ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইত্যাদি এখনো প্রেরণার বাতিঘর

ইত্যাদি এখনো প্রেরণার বাতিঘর
×

কোলাজ: সমকাল

মুহাম্মদ আবু সাঈদ

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৩৬ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৩৭

কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে রয়েছে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে–তথ্যবহুল প্রতিবেদন, বাস্তবধর্মী ও শিক্ষামূলক নাট্যাংশ, নৃত্য, গান, দর্শক পর্ব–সব মিলিয়ে অনন্য দর্শকনন্দিত অনুষ্ঠান ইত্যাদি। সমাজের ছোট-বড় অসংগতি দুর্দান্ত মুনশিয়ানায় উঠে আসে নন্দিত নির্মাতা হানিফ সংকেতের হাত ধরে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। লক্ষ্মীপুরের এক সুপ্রাচীন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধারণকৃত এবারের পর্বটিও ছিল প্রশংসনীয়।

দেশের প্রথম নারী এভারেস্টজয়ী নিশাত মজুমদারের উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি লক্ষ্মীপুরের সন্তান। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন এক উৎসাহ-জাগানিয়া অসাধারণ অনুপ্রেরণার গল্প। তাঁর মতে, মানুষ কখনও পর্বত জয় করতে পারে না। মানুষ জয় করে নিজেকে, নিজের প্রতিবন্ধকতাকে। কী অদ্ভুত সত্য বলেছেন তিনি! আমাদের উপমহাদেশে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করা এক নারী তাঁর এক বক্তব্যে বলেছিলেন, কখনও কখনও সমস্যা বড় হয় না; বরং আমরাই ছোট হয়ে যাই। এই যে আমাদের সীমাবদ্ধতাকে জয় করার অকুতোভয় এক বার্তা উঠে এলো এবারের ইত্যাদিতে, কোটি কোটি মানুষকে যে এটি প্রেরণা জোগাবে তাতে সন্দেহ নেই। 

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ইত্যাদির এবারের প্রতিবেদনটি বেশ উৎসাহমূলক। চট্টগ্রাম বিভাগে এবার নির্বাচিত সেরা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। নাম পশ্চিম আঙ্গারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাঠের নানা আকর্ষণীয় উপকরণ, মানসম্মত পাঠদান পদ্ধতিসহ বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে এ প্রতিবেদনে। শিক্ষা নিয়ে ইত্যাদির আয়োজন এর আগেও আমরা দেখেছি। সাম্প্রতিক কিছু পর্বে একাধিক নাট্যাংশও প্রচার করা হয়েছে, যেগুলো ছিল একদিকে কটাক্ষপূর্ণ, অন্যদিকে গভীর বার্তাবাহক। স্কুলে ভর্তিতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, মফস্বলের স্কুলগুলো থেকে ভালো ফল করা দৃষ্টান্তও এতে তুলে ধরা হয়েছে।

আবার সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার শুধু যে তরুণরা করছে তা নয়। অভিভাবকদের নিয়ে করা এবারের একটি নাট্যাংশে সেই সচেতনতার কথাও বলা হয়েছে। সন্তানের পড়াশোনার সময় তার সামনে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার না করার বিষয়টি যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর আতঙ্কের বিষয়টি তুলে এনে কঠিন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুবই প্রাসঙ্গিক। সেটি হলো খোলস বদলে ফেলা, অর্থাৎ মুখ একটি কিন্তু মুখোশ অগণিত। সময়ের পালাবদলে মুখোশ ও নীতি বদলে যাওয়া নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যময় একটি নাট্যাংশ দেখানো হয়েছে। টেলিভিশনের নাম পিপিটিভি–প্রাইভেট পাবলিসিটি টিভি, অর্থাৎ পারিবারিক প্রচার টিভি। এর স্লোগান হলো–‘যখন যার, তখন তার’। পৃথিবীর বহু জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল রয়েছে, যেগুলোর মালিক কে সেটাই আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যতিক্রম। কিছু কিছু চ্যানেলের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত প্রচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে ইত্যাদির এই নাট্যাংশ একেবারে বাস্তবতাপূর্ণ।     

সমাজের এমনই নানা দিক তুলে ধরার পাশাপাশি ইত্যাদি ভুলে যায় না প্রান্তিক মানুষের কথা। যাদের জীবন কাটে অনিশ্চয়তায়, যারা একবেলা খেয়ে জানেন না আরেক বেলা কী খাবেন। ইত্যাদির গত ৩৮ বছরের পথচলায় এমন অজস্র মানুষের সাদাকালো জীবনের মায়াময় কথা উঠে এসেছে। মানুষ জেনেছে, অশ্রুসিক্ত হয়েছে, জীবনবোধে আলোড়িত হয়েছে বহুবার। এবারের মানুষটি ‘মজনু মাঝি’। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যে মানুষটি মেঘনার বুকে যেতেন মাছ ধরতে, কালের পরিক্রমায় তিনি এখন অচলপ্রায়।

প্রকৃতির অব্যর্থ নিয়মে মানুষের শারীরিক পরিণতি এমনই হবে। কিন্তু মজনু মাঝির জীবনকথা অন্যরকম। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষটির পাঁচ ছেলের মধ্যে চারজনই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পাড়ি জমায় পরপারে। আর অথৈ সাগরে পড়েন তিনি। সাগরের ‘বিকন আলোর’ মতোই ইত্যাদি ছুটে গেছে তাঁর দুয়ারে। কিছুটা আর্থিক সহযোগিতা করেছে একজন মজনু মিয়াকে, কিন্তু হাজারো মজনু মিয়ার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা জেগে উঠেছে লাখো মানুষের। সেই ‘বিকন আলোর’ দ্যুতি প্রেরণা হয়ে পৌঁছে গেছে মানুষের মনের বন্ধ দরজায়। আসলে এমনই নানা আয়োজনে হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে গেছে এবারের ইত্যাদি। কী দর্শক পর্ব, কী নাতির পর্ব, বিদেশি পর্ব, নাট্যাংশ, নৃত্য, দুজন নারী শিল্পীর ব্যতিক্রমী দ্বৈতগান–সবই ছিল অনন্য, অসাধারণ।
 

আরও পড়ুন

×