ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

ট্যানারিতে এখনও নিশ্চিত হয়নি সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

ট্যানারিতে এখনও নিশ্চিত হয়নি সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে এবং চামড়ার সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো ২০১৭ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে পরিকল্পিত চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয়। এজন্য সরকারকে খরচ করতে হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবুও পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব হয়নি।  বুড়িগঙ্গার বদলে এখন দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী নদীর পানি।

ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে ট্যানারির কেমিক্যাল মিশ্রিত দূষিত বর্জ্য। ধলেশ্বরী নদীর পানিতে পাওয়া গেছে ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন রাসায়নিক, যা মানব স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য  হুমকি। ত্রুটিপূর্ণ কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এবং এর সক্ষমতাকেই এর জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় ১৫০ ট্যানারি থেকে দৈনিক গড়ে ৪০ হাজার ঘনমিটার বিভিন্ন ধরনের তরল এবং কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। সিইটিপির মাধ্যমে এর পুরোটা ব্যবস্থাপনা করা যাচ্ছে না। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বর্জ্য স্তূপাকারে জমা হচ্ছে আশপাশের এলাকায়। এলাকাবাসী ভুগছেন শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগে।

হেমায়েতপুর ঢাকার উজানে অবস্থিত এবং ধলেশ্বরী হলো বুড়িগঙ্গার উপনদী। তাই ধলেশ্বরী নদীর পানি পরে ঢাকায় প্রবেশ করে। তাই বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত তখনই সুফল বয়ে আনবে, যখন বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে। ত্রুটিপূর্ণ সিইটিপি সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে আরও ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সংস্কার হলেও প্রতিদিনের সৃষ্ট বর্জ্য শোধন করার সক্ষমতা না থাকায় পরিবেশের পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। অবশিষ্ট বর্জ্যের সঠিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারায় সঠিক দামে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া বিক্রির সুযোগ হারিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে চামড়াশিল্পের বাজার রয়েছে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের। এ বাজারের অন্তত ১ শতাংশের জোগানও যদি বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বছরে অন্তত ৪০০ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ থাকা জরুরি। এলডব্লিউজি চামড়া খাতের কমপ্লায়েন্স সম্পর্কিত বৈশ্বিক সংস্থা। চামড়া খাতে এর সনদ বড় ক্রেতা আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের ব্র্যান্ডগুলোর কাছে ভালো দামে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে এ সনদ বাধ্যতামূলক। এর জন্য পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অন্যান্য উপাদানের ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পরিশোধন, কাঁচামালের উৎস, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার ইত্যাদি নানা বিষয় খতিয়ে দেখা হয়।

এখন বিকল্প ব্যবস্থায় কঠিন বর্জ্য টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে গত বছর লাফার্জহোলসিমের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প জিওসাইকেলের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০ টন কঠিন বর্জ্য টেকসই উপায়ে ব্যবস্থাপনা করা হয়। জিওসাইকেল পরিবেশ অধিদপ্তর অনুমোদিত দেশের একমাত্র টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা। হোলসিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জিওসাইকেল বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে জিওসাইকেলের যাত্রা ২০১২ সালে হলেও ২০১৭ সালে এর কার্যপরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে জিওসাইকেল বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ লাখ টন বর্জ্য কো-প্রসেস করতে সক্ষম। সর্বাধুনিক এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিটটি স্থাপনে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বর্জ্য টেকসই উপায়ে ব্যবস্থাপনা সম্পন্নের পর গ্রাহকদের সনদ প্রদান করে জিওসাইকেল, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

পরীক্ষামূলক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পর জিওসাইকেলের মাধ্যমে এ কার্যক্রম আর এগিয়ে নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ট্যানারি মালিকদের কিছু অনীহা রয়েছে। যথাযথভাবে এ সুবিধা গ্রহণ করলে সাভারের ট্যানারি থেকে দূষণের মাত্রা অনেকাংশেই কমে যাবে। বিসিকও চামড়া বর্জ্য পরিশোধন বা দূষণ রোধে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকাও রাখেনি। এতে করে একদিকে যেমন সম্ভাবনাময় শিল্পটির বিকাশ থমকে আছে, অন্যদিকে দূষণের মাত্রা বেড়েই চলছে। যেহেতু জিওসাইকেলের মাধ্যমে ট্যানারি বর্জ্য ধ্বংসের সুবিধা বাংলাদেশেই রয়েছে এবং এর সনদও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত, সেহেতু বিশ্ববাজার ধরতে এ সনদ কাজে লাগানো যেতে পারে। ট্যানারি মালিকরা অবশ্য বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু দুর্বলতা আছে। দুর্বলতার কথা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তারা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×