ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হেপাটাইটিস সংক্রমণ: কারণ ও প্রতিকার

হেপাটাইটিস সংক্রমণ: কারণ ও প্রতিকার
×

মো. আহসানুর রহমান

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

আমাদের যেমন জীবন একটি, তেমনি লিভারও একটি। হেপাটাইটিস সংক্রমণ দুটিকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। একটি সুস্থ লিভার প্রতিদিন নীরবে ৫শরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কাজের মাধ্যমে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তাই লিভারের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা আমাদের প্রত্যেকের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত।

 হেপাটাইটিস হলো লিভারের প্রদাহ, যা বিভিন্ন সংক্রামক ভাইরাস এমনকি বিভিন্ন অসংক্রামক মাধ্যম দ্বারাও ছড়াতে পারে। প্রধানত পাঁচ ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণ ঘটে। এ, বি, সি, ডি ও ই ভাইরাস। এর মধ্যে বি ও সি ভাইরাসের সংক্রমণ হার সবচেয়ে বেশি এবং প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ বি ও সি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার এবং ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত রোগে ভুগে মৃত্যুবরণ করেন। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস তাপ সহনশীল ও স্বাভাবিক পরিবেশে অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকার মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সিতে আক্রান্ত। কিন্তু আশঙ্কার কথা হলো, এদের মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ জানে না, তারা তাদের রক্তে হেপাটাইটিস বি অথবা সি ভাইরাস বহন করছে। সমীক্ষা অনুসারে, ২০০১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব ছিল ৭.১২%। বাংলাদেশে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইপিআইয়ের মাধ্যমে ভ্যাকসিন শুরু হওয়ার পর হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। ২০১৭ সালে পরিচালিত গবেষণা অনুসারে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার ৩.৮৫% ছিল, যা প্রমাণ করে সরকারের উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণের ধরন, তীব্রতা ও ভৌগোলিক বিস্তার অনেকাংশে এক রকম। হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস প্রধানত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। অনিরাপদ রক্তসঞ্চালন, অনিরাপদ সুঁই ও সিরিঞ্জ ব্যবহার এর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক, স্যালুনে অনিরাপদ শেভিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পার্লারে নাক-কান ছিদ্রকারী অনিরাপদ যন্ত্রপাতির ব্যবহার– এসব উপায়েও হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়াতে পারে। এ ছাড়া ভাইরাস বহনকারী মায়ের কাছ থেকে নবজাতকের শরীরেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী, হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রোগীর সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং রক্ত গ্রহণকারীরা এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। আমাদের জেনে রাখা দরকার, হেপাটাইটিস ভাইরাস করমর্দনের মাধ্যমে কিংবা কোলাকুলির মাধ্যমে ছড়ায় না। জামাকাপড়, থালাবাসনের মাধ্যমেও এটি ছড়ায় না।

হেপাটাইটিস বি অথবা সি ভাইরাস কোনো সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশের পর এটির ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি পরিণতি হতে পারে: ১. অনেকের মধ্যে কোনো উপসর্গ সৃষ্টি ছাড়াই এটি আপনাআপনি দেহ থেকে নির্মূল হয়ে যায়; ২. কারও কারও মধ্যে এটি স্বল্প মেয়াদের লিভার প্রদাহ বা অ্যাকিউট হেপাটাইটিস সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী সময়ে হয় সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায় অথবা দীর্ঘ মেয়াদে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সারাজীবন দেহে অবস্থান করে। কেউ কেউ ভাইরাসটি শরীরে বহন করেও সারাজীবন সুস্থ থাকে, আবার অনেকে ক্রনিক হেপাটাইটিসে ভোগে এবং সেখান থেকে সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। অ্যাকিউট হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ, ক্রনিক হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ, লিভার সিরোসিসের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং লিভার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রায় ৬৫ শতাংশের জন্য হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দায়ী।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় HbsAg অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া লিভারের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য জানার জন্য লিভার ফাংশন টেস্ট করা হয়। অন্যদিকে সেরোলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যান্টি-এইচসিভি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হলে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়।

অন্যদিকে, হেপাটাইটিস এ হলো হেপাটাইটিস এ ভাইরাস (HAV) দ্বারা সৃষ্ট লিভারের প্রদাহ। ভাইরাসটি প্রাথমিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যখন একজন অসংক্রমিত এবং টিকাবিহীন ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তির মল দ্বারা দূষিত খাবার বা পানি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস ই ভাইরাস লিভারকে সংক্রমিত করে। এটি দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির লিভার ফুলে যেতে পারে। হেপাটাইটিস ই দ্বারা আক্রান্ত অধিকাংশ লোকই কয়েক মাসের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। সাধারণত এটি হেপাটাইটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা লিভারের ক্ষতি করে না। অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস ই মারাত্মক হতে পারে এবং এর ফলে ফুলমিন্যান্ট হেপাটাইটিস হতে পারে। ফুলমিন্যান্ট হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি থাকে। হেপাটাইটিস ই দ্বারা আক্রান্ত গর্ভবতী মহিলারা, বিশেষ করে যারা দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে, তাদের লিভার ফেইলিওর, ভ্রূণের ক্ষতি এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে।

২০১৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগে সব সদস্য দেশ হেপাটাইটিসের সংক্রমণ ৯০ শতাংশে এবং মৃত্যুহার ৬৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারও হেপাটাইটিসের সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারাও হেপাটাইটিস নির্মূলে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আশার কথা, হেপাটাইটিস বি’র প্রতিষেধক এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। সুলভ মূল্যে বিশ্বমানের প্রতিষেধক উৎপাদনে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিরোধযোগ্য হেপাটাইটিসের সংক্রমণ রোধে জনসচেতনতার মাধ্যমে প্রতিষেধক গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

[ফার্মাসিস্ট, হেড অব ভ্যাকসিন পোর্টফোলিও, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড]

আরও পড়ুন

×