আমীরুল ইসলাম: শিশুসাহিত্যের রাজা
আমীরুল ইসলাম প্রতিকৃতি এঁকেছেন : সাফায়েত সাগর
আহমাদ মাযহার
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাশের এই ভাবুকটা তোমাদের অনেক ভালোবাসতেন। তোমাদের জন্য লিখেছেন রাজ্যের ছড়া-কবিতা, রূপকথা, গল্প, উপন্যাসসহ কত কী! নাম তাঁর আমীরুল ইসলাম। প্রিয় এই লেখকের জন্ম ১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল; ঢাকার লালবাগে। প্রিয় এই লেখক, প্রিয় এই ভাবুক ভাবতে ভাবতে আকাশের দেশে চলে গেলেন ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই ভাবুকটার প্রতি রইলো পৃথিবীর সব ফড়িংয়ের পক্ষ থেকে অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। চলো, প্রিয় এই লেখক সম্পর্কে জানি। আর তাঁর নিজ হাতে লেখা দুটি ছড়া পড়ি...
আমীরুল ইসলাম ছোটদের জন্য বেশি বেশি লিখেছেন। তাদের জন্য লিখে লিখে প্রিয় হতে চেয়েছেন! ছোটরা ছন্দ ভালোবাসে তো! তাঁর হাতে ছিল ছন্দের জাদু। তাই তিনি ছোটদের জন্য মজার মজার ছড়া লিখতে পেরেছেন। সেও কি আর একটি–দুটি বই! গুনতে গুনতে ছড়ার বইই পেয়েছি ৭০টি।
কত রকম ছড়া যে তিনি লিখেছেন! কোনো ছড়া হাসির, কোনো ছড়া কড়া কথার; কোনো ছড়া মুক্তিযুদ্ধের, কোনো ছড়া বঙ্গবন্ধুর; কোনো ছড়া খেলাধুলার, কোনো ছড়া ছবি আঁকার; কোনো ছড়া মাকে নিয়ে, কোনো ছড়া বন্ধুকে নিয়ে। কোনো কোনো ছড়ায় ছিল রূপকথার ভুবন। আমীরুল ইসলামের ছড়ায় যেমন ছন্দের জাদু আছে, তেমনি আছে সহজ ভঙ্গির মুখের ভাষা। সব ছড়া একত্রে সাজাতে লেগেছে সাত খণ্ড ছড়া রচনাবলি। সেই সাত খণ্ডের সঙ্গে অনুবাদ ছড়ার বই দুটোকেও ধরতে হবে। বিদেশি ছড়া অনুবাদ করা তো আর সোজা নয়–অন্য দেশের জীবন এক রকম, সেই ছন্দকে আমাদের ছন্দে রূপ দিতে হয়! এই জন্যই একটি অনুবাদ ছড়ার বইয়ের নামই দিয়েছিলেন ‘দেশি রঙে বিদেশি ছড়া’। অনুবাদে ছড়াগুলো আর বিদেশি থাকেনি, দেশি হয়ে গেছে।
এদিকে আমীরুল ইসলাম তো ওস্তাদ রূপকথার গল্প বলিয়ে। কত রূপকথার গল্প যে লিখেছেন ছোটদের জন্য! এর মধ্যে যেমন আছে বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের মুখে মুখে বলা গল্পের মজাদার রূপ, তেমনি আছে নানান দেশের রূপকথা–ইংল্যান্ডের, আফ্রিকার, জাপানের, রেড ইন্ডিয়ানদের। এসব রূপকথাকে তিনি কয়েক খণ্ডে সাজিয়েছেন ‘বিশ্বভরা রূপকথা’ নামে। ছোটবেলায় বাবার কাছে গল্প শুনতে শুনতে তিনি কল্পনা করতে শিখেছিলেন। পরে বড় হয়ে নিজে গড়ে তুলেছেন ছোটদের কল্পনার ভুবন। নানা রকম রূপকথা মানে তো নানা রঙের রূপকথা! বাংলাদেশের ছোটদের জন্য রূপকথার গল্প লেখকদের মধ্যে আমীরুল ইসলামকে এগিয়ে রাখতে হবে তাঁর প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা ভাষার জন্য। রূপকথার ভাষা যেমন স্বাদু হতে হয়, তিনি তা অনায়াসেই করতে পারতেন।
রূপকথা ছাড়াও কত রকম গল্প যে লিখেছেন তিনি–হাসির গল্প, স্কুলের মজার গল্প, ছোট ছোট দুঃখের গল্প, নীতিকথা বা উপদেশের গল্প। সেগুলো একত্র করতেও অন্তত চারটি খণ্ড লেগেছে। আবার আছে সব নীতিকথার গল্পের আলাদা সংগ্রহও। মুক্তিযুদ্ধের গল্পের কথা তো এখনও বলা হলো না! মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক গল্প লিখেছিলেন তিনি।
ছোটদের জন্য লেখা নিয়ে যার সারাক্ষণের ভাবনা, তিনি কি আর তাদের জন্য উপন্যাস লেখা নিয়ে না ভেবে পারেন! আসলেই তাই–ছোটদের উপন্যাসও কম লেখেননি। এর মধ্যে ছিল অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি, স্কুলজীবনের কাহিনি, গোয়েন্দা কাহিনি, ছোটদের মনের কথা নিয়ে লেখা–আরও কতো কী! সেইসব উপন্যাসেও আছে কল্পনার উড়াউড়ি। কল্পনা ছাড়া তো আর ছোটদের লেখা হয় না। ছোটবেলাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা কথা জেনে নিতে হয়। আমীরুল ইসলাম নিজেকে একজন পরিপূর্ণ শিশুসাহিত্যিক ভাবতেন বলেই তাদের জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা লিখে গেছেন অনেক। লিখেছেন ইতিহাস ও জীবনকথাও। এসব লেখাও তিনি লিখতে পারতেন কল্পনারঙিন ভাষায়।
এতক্ষণ তো বকবক করা হলো তাঁর লেখা বই নিয়ে। তাঁর তো একটা কঠিন কর্মব্যস্ত পেশাগত জীবন ছিল। চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। কত ধরনের অনুষ্ঠানের যে পরিকল্পনা করেছেন! কত মানুষকে যুক্ত করেছেন টিভি অনুষ্ঠানে। আমি নিজেও তো টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে আগ্রহী ছিলাম না, কিন্তু আমীরুল ইসলামের পরিকল্পনা শুনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল উঁচু, সারাক্ষণই থাকতেন ফুর্তিতে।
শেষের দিকে অসুস্থ হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত বন্ধুদের রান্না করে খাইয়েছেন। রান্নাকে মনে করতেন এক রকম শিল্পকলা। আড্ডা দিতে খুব পছন্দ করতেন। কয়েক বছর আগে দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে তাঁকে সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করতে হতো। বছরখানেক আগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাতেও তিনি দমে যাননি। তবু তিনি ছিলেন জীবন উপভোগে অনন্য। ঘুরেছেন শহরজুড়ে।
তাঁর মৃত্যুতে আমাদের সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।
- বিষয় :
- ভালোবাসার চিঠি