ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

গল্প

রঙিন ছাগল অভিযান

রঙিন ছাগল অভিযান
×

ছবি এঁকেছেন রজত

লিখেছেন শেখ সালাহ্উদ্দীন

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আক্কেল আলি ব্যাপারির ব্যবসায়িক বুদ্ধি তুখোড়। যাতে হাত দেয় সোনা ফলে। তবে মাঝে মাঝে তার মাথায় এমন সব আইডিয়া আসে, যেগুলো শেষ পর্যন্ত প্রচন্ড ছেলেমানুষি কাণ্ডে পরিণত হয়! এজন্য তার ‘আক্কেল’ নিয়ে কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করে।   
গেলো কোরবানি ঈদ আসার আগের কথা। আক্কেল আলির মাথায় এলো নতুন এক বুদ্ধি–এমন ছাগল কোরবানি দিতে হবে, যেটা হবে স্পেশাল। দেখে যেন সবাই হতবাক হয়ে যায়, একবাক্যে বলে ওঠে ‘ওয়াও’।                            
ঈদের আগের এক সন্ধ্যায় তার অয়েল মিলের খাস কামরায় জরুরি মিটিং ডাকা হলো। প্রথমেই গঠিত হলো ‘কোরবানির পশু ক্রয় কমিটি’। কমিটির সভাপতি অয়েল মিলের ম্যানেজার করম আলি, হেড রাখাল কুদ্দুস ১ নম্বর সদস্য এবং সিনিয়র হেল্পার হেদায়েত ২ নম্বর সদস্য। শুরুতেই ব্যাপারি স্পষ্ট করে গাইড লাইন দিলেন–দেখো, এবার যে ছাগল কেনা হবে তার সাইজ হতে হবে বিশাল, আর কালার এমন; যা জীবনে কেউ দেখেনি।   
করম আলি একটু ইতস্তত করে বলেন, 
‘ব্যাপারিসাব, খুব বড় ছাগল না কিনে মিডিয়াম সাইজের এক জোড়া ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট কিনলে হয় না?’            
ব্যাপারি বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকালেন। 
‘না, মানে… বড় ছাগল কিনতে গিয়ে একবার আমরা গাড়ল কিনে আনছিলাম। তা নিয়া সারা গ্রামে সে কী হাসাহাসি! দুষ্টু পোলাপান কতো রকমের মিম বানাইছিল, মনে পড়লে এখনও শরমে মাথা কাটা যায়।’   
‘চুপ করো, সে তো তোমাদের বোকামির কারণেই হইছিল।’     
করম আলি চুপ। যদিও ব্যাপারটা সেরকম ছিল না। ব্যাপারির একক সিদ্ধান্তে ওটা কেনা হয়।  সে কথা বলা যাবে না।  
পরদিন থেকে জোরেশোরে ছাগল খোঁজা শুরু। নাওয়াখাওয়া ভুলে হাটে হাটে ছুটছে ক্রয় কমিটির লোকজন। ছাগল পাওয়া যাচ্ছে। ইউনিক কালারের ছাগল মিলছে না। মোবাইলে ছবি দেখে ব্যাপারি নাকচ করে দিচ্ছেন। 
এভাবে পনেরো দিন কেটে গেলো।  
বিরক্ত হয়ে ব্যাপারি নিজেই মাঠে নামলেন। আশ্চর্য! পরদিনই পাশের গ্রামের হাটে মিলে গেলো ছাগল। কী তার আকার, কী তার গায়ের রঙ! দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়! হলুদের ওপর কালো ডোরাকাটা। যেন, মিনি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার! ব্যাপারি ফিসফিস করে বললেন, ‘দাম যা-ই হোক, এটাই চাই!’ 
‘হুজুর, ছাগলের গায়ের রঙটা কেমন জানি!’ হেড রাখাল কুদ্দুস একটু আপত্তি করতে গেলেন। আক্কেল আলি কটমট করে তাকাতেই তার কণ্ঠ নিভে গেলো।  
৫২ হাজার টাকায় দাম ফাইনাল হলো।      
ছাগল গৃহে পদার্পণের পর থেকেই গাঁয়ের লোক হুমড়ি খেয়ে পড়লো দেখতে। কেউ সেলফি তুলছে, তো কেউ বানাচ্ছে টিকটক। এমন রঙিন ছাগল কে কবে দেখেছে!    
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু কয়েকদিন যেতেই দেখা গেলো, ছাগলের রঙ আস্তে আস্তে ফেড হয়ে যাচ্ছে, সস্তা কাপড়ের মতো। ব্যাপার কী! এই নিয়ে জোর কানাঘুষা। ব্যাপারি নিজে তদন্তে এলেন। তাই তো! ছাগলের রঙ তো প্রায় উধাও!    
‘হুজুর, আমি আগেই কইছিলাম ছাগলের রঙে ঘাপলা আছে, কিন্তু আমার কথা তো …’  কুদ্দুস মাথা চুলকে বললেন।      
ব্যাপারি বামে ডানে মাথা নেড়ে বলেন, ‘আরে না, ওরে সাবান ডলে গোসল দাও, দেখবা আগের জেল্লা আবার ফিরা আসছে।’       
গোসল দিতে গিয়েই ঘটলো সবচেয়ে বড় বিপত্তি। পানি ও সাবানের ফেনার সাথে কালচে হলুদ রঙ উঠে আসছে। গোসল শেষে দেখা গেলো, ছাগল ধবধবে সাদা। সবাই থ! 
ভয়ংকর রেগে ব্যাপারি বলেন, ‘যত্তোসব গবেট নিয়া আমার কারবার। এখনই ওটারে রুমে আটকাও। আর যেমনে পারো আগের চেহারায় ফিরায়ে আনো।’ প্রথমে ছাগলকে লকডাউন করা হলো গোপন রুমে। শহর থেকে আনা হলো প্রফেশনাল চিত্রশিল্পী। সারারাত চললো চিত্রকর্ম। ছাগলের গায়ে ফিরে এলো সেই বিখ্যাত হলুদ রঙ ও ডোরাকাটা ডিজাইন।      
পরদিন থেকে ছাগল জনসাধারণের জন্য আবার উন্মুক্ত হলো। ব্যাপারির মুখে ফিরে এলো হাসি। আর ভাবনা কী! দু’দিন পরেই তো কোরবানি। একটু ভেবে ব্যাপারি করম আলিকে নির্দেশ দিলেন, ‘এ ছাগলের চামড়া যেন বিক্রি না হয়, স্রেফ গায়েব করে দিতে হবে।’ করম আলি মাথা নেড়ে একবাক্যে বলেন, ‘জি স্যার।’
তারপর? ঈদ চলে গেলেও সেই 
ঘটনা অজানা! 
 

আরও পড়ুন

×