সবার জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে নির্বাচনী অঙ্গীকার জরুরি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) নিশ্চিত করা কেবল উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সুস্থ জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই খাতকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না করলে জনস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ–কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে মানবাধিকারভিত্তিক, জলবায়ু সহনশীল ও প্রতিবন্ধীবান্ধব নীতির মাধ্যমে ওয়াশ খাতকে নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গত ১৫ ডিসেম্বর রাজধানীর হোটেল ঢাকা শেরাটনে ওয়াশ নেটওয়ার্কসমূহের সমন্বিত নেটওয়ার্কের উদ্যোগে আয়োজিত ‘সবার জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে জাতীয় অঙ্গীকার’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহার সংলাপে এমন দাবি ও প্রতিশ্রুত উঠে আসে। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। সংলাপ আয়োজক ওয়াশ নেটওয়ার্কসমূহের সমন্বিত নেটওয়ার্ক তত্ত্বাবধান করছে ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
মূল প্রবন্ধ
ওয়াশ নেটওয়ার্কসমূহের সমন্বিত নেটওয়ার্ক ৯০০-এর অধিক সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছে। এ আয়োজনের মাধ্যমে সবার সঙ্গে একটি সম্পর্ক স্থাপিত হবে। আমরা মনে করি, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বিত ওয়াশ নেটওয়ার্কের এ আলোচনা নতুন সূচনা মাত্র। নিরাপদ খাবার পানি বাংলাদেশে সবার মৌলিক অধিকার। আমরা আশা করব, এটি যাতে নিশ্চিত হয়, সেই অঙ্গীকার সবাই করবেন এবং সেটি নিশ্চিতে কার্যকরভাবে উদ্যোগ নেবেন। আমরা এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। এ জন্য বিনিয়োগ অতি জরুরি। এর জন্য এমন একটা মডেল তৈরি করা দরকার, যাতে ভুক্তভোগী এলাকায় মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সেখানে মানুষ তার নিজ নিজ এলাকায় সবার জন্য নিরাপদ ওয়াশ নিশ্চিতে কাজ করবে। অঞ্চল অনুযায়ী অবকাঠামো হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে বা হতে পারে সেগুলোকে সবার সামনে নিয়ে আসবে। এর জন্য বেসরকারি খাতকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে সরকারকে। পুনরায় বলতে চাই, এ অনুষ্ঠানেই যেন আমাদের শেষ দেখা না হয়, যে সম্পর্ক আজ তৈরি হলো তা যেন বজায় থাকে এ দেশের সব নাগরিকের নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি নিরবচ্ছিন্ন নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার। গ্রাম ও শহরের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধায় ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপের ব্যবহার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য পাবলিক টয়লেটের সংকট প্রকট।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিএনপি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায়। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর করতে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের ওপর আমরা জোর দিচ্ছি।
আমি মেঘনা নদীর চরাঞ্চলের মানুষ। লক্ষ্মীপুরে আমার মুরগি ও মাছের খামার আছে। সেখানে আগে ৫০০ ফুট গভীরে পানি মিলত। এখন ৮০০ থেকে এক হাজার ফুট গভীরে যেতে হচ্ছে। নতুন করে ডিপ টিউবওয়েল বসাতে হবে। নদী থেকে যে পানি নেব সে ব্যবস্থা নেই। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি চালু থাকলে আজ ডিপ টিউবওয়েলের প্রয়োজন পড়ত না। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একেকটি ভবনে একেকটি সাবমার্সিবল পাম্প বসানো হচ্ছে। এভাবে আজ সারাদেশের মানুষ ডিপ টিউবওয়েল বসাতে থাকলে আর পানি পাওয়া যাবে না। সৌদি আরবে সমুদ্রের পানি শোধন করে সরবরাহ করা হচ্ছে মানুষের ব্যবহারের জন্য। সেই পানি দিয়ে মরুভূমির বুকে সবজি চাষ হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশের মানুষরাই সেখানে সবজি চাষ করছে।
কতটুকু হুমকির মধ্যে আমরা আছি, সেটি অনেকেই বুঝতে পারছে না। এখনই যদি এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিই তাহলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ অবস্থা হবে। আরেকটি সমস্যা আর্সেনিক। আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের শরীরের অবস্থা কী হয় সবাই দেখেছেন।
ওয়াশ নিশ্চিতে আমাদের অঙ্গীকার থাকতে হবেই। এটা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটিকে পলিসিতে নিয়ে আসতে হবে। শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। সবার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফার মধ্যে এসবের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি জায়গায় তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। পাঁচ বছর খুব বেশি সময় না। আসছে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আমরা সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দুই-তিন-চার বছরে আমরা যে সবকিছুর সমাধান করে ফেলব তা মনে করি না। তবে ৩১ দফাই হবে আমাদের ইশতেহারের প্যারালাল।
ড. এসএম খালিদুজ্জামান
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে এ পরিকল্পনা পরিপূর্ণতা নিয়ে আসে। অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে রকম স্থিতিশীলতা আশা করেছিলাম তা হয়নি। সংলাপে উপস্থাপিত খুলনার দাকোপ এলাকার উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার ভিডিও দেখে নস্টালজিক হয়েছি। আমার বাড়িও ওই এলাকায়।
আমার নির্বাচনী এলাকায় বনানীর কড়াইল বস্তি পড়েছে। এখানে বস্তির মানুষের জীবনযাপন আমরা যতটা জানি তার চেয়েও নিম্নমানের। বছরের পর বছর কাজ করলেও তাদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে পারব কিনা জানি না। পানির অপর নাম জীবন। যখন মানুষ পানির কারণে অসুস্থ হয় বা মারা যায়, তখন সেই পানি আর জীবন থাকে না; তা হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ। ঢাকা শহরের ভেতরেই এমন সব এলাকা আছে, যেখানে মানুষ গুরুতর অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে এসব এলাকায় ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ পানিবাহিত রোগ নিয়মিত ঘটনা।
খুলনার উপকূলীয় এলাকার মানুষকে প্রচুর ওষুধ কিনতে হয়। অসুস্থতার কারণে মাসের ১৫ দিনই তারা কাজ করতে পারে না। আমরা যদি এ রোগগুলো প্রতিরোধ করতে পারতাম, তাহলে ওষুধ ও চিকিৎসায় যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার দশ ভাগের এক ভাগও খরচ হতো না। স্বাস্থ্য খাতের খরচও কমত। এ জন্য রোগ যাতে না হয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আজ ঢাকার পরিবেশও বিপর্যস্ত। গুলশান-বনানী এলাকায় লেক আছে। লেক দেখে ফ্ল্যাট কিনেছিলাম। এখন দেখি সেখানে মশা বাস করে। ইতোমধ্যে আমি এ নিয়ে কাজ শুরু করেছি। বস্তির মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
আবদুল্লাহ ক্বাফি রতন
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় একটি বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। ধারণা হয়েছিল লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। সরকারি হিসাবে তখন পাওয়া যায় ১ লাখ ৩৮ হাজার। সেই দুর্যোগে অনেক পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সেটা আজকের ইস্যু না। এ্যানী ভাই বলেছেন, জিয়াউর রহমান খাল খনন করেছেন। তিনি অনেক বাঁধও দিয়েছেন। যত্রতত্র বাঁধের কারণে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন রাসায়নিকের কারণে পুকুরের পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। একজন প্রেসিডেন্ট খাল খনন করেছেন। আরেকজন প্রেসিডেন্ট হাওর ভরাট করে রাস্তা বানিয়েছেন। কিশোরগঞ্জে গিয়ে হাওর ভরাটের কারণ জানতে চাইলে এলাকাবাসী বলেছেন, রাষ্ট্রপতি চেয়েছিলেন এখান থেকে যেন বাসের হেল্পারের ঢাকায় যাত্রী ডাকার হাঁক শোনা যায়। এখন দেশের প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়িতে পাকা ল্যাট্রিন আছে। আজকে যারা এ অনুষ্ঠানের আয়োজক, তাদের এ অবদান। গ্রামের বাড়িতে দেখা যায় টয়লেটের পাশে নলকূপ। সুপেয় পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে এটাও একটা অন্তরায়। এখন সুপেয় পানি পাওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের একটা বাঁধের কারণে উত্তরাঞ্চল প্রায় মরুভূমি হয়ে গেছে। সিলেট সীমান্তে টিপাই মুখে বাঁধ দিলে মেঘনা নদীতে গরুর গাড়ি চলবে। আমাদের নিজেদের সম্পদও আমরা নষ্ট করেছি। পানির দাবিও যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারছি না। একাত্তরে যে আদর্শ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তার কোনোটাই অর্জিত হয়নি। মানবিক মর্যাদা, সাম্য আজ ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। সামনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যারাই ক্ষমতায় আসুক তারা যেন সেটি উপহার দেন। আমরা ইতোমধ্যে ইশতেহার তৈরি করেছি। ইশতেহারের ২৩ নম্বরে সামগ্রিক পানিনীতি দেওয়া আছে। যদিও আগামী নির্বাচনে আমার পার্টির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করতে পারি।
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ
একবার ‘অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ গল্প পড়েছিলাম। চারদিকে পানি কিন্তু এক ফোঁটা খাবার পানি সেখানে ছিল না। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর হতে পারে না। ৫৪ বছরেও আমরা বাংলাদেশকে রাষ্ট্র বানাতে পারিনি। একটা ভূখণ্ড পেয়েছি। প্রকৃত রাষ্ট্র পাইনি। আমার এলাকা বরিশালের বাবুগঞ্জ। সেখানে পাঁচটা নদী আছে। বাবুগঞ্জ সদর থেকে প্রান্ত সীমায় যেতে দুটি ফেরি পার হতে হয়। ৬ ঘণ্টা লাগে পৌঁছাতে। একটি গ্রাম আছে, যেখানে জোয়ারের সময় রাস্তা ৮ ঘণ্টা পানিতে ডুবে থাকে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বাঁধের কারণে সাড়ে ৩০০ নদী মরে গেছে। আমাদের দেশের মানুষ দশটা নদীর নাম জানে না। লন্ডন যে টেমস নদীর তীরে অবস্থিত সেটা জানে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে পরিকল্পনা করেছিলেন সেটা বাস্তবায়ন করেন। সারাজীবন ডিফেন্স খেললে মেসি হতে পারবেন না। প্রতিদিন আমরা গার্বেজ নিয়ে আলোচনা করি। মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করি না। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করলে ১০ হাজারো ভিউজ হয় না। অথচ আজ এ্যানী ভাইয়ের (শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী) সঙ্গে বিতর্ক হলে সেই ভিডিওর ভিউজ লাখ ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘ সময় বিলেতে ছিলাম। তখন থেকেই রাজনীতি করার ইচ্ছে ছিল। এ দেশে জিয়াউর রহমান ছাড়া কেউ মানুষের সমস্যা-সমাধানের রাজনীতি করেনি। আসেন আজ সবাই মিলে ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি করি। মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলি। রাজনৈতিক দলগুলোর পানি নিয়ে পলিসি কী হবে–এটা দিয়েই শুরু হোক আগামী দিনের বিনির্মাণের রাজনীতি।
কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন
আগামী নির্বাচনে দেশের মানুষ যদি জামায়াতে ইসলামীর ওপর আস্থা রাখে, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিয়ে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করবে। যেমনটি ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির করেছিল। আমার নির্বাচনী এলাকা মিরপুর-পল্লবীতে অনেক বস্তি আছে। অনেক উর্দুভাষী মানুষ আছে। তারা কমতে কমতে এখন ৫ লাখে এসেছে। কেউ পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। একটি অংশ এই সমাজে মিশে গেছে। এখনও যারা আছে তারা একটি ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ঘরে সাত-আটজন করে থাকে। তাদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা স্যানিটেশন সেবা থেকে বঞ্চিত। বিদ্যুৎ-পানির ক্ষেত্রেও তারা অবহেলিত। তাদের গ্যাস সংযোগ নেই। তাদের নিয়ে কাজ করার জন্য কিছু সিএসও আছে। তাদের সেবা সাধারণের কাছে পৌঁছায় না। কোনো রাজনৈতিক দলকে শুনিনি তাদের নিয়ে কথা বলতে। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা। তাদের নিয়ে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করতে হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। প্রশাসন যদি পৃষ্ঠপোষকতা না করে তাহলে মাদক নির্মূল সম্ভব।
অর্পিতা শ্যামা দেব
বিভিন্ন খাবারের দোকান, শাকসবজির বাজার, বাথরুম ও পানির উৎস থেকে সংগৃহীত পানিতে বিপজ্জনক মাত্রার ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অথচ মানুষ প্রতিদিন এসব পানি ব্যবহার করলেও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ফুসকার দোকান, বাথরুম বা শাকসবজিতে যে পানি ব্যবহার করা হতো একবার সেটি পরীক্ষা করে দেখলাম। তাতে অনেক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। অথচ সেই পানি কিন্তু আমরা খাচ্ছি। মেয়েদের ঋতুকালীন যে সমস্যা আছে, তখন দেখেছি টয়লেটে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থাকছে না। বিষয়টি এখনও সামাজিকভাবে অবহেলিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাবলিক প্লেসে নারীবান্ধব টয়লেট, স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন ও নিরাপদ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এ জায়গাগুলোয় আরও পরিকল্পিত কাজ প্রয়োজন। এটা নিয়ে আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চাই। হাসপাতালগুলোর অবস্থা খারাপ। সেখানে রোগীদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এখানে বাজেটের ব্যাপার আছে। সেটা ব্যবস্থা করতে হবে। পানি ও স্যানিটেশন নিয়ে দেশে যে গবেষণাগুলো হচ্ছে, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের সক্ষমতা অনেক বেশি, কিন্তু তা নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে খুব কমই পৌঁছায়। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) পলিসি লেভেলে যুক্ত করা খুবই জরুরি। এটা নিয়ে আমরা কাজ করব।
নাবিদ নওরোজ শাহ
আমরা একটা বৈষম্যহীন দেশ গড়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে একটা ঐকমত্য হয়েছে যে সবার জন্য পানি চাই। আমাদের ইশতেহারেও উল্লেখ আছে–সর্বজনীন স্বাস্থ্য। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আমরা উপকূলীয় অঞ্চলকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেব। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত জাতি থেকে বের হতে পারছি না। তাহলে বৈষম্যহীন দেশ কীভাবে গড়ব?
ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক
সামনে নির্বাচন আসছে। আমাদের ইশতেহারে অনেকে আরও কিছু লিখবে। আমরা এটাকে মিনিংফুল মিন করছি। বাংলাদেশ আসলে রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি। আমরা নাগরিক হয়েও গড়ে উঠিনি। আমাদের নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।
ফজুলল হক
আমাদের আয়োজনে আপনারা সাড়া দিয়েছেন। এ জন্য ধন্যবাদ। এটা কেবল শুরু। আশা করব, আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন। আমাদের সঙ্গে থাকবেন। যারা সরকারে যাবেন তারা আমাদের এ দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। যারা বিরোধী দলে যাবেন তারা তাগিদ দেবেন। সংসদের বাইরে যারা থাকবেন তারা জনমত গঠন করবেন। রাজনীতিবিদরা অগ্রাধিকার দিয়ে এটাকে এগিয়ে নেবেন। প্রয়োজনে আপনারা আমাদের ডাকবেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে হাজির হবো। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে পাশে চাইলে থাকব। সবাই চাইব একটি ভালো নির্বাচন আগামীতে হোক। আজকের আয়োজনে অংশগ্রহণ করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।
মো. তাসনিম লস্কর
গত ৫৪ বছরে বড় বড় অঙ্গীকার দেখেছি। সেসব বুলি ছাড়া কিছু না। চব্বিশের পর পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ গড়ে ওঠার ব্যাপারে বিশাল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
একটি হলো শিক্ষা। যদি নৈতিকতাই তৈরি না হয় তাহলে সবই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
আমাদের সমস্যা হলো, জনগণের সমস্যা কাছে গিয়ে উপলব্ধি করি না।
সাইফুল ইসলাম সরকার
রাজনৈতিক নেতাদের কথা আজ শুনতে চেয়েছি। আপনাদের ইশতেহার-অঙ্গীকারের সঙ্গে আমাদের প্রত্যাশার কোনো বৈপরীত্য নেই। আমাদের দেশে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা আছে। যারা ক্ষমতায় আসবে তারা পাঁচ বছর সময় পাবে। তারা স্বচ্ছতার বিষয়টা নিশ্চিত করতে না পারলে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না।
সালমা মাহবুব
এই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য হলো–আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) বিষয়ক অঙ্গীকারগুলোকে গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় আনা। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়গুলোকে যুক্ত করা। কারণ ওয়াশ কেবল একটি অবকাঠামোগত বিষয় নয়। এটা জনস্বাস্থ্য, মানব মর্যাদা, নারীর নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং পিছিয়ে পড়া সব জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা, মানসম্মত স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যগত আচরণ নিশ্চিত করতে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নগর বস্তি, উপকূলীয় এবং অন্যান্য দুর্গম অঞ্চলের মানুষ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এ সেবা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বাড়ার চাপ এ চ্যালেঞ্জকে আরও
জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। আমরা প্রত্যাশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে ওয়াশ খাতকে কেবল প্রতিশ্রুতির ভাষায় নয়, বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন কাঠামোসহ উপস্থাপন করবে। আমরা বিশ্বাস করি, এ সংলাপ ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে আরও দৃঢ় করবে।
মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান
ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছেন আমরা কী চাই, আমাদের লক্ষ্য কী। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা প্রায় ৯০০-এর অধিক সিএসওর (সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন) সমন্বয়ে সংগঠিত সমন্বিত নেটওয়ার্ক এই আয়োজন করেছি। আগামী নির্বাচনের পর যারা ক্ষমতায় যাবেন, যারা বিরোধী দলে থাকবেন আশা করি তারা এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন। যারা এ দুটোর কোনোটাতেই থাকবেন না, তারা প্রেশার গ্রুপ হিসেবে বাইরে থেকেও ভূমিকা রাখবেন বলে আমরা প্রত্যাশা রাখি। সুস্থ জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই খাতকে আসছে জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না করলে জনস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ–কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
অঙ্গীকার
নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ)–
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক সমতা
নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এই লক্ষ্যে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে
অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
ক। বৈষম্যহীন পরিষেবা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ
১. যথাযথ বাজেট ও বৈষম্য নিরসন: ওয়াশসংক্রান্ত সব বাজেট ও প্রকল্পের নকশায় নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর (যেমন–নদীভাঙনকবলিত, উপকূলীয়) চাহিদা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
২. মাসিক স্বাস্থ্যবিধি (এমএইচএম) নীতি: সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারী এবং কিশোরীদের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্মত মাসিক স্বাস্থ্যবিধি (এমএইচএম) সামগ্রীর প্রাপ্যতা এবং এ বিষয়ে জাতীয় সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।
খ। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
৩. ওয়াশকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে ঘোষণা: ওয়াশ অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণকে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক খাত হিসেবে ঘোষণা করে আগামী ৫ বছরের জন্য জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে দ্বিগুণ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ওয়াশ শিল্পে কর্মসংস্থান: সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্যানিটেশন সরঞ্জাম উৎপাদন, বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তির স্থানীয়করণের মাধ্যমে এই খাতে লাখ লাখ দক্ষ ও অর্ধদক্ষ যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
৫. টেকসই অর্থায়ন মডেল: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ‘ওয়াশ’ সেবার সুষ্ঠু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শক্তিশালী ও আর্থিক স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে।
গ। জলবায়ু সহনশীলতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন
৬. জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো: আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও বন্যারোধী এবং ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় টেকসই পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
৭. উদ্ভাবনী ওয়াশ ও গবেষণা: ‘সবার জন্য ওয়াশ’ লক্ষ্য অর্জনে পানির অপচয় রোধ এবং পয়ঃনিষ্কাশনের উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার
(যেমন–ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট) এবং এই সংক্রান্ত গবেষণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে সরকারি-বেসরকারি অনুদান বাড়াতে হবে।
ঘ। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ
৮. সিএসআর (সিএসআর) বাধ্যতামূলক অংশ: সিএসআরসংক্রান্ত নীতিমালায় নির্দিষ্ট অংশ (সিএসআর তহবিলের ন্যূনতম ১০%) ওয়াশ খাতে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, উপরোল্লিখিত জনবান্ধব ও অর্থনীতি-উন্নয়নকারী সুপারিশমালা গ্রহণ করে আপনার দল জনগণের আস্থা অর্জন এবং টেকসই উন্নয়নের পথে দেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।
