ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

জীবনের প্রতিটি বাঁকে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন শাহরুখ

জীবনের প্রতিটি বাঁকে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন শাহরুখ
×
×

শাহরুখ খান

মীর সামী

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৩:১১

কখনও চোখের চাহনিতে প্রেমের জাদু ছড়িয়েছেন, কখনও খলনায়কের ভয়ংকররূপে আবার কখনও অ্যাকশন হিরো হয়ে পর্দা কাঁপিয়েছেন। চরিত্র বদলেছে, বদলেছে সময়, বদলেছে বলিউডের সিনেমার ধরন; কিন্তু শাহরুখ খানের তারকাখ্যাতিতে এতটুকুও ভাটা পড়েনি; বরং প্রতিটি বাঁকে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন তিনি।

ক্যারিয়ারের শুরুতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় আসা এই অভিনেতাই একসময় হয়ে উঠেছেন রোমান্সের প্রতীক। সেই পরিচয়ের গণ্ডি ভেঙে আবার ফিরেছেন অ্যাকশন অবতারে। মাঝে এসেছে ব্যর্থতা, সমালোচনা ও দীর্ঘ বিরতি। তবু হারিয়ে যাননি; বরং প্রতিটি পতনকে পরিণত করেছেন নতুন উত্থানের সোপানে। আজ ২ নভেম্বর, ৬১ বছরে পা রাখলেন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান।

তিন দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছেন। প্রতিটি সময়েই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। তাই শাহরুখ খানের গল্প কেবল একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; এটি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া, ব্যর্থতা মেনে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো এবং দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার গল্প।

দিল্লির এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। ১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হলেও শাহরুখের অভিনয়জীবনের শুরু টেলিভিশনে। ‘ফৌজি’ ও ‘সার্কাস’ নামে টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করে পরিচিতি পান তিনি। তবে চলচ্চিত্রে এসে শুরুতেই প্রচলিত নায়কের পথ অনুসরণ করেননি। ‘দিওয়ানা’র পর ‘বাজিগর’, ‘ডর’ ও ‘আনজাম’-এর মতো ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেন। তখন বলিউডের প্রচলিত ধারণায় নায়কের পরিচয় ছিল ইতিবাচক চরিত্রে। সেই ধারণা ভেঙে শাহরুখ দেখিয়েছিলেন, একজন অভিনেতা চাইলে খলচরিত্রেও দর্শকের মনোযোগের কেন্দ্র হতে পারেন। ‘বাজিগর’-এ প্রতিশোধপরায়ণ অজয়, ‘ডর’-এ একতরফা প্রেমে উন্মত্ত রাহুল কিংবা ‘আনজাম’-এর বিজয়– প্রতিটি চরিত্রেই ছিল আলাদা অভিনয়ভঙ্গি। ঝুঁকি নেওয়ার এই প্রবণতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

তবে তাঁর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় অধ্যায় তৈরি হয় রোমান্টিক ঘরানার সিনেমায়। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ শাহরুখের ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। রাজ চরিত্রে তাঁর অভিনয় তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রেমের এক নতুন ভাষা তৈরি করেছিল।

এরপর ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘মোহাব্বতে’, ‘কাভি খুশি কাভি গম’, ‘কাল হো না হো’ ও ‘বীর-জারা’র মতো ছবিতে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেন। তাঁর হাসি, চোখের অভিব্যক্তি, হাত প্রসারিত করে দাঁড়ানোর ভঙ্গি– সবই হয়ে ওঠে জনপ্রিয়। পর্দার প্রেমিক শাহরুখ যেন দর্শকের কল্পনারও একজন হয়ে ওঠেন। কিন্তু একই ধরনের চরিত্রে আটকে থাকতে চাননি তিনি। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে যখন তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে, তখনই অভিনয়ের অন্যদিক দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

‘স্বদেশ’-এ মোহন ভার্গব চরিত্রে একজন প্রবাসী বিজ্ঞানীর স্বদেশে ফিরে আসার দ্বন্দ্ব তুলে ধরেন। ‘চাক দে! ইন্ডিয়া’তে কবির খান হয়ে নারী হকি দলের কোচের দায়িত্ব নেন। সেখানে তাঁর অভিনয়ে ছিল সংযম, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের প্রকাশ। ‘মাই নেম ইজ খান’-এ রিজওয়ান খানের চরিত্রে সামাজিক বৈষম্য ও পরিচয়ের সংকটকে সামনে আনেন। আবার ‘ডিয়ার জিন্দেগি’তে মনোবিদের ভূমিকায় জীবন, সম্পর্ক ও মানসিক জটিলতা নিয়ে কথা বলেন। এসব ছবিতে শাহরুখের অভিনয় প্রমাণ করে, তারকাখ্যাতির বাইরে চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার সামর্থ্যও তাঁর রয়েছে।

শাহরুখের ক্যারিয়ারে ব্যর্থতার অধ্যায়ও কম নয়। বিশেষ করে ‘ফ্যান’, ‘জব হ্যারি মেট সেজল’ ও ‘জিরো’ নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ২০১৮ সালে ‘জিরো’ মুক্তির পর দীর্ঘ বিরতি নেন তিনি। এই বিরতিকে অনেকে ক্যারিয়ারের সংকট হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু শাহরুখের কাছে সেটি ছিল নতুন করে ভাবার সময়। কোন ধরনের গল্পে ফিরবেন, দর্শক তাঁকে কীভাবে দেখতে চান– এসব প্রশ্ন নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেন। পর্দা থেকে দূরে থাকলেও দর্শকের আগ্রহ থেকে হারিয়ে যাননি।

২০২৩ সালে ‘পাঠান’ দিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল আলোচিত। দীর্ঘ বিরতির পর অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে হাজির হয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও নিজের গ্রহণযোগ্যতা জানান দেন। একই বছর ‘জওয়ান’ ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে আবারও আলোচনায় আসেন। এরপর ‘ডানকি’তে অভিবাসন ও স্বপ্নপূরণের গল্পে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। এই তিনটি ছবির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, শাহরুখ কেবল পুরোনো জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করতে চান না; সময়ের দর্শক, গল্প ও নির্মাণশৈলীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের অবস্থান নতুন করে তৈরি করতে জানেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন শাহরুখ। স্ত্রী গৌরী খানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছেন রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট। ক্রিকেটেও রয়েছে তাঁর বিনিয়োগ। আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের অন্যতম কর্ণধার তিনি। ফলে অভিনয়ের বাইরে বিনোদন ও ব্যবসার জগতেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন। তবে এসব পরিচয়ের মধ্যেও তাঁর প্রধান পরিচয় অভিনেতা। 

শাহরুখের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ তাঁর দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন। সামাজিক মাধ্যমে ভক্তদের সঙ্গে কথোপকথন, জন্মদিনে মান্নাতের সামনে উপস্থিত হওয়া হাজারো মানুষের অভিবাদন কিংবা সিনেমা মুক্তির সময় দর্শকের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সংযোগ– সবকিছুতেই তারকা ও দর্শকের দূরত্ব কমে আসে।

ব্যক্তিজীবনেও শাহরুখের পথচলায় রয়েছে নানা অধ্যায়। গৌরী খানের সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্য, সন্তান আরিয়ান, সুহানা ও আব্রামের সঙ্গে সম্পর্ক। এসব তাঁকে তারকাখ্যাতির বাইরে একজন পারিবারিক মানুষ হিসেবেও পরিচিত করেছে। ব্যক্তিগত জীবনের নানা কঠিন সময়েও কাজের প্রতি তাঁর মনোযোগ আলোচনায় এসেছে। তবে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ক্ষেত্রে বরাবরই রসবোধ ও আত্মবিশ্বাসকে সামনে রাখেন তিনি।

৬১ বছরে দাঁড়িয়ে শাহরুখের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। তাঁর পরবর্তী সিনেমা ‘কিং’ নিয়ে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রজন্মের নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের পরবর্তী অধ্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বুঝিয়েছেন, জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য শুধু পরিচিত ইমেজ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সময়ের দাবি বুঝে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা।

একসময় যে তরুণ অভিনয় জগতে এসেছিলেন কেবল এক বছরের জন্য কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে, তিনিই আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক নাম। সময় বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে; সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েই শাহরুখ খান হয়ে উঠেছেন সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া এক বাদশাহ।

আরও পড়ুন

×