সাক্ষাৎকার: জুনুন
‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যান্ড চর্চা কম হয়'
পাকিস্তানি জুনুন ব্যান্ডের তিন সদস্য। ছবি: নাজমুল হোসাইন হিমেল
সমু সাহা
প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ০১:৪৫ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ০১:৫২
'বাংলাদেশের এত মানুষ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত, যা দেখে যে কেউ অবাক হবেন। আমরাও অবাক হয়েছি। এদেশের গানে যে বৈচিত্র্য, সেটাও আমাদের মুগ্ধ করে। কিছুদিন আগে এদেশের একটি চ্যানেলে কিছু গান দেখেছিলাম। তা দেখে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে- এদেশে সংগীত নিয়ে ভালো কাজ হচ্ছে। নতুন কিছু সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা প্রত্যেকের মধ্যেই দেখেছি। আর এটিই প্রয়োজন।' ঢাকা সফরে এসে এমন কথা শোনা গেল পাকিস্তানের জনপ্রিয় ব্যান্ড জুনুনের সদস্যদের কণ্ঠে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংগীত ও গানপাগল মানুষ নিয়ে প্রশংসা শোনা গেছে তাদের মুখে। গতকাল 'ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯'-এর শেষ রজনীতে পারফর্ম করে ব্যান্ড জুনুন। এর আগে ঢাকার এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপে অংশ নেন এই ব্যান্ডের তিন সদস্য- সালমান আহমেদ, ব্রায়ান ও'কন্নেল ও আলি আজমত। তারা বলেন, 'সুফি গানে যে কালাম আছে, তা খুব সহজেই মনকে নাড়া দেয়। আল্লামা ইকবাল, বুন্দেহ শাহসহ আরও যত সুফি গানের সাধক আছেন, তাদের সবার গানেই বিষয়টি স্পষ্ট। পাকিস্তানি সংগীতের শক্তিশালী দিক এই সুফি গান। আমরা যারা বিশ্বের নানা প্রান্তে এই সংগীত ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি, তারা সমকালীন জনপ্রিয় সংগীতের ধারাকেই বেছে নিয়েছি।'
প্রশ্ন :এবারের ঢাকা সফরের অনুভূতি জানতে চাই...
উত্তর : ঢাকা সবসময় আমাদের প্রিয় শহরগুলোর একটি। এখানে আসতে আমাদের বরাবরই ভালো লাগে। তবে এবারের সফরটি একটু হলেও ভিন্নরকম। কারণ এবার আমাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যও এসেছেন। তারা চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার দর্শকের সামনে আমাদের পরিবেশনা দেখবেন। একই সঙ্গে দেখার সুযোগ পাবেন আমাদের গান নিয়ে এ দেশের দর্শকের প্রতিক্রিয়া কী।
প্রশ্ন : এর আগেও তো ঢাকায় এসেছেন?
উত্তর :হ্যাঁ, প্রায় পাঁচ বছর আগে এসেছিলাম। তবে এবার এসে সবকিছুই নতুন মনে হচ্ছে। এ শহরে অনেক নতুনত্ব এসেছে। আগেরবারের টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি মনে আছে। রিকশায় শহরে ঘুরেছিলাম। তখন শহরটা ছোট ছিল। এখন এত বড় হয়েছে, রিকশায় ঘুরতে বোধ হয় সারাদিন লেগে যাবে।
প্রশ্ন : 'ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯'-এ অংশ নেওয়ার ভাবনা কীভাবে মাথায় এলো?
উত্তর : এ আন্তর্জাতিক উৎসব সম্পর্কে সারাবিশ্বে সবার ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের মধ্যেও ঢাকার এই উৎসব ভিন্নরকম মর্যাদা পেয়েছে। এর আগেও বেশ কিছু পাকিস্তানি ব্যান্ড ও শিল্পী এখানে পারফর্ম করেছেন। তাদের কাছে এ আয়োজন নিয়ে অনেক ইতিবাচক কথা শুনেছি। তাই এবার যখন আমাদের দলকে প্রস্তাব জানানো হলো, খুব সাদরেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি। সত্যি বলতে, এ উৎসবে অংশ নিতে পেরে আমরা আনন্দিত।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের সংগীত ভুবন নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
উত্তর : এ দেশ গানের জন্য বিখ্যাত। বাংলাদেশের এত মানুষ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত, যা দেখে বিশ্বের যে কোনো মানুষ অবাক হবেন। আমরাও অবাক হয়েছি। এদেশের গানে যে বৈচিত্র্য, সেটাও আমাদের মুগ্ধ করে। কিছুদিন আগে এদেশের একটি চ্যানেলে কিছু গান দেখেছিলাম। তা দেখে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, এদেশে সংগীত নিয়ে ভালো কাজ হচ্ছে। নতুন কিছু সৃষ্টি করার চেষ্টা প্রত্যেকের মধ্যেই দেখেছি। তাদের দেখে বুঝলাম, সংগীত নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম নতুনভাবে ভাবছে। আর এটিই প্রয়োজন। প্রতিটি সময়ের মানুষ একই গানকে ভিন্নভাবে ধারণ করে। আর সে জন্য একটি গানের আবেদন যুগের পর যুগ টিকে থাকে।
প্রশ্ন : দক্ষিণ এশিয়ার মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন ধরে 'জুনুন' স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। এ অঞ্চলের বর্তমান সংগীতচর্চা নিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন কী?
উত্তর : শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, সারাবিশ্বের সংগীত ইন্ডাস্ট্রিতে একধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন অনেক আধুনিক প্রযুক্তি গানে ব্যবহূত হচ্ছে। এটিকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি। তবে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যান্ড চর্চা তুলনামূলক কম হয়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো বলিউডের গান দ্বারা প্রভাবিত। তবে ভারতে এখন কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সিনেমার বাইরেও অনেক অপরিচিত শিল্পী সামনে আসছেন। শ্রোতারা তাদের গান গ্রহণও করছেন। এখন ভারতেও আগের চাইতে অনেক বেশি কনসার্ট হয়। ভৌগোলিক অবস্থার কারণে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। তবে আগেই বলেছি, তাদের ইন্ডাস্ট্রিতে পরিবর্তন আসছে।
প্রশ্ন : মাঝে 'জুনুন' ব্যান্ড ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে গেলেও গত বছর আপনাদের দলের সদস্যরা আবারও একত্র হয়েছেন। নতুন কোনো গান প্রকাশের পরিকল্পনা আছে?
উত্তর : অবশ্যই। আমরা এ নিয়ে কাজও করছি। আশা করছি, আগামী বছর বেশ কয়েকটি নতুন গান আমরা প্রকাশ করব। কারণ ত্রিশ বছরে যে যাত্রা, তার গতি হঠাৎ করেই স্তিমিত হয়ে যাবে, আমরা তা চাই না।
প্রশ্ন : আপনারা শুরু থেকে সুফি গানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু সুফির সঙ্গে রক ফিউশন করার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে?
উত্তর : সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গেলে পরিবর্তন আনা জরুরি বলেই আমরা মনে করি। সুফি গানে যে কালাম আছে, তা খুব সহজেই মনকে নাড়া দেয়। আল্লামা ইকবাল, বুন্দেহ শাহসহ আরও যত সুফি গানের সাধক আছেন, তাদের সবার গানেই বিষয়টি স্পষ্ট। এক কথায় সুফি গান পাকিস্তানি সংগীতের শক্তি। তাই আমরা যারা বিশ্বের নানা প্রান্তে এই সংগীত ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি, তারা সমকালীন জনপ্রিয় সংগীতের ধারাকেই বেছে নিয়েছি। অনেকে সফল হয়েছেন, অনেকে ব্যর্থ। সুফির সঙ্গে রকের ফিউশন করে আমরা শ্রোতার মনে নাড়া দিতে পেরেছি বলেই এটাকে নিজস্ব গানের ধরন করে নিয়েছি।
- বিষয় :
- জুনুন
- সাক্ষাৎকার