ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

কিম কি দুক: সিনেমার এক অনন্য কবি

কিম কি দুক: সিনেমার এক অনন্য কবি
×

উপমা পারভীন

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৬:২০

মানুষের অ্যাবসেন্সকে সিনেমার ফ্রেমে ফ্রেমে সুর, সংগীত, শব্দ, দৃশ্য, স্থান প্রভৃতি দিয়ে পরাবাস্তবতার রূপ দেওয়ার কারিগর ছিলেন প্রখ্যাত কোরিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা কিম কি দুক। মাত্র ৫৯ বছর বয়সেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন বিশ্বনন্দিত এই চিত্র পরিচালক। মানুষের জীবনের ভেতরে আরেকটা জীবন থাকতে পারে, সে জীবন হয়তো আনমনে নিজের কষ্টগুলোর উপলব্ধি করতে শেখায়। এভাবেই তিনি সিনেমার পর্দায় কবিতা লিখে গেছেন।

তার পরিচালিত বেশিরভাগ সিনেমার গল্পই মানবিক। কিম সব সময় মনে করতেন, 'অর্থ চলচ্চিত্রের পরিসরকে বড় করতে পারে। কিন্তু চরিত্রের আবেগকে অর্থপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলাই একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে বিপুল বিনিয়োগ ছাড়াই চলচ্চিত্রের পরিসর বাড়িয়ে তোলা যায়। ছবিতে যদি কোনো গল্প না থাকে, নাটকীয়তা না থাকে, তাহলে চলচ্চিত্র হিসেবে এর কোনো মূল্য থাকে না।'

আধুনিক সমাজকে চলমান ট্রেনের মতো দেখা কিম কি দুক মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রত্যাশার সহাবস্থান নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তার শিল্পে। তাই তো তিনি প্রায়ই বলতেন, 'আমার প্রতিটি চলচ্চিত্রই আমার দিনলিপি। প্রতিটি চলচ্চিত্রই আমার জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময়ের ডায়েরি। তাই মুছতেও পারি না, আবার উপেক্ষাও করতে পারি না। যখন আমি আমার অতীত স্মরণ করতে চাই, তখন আমার চলচ্চিত্রগুলো দেখি।'

সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে দৃশ্যপটের সঙ্গে কোনো রকম আপস করতেন না কিম কি দুক। সাহসিকতার সঙ্গেই বারবার তুলে ধরেছেন নৃশংসতাকে। তার সিনেমায় বারবার ধরা দিয়েছে এক অন্য বাস্তবতা, যা শুধু দর্শকদের নয়, ভাবিত করেছে অন্য চলচ্চিত্র পরিচালকদেরও।

কিম কি দুকের জন্ম দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তর গেয়োংসাং প্রদেশে ১৯৬০ সালের ২০ ডিসেম্বর। ছোট্ট পার্বত্য শহর বোক্সেঘায়াতে বেড়ে ওঠা। মাত্র ৯ বছর বয়সেই সেখান থেকে চলে আসেন সেওলে। ছোটবেলা থেকেই খুব সামনে থেকে দারিদ্র্যকে দেখেছেন। অভাব-অনটন ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। নতুন শহর সেওলে এসে সেভাবে সুযোগ হলো না পড়াশোনারও। বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। স্কুল ছেড়ে কাজ শুরু করলেন এক কারখানায়। তবে সেই চাকরিও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তারপর ২০ বছর বয়সে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন কিম। পরবর্তীকালে কোরিয়ার সীমান্তবর্তী একটি গির্জার সুরক্ষায় কর্মরত ছিলেন তিনি। সেখানে অন্ধ সন্ন্যাসীদের তত্ত্বাবধানের কাজে নিযুক্ত হন কিম। ধর্মে অবিশ্বাসী কিমকে ধীরে ধীরে আস্তিক করে তুলেছিল গির্জার পরিবেশ। শুরু করেন ধর্মপ্রচার নিয়ে লেখাপড়াও। তবে শেষ করেননি সেই পাঠ্যক্রম। ১৯৯০ সালে ৩০ বছর বয়সে তিনি পড়তে যান প্যারিসে। ফাইন আর্টস নিয়ে স্নাতক শেষ করে প্রবেশ করেন সিনেমার জগতে। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন একজন চিত্রনাট্যকার হিসেবে। সেখানেও খুব একটা সুযোগ মেলেনি। অন্যদের সঙ্গে লড়াই করেই ছিনিয়ে নিতে হয়েছিল নিজের জায়গা। ১৯৯৫ সালে কোরিয়ান ফিল্ম কাউন্সিলের 'সিনারিও কন্টেস্ট'-এ প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। তারপরই বদলে যায় পটভূমিই।

সিনেমার চিত্রনাট্য লেখার সময় থেকে পরিচালক হওয়ার ইচ্ছা মনে মনে বুনেছিলেন কিম কি দুক। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করেন প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'ক্রোকোডাইল'। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এরপর একে একে নির্মাণ করেন 'রিয়েল ফিকশন', 'ব্যাড গাই', 'দ্য কোস্টগার্ড', 'স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার... অ্যান্ড স্প্রিং', 'থ্রি আয়রন', 'সামারিটান গার্ল', 'দ্য বো', 'ড্রিম', 'আরিরাং', 'পিয়েতা', 'আমেন'-এর মতো পৃথিবী বিখ্যাত সব সিনেমা।

সব মিলিয়ে ৩৩টি সিনেমা পরিচালিত করেছিলেন কিম। প্রতিটি সিনেমায় একটা সূত্র ছেড়ে দিতেন আর বলতেন, 'বাকিটা দর্শক ভাবুক। সবই দেখিয়ে দিতে হবে, এমন তো মানে নেই।' সিনেমাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন কিম কি দুক।চলুন জেনে নেই তার কয়েকটি ছবির কথাও।

স্প্রিয়, সামার, ফল, উইন্টার... অ্যান্ড স্প্রিং [২০০৩]

২০০৩ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। কিম কি দুকের ছবিতে সব সময় সংলাপ কম থাকে। এটিও ব্যতিক্রম নয়। সংলাপ কম, হাতেগোনা কয়েকটি চরিত্র আর একটাই লোকেশন। মুগ্ধ করার মতো ছবি এটি। একটি লেকের মধ্যে একটি বাড়ি। সেখানে থাকেন একজন বয়স্ক বৌদ্ধ ভিক্ষু, আরেকটি ছোট ছেলে। সেও দীক্ষা নিচ্ছে। এই ছবি নিয়ে সরলভাবে বলা যায়, ভিক্ষুদের জীবনের ৫ অধ্যায় দেখানো হয়েছে। কিন্তু আদতে এটি মানুষেরই জীবনচক্র, ৫ ঋতুর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। আবার একটা মানুষের খুশি, রাগ, দুঃখ ও আনন্দের একেকটি অধ্যায় সিনেমাজুড়ে।

থ্রি-আয়রন [২০০৪]

ঠিক যেন একটা পেইন্টিং। সংলাপ নেই বললেই চলে। পুরো সিনেমায় প্রধান দুই চরিত্রের মধ্যে কথা মাত্র একটি। আবার শেষ সেই কথা নিয়েও আলোচনার শেষ নেই। ছেলেটি দিনের বেলা অভিনব উপায়ে খালি বাড়ি খুঁজে বের করে, রাতে সেখানে থাকে। বাড়ির মালিক ফেরার আগেই চলে যায়। এরকম এক বাড়িতে হঠাৎ দেখা মেলে এক মেয়ের।

দ্য বো [২০০৫]

৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। ৬ বছর বয়সী একটি মেয়েকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। এখন অপেক্ষা করছে ১৭ বছর হওয়ার জন্য। তারপর বিয়ে। ওরা থাকে একটি মাছ ধরার জাহাজে। সেখানে অর্থের বিনিময়ে মাছ ধরতে আসে অনেকেই। মেয়েটি আবার অভিনব উপায়ে ভাগ্য গণনা করতে পারে। মাছ ধরতে অল্প বয়সী একটি ছেলে এলো। তখনই ঘটনা পাল্টে যায়।

ব্যাড গাই [২০০১]

ছেলেটি মেয়েটিকে জোড় করে চুমু খায়। মেয়েটি ছেলেটির মুখে থুথু মারে। ছেলেটি প্রতিশোধ নেয় নির্মমভাবে। মেয়েটি বাধ্য হয় পতিতাবৃত্তি করতে। তারপর অদ্ভুত এক সম্পর্ক তৈরি হয়। ভালোবাসা, আনন্দ-বেদনা, ক্রোধ সবই আছে।

টাইম [২০০৬]

মেয়েটি দেখতে তেমন সুন্দরী না। তার ভয় বন্ধুটি বেশি দিন তাকে পছন্দ করবে না, অন্য মেয়েকে চাইবে। তারপর সে প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা পালটিয়ে ফেলে। মেয়েটির সঙ্গে আবার সম্পর্ক হয় ছেলেটির, যদিও জানে না এ তারই সেই হারানো বান্ধবী। কিন্তু ছেলেটি ভুলতে পারে না কম সুন্দরী চেহারার মেয়েটিকে। ফলে মেয়েটি আবার চেহারা পালটায়। এর মধ্যে ছেলেটিও পালটায়। ফলে কেউ কাউকে আর চেনে না।


আরও পড়ুন

×