও কারও সঙ্গে দেখা হলো অনেক দিন পর। এমনকি এই আধুনিক প্রযুক্তির সময়ে মোবাইল ফোনেও কথা হয় না। তাদের অনেক কথা, অনেক স্মৃতি।

স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেন তারা। উপস্থিত হয়েছিলেন–নায়ক উজ্জ্বল, আলমগীর, নায়িকা শবনম, সুচন্দা এবং ববিতা। তারা আড্ডায় হারিয়ে গেলেন তাদের সেই সোনালি সময়ে। একসময়ে কী দুর্দান্ত অভিনয়ে দর্শকদের তারা মাতিয়ে রাখতেন। তারা দর্শকদের স্বপ্নের মানুষ ছিলেন। আড্ডার এক পর্যায়ে আমি তাদের পুতুল উপহার দিলাম। পুতুল পেয়ে তারা অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে উঠলেন। খায়রুল ইসলাম তুফান তাদের এই স্মৃতি নিয়ে একটি অনুষ্ঠানও বানিয়েছিল। কিন্তু পুতুল পেয়ে তারা যে আনন্দ পেলেন, সেটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নিজেরা যেমন আনন্দ পেলেন, তেমনি তাদের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করতে চান। তারা বোঝাতে চান–এই পুতুলগুলো তাদের আনন্দের একটি বড় উপলক্ষ। তাদের প্রত্যেকের হাতেই পুতুল।

কারও হাতে হাতি, কারও বা ঘোড়া, মিষ্টি কুমড়োসহ নানানরকম পুতুল। এই পুতুলগুলো তাদের ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। তারা এই স্মৃতিগুলো যখন বাসায় গিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেবেন, তখন তাদেরও মনে হবে এই যে আলোছায়ার মানুষগুলো পর্দার বাইরের মানুষ, তাদেরও একটা সুন্দর ছেলেবেলা রয়েছে। একটা সুন্দর ছেলেবেলা ছিল; তাদেরও পুতুল খেলার দিন ছিল। আসলেই পুতুল খেলার দিনগুলোই আমাদের প্রত্যেকের জীবনে শ্রেষ্ঠ সময়ের একটি।

সেই সময়ে আমরা যেমন পুতুল নিয়ে মারামারি করতে ভালোবাসি, তেমনি একে অপরকে উপহার দিতেও ভালোবাসি। এই উপহার একদিন নিয়ে যাবে দেশ গড়ার প্রচেষ্টার দিকে। কারণ, যেমন আমরা পুতুল ভালোবাসি, তেমন আমরা খেলনা ভালোবাসি। যত আমরা বয়সে বড় হব, ততই আমরা বুঝতে শিখব এই দেশটা আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা; যেখানে আমরা বেড়ে উঠছি। সুতরাং সেই ভূমির জন্য আমাদের মনে রাখতেই হবে সবার আগে আমাদের এই বাংলাদেশ। পুতুল খেলা শুধু একটা প্রতীক।

ছোটবেলাটা অনেক আনন্দময়, গদ্যময়, কাব্যময়। বড় হলেও আমরা বলি ছোটবেলায় ভালো ছিলাম। আর ছোটবেলায় আমরা স্বপ্ন দেখি বড় হয়ে আমরা আরও ভালো থাকব। আসলেই কোনটা আলো, কোনটা ছায়া, কোনটা অন্ধকার এগুলো যদি আমরা হিসাব করতে বসি, তাহলে দেখব আমাদের জীবনে এ সবকিছুই ছিল। ছায়ার মানুষগুলো যখন জীবন্ত হয়ে আমাদের সামনে আসে, তখন মনে হয় আরে এই মানুষটা তো আমারই মতো।

আমার যেমন হাতে চিমটি কাটলে ব্যথা লাগে, এই মানুষগুলোরও ঠিক তাই লাগে। আমি যেমন একটি সুন্দর ফুল দেখে আনন্দিত হই, এই মানুষগুলোও ঠিক তাই হয়। আসলে আমরা সবাই যেখানে যেভাবেই থাকি না কেন, সবারই একটা লক্ষ্য থাকে–সেটি হলো আমি ভালো থাকব। আমি ভালো থাকলে পাশের মানুষটিকে ভালো রাখার চেষ্টা করব। আর পাশের মানুষটি যদি ভালো থাকে, তাহলে সে আমাকে ভালো রাখার চেষ্টা করবে। এই অনুভূতিটা যদি আমাদের থাকে তাহলে আমরা বুঝব, আমরা আমাদের নিজেদের ভালোবাসি। আমরা আমাদের সমাজকে ভালোবাসি। আমরা আমাদের এই বাংলাদেশকে ভালোবাসি।

আরও পড়ুন

×