ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কৃষি ও ভূমির অধিকার নিশ্চিতে নীতি ও আইনের সংস্কার জরুরি

কৃষি ও ভূমির অধিকার নিশ্চিতে নীতি ও আইনের সংস্কার জরুরি
×

‘ভূমিতে অধিকার ও দারিদ্র্য নিরসন: নীতি ও আইনের সংস্কার’ বিষয়ে সমকাল সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আলোচকরা

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০৯ | আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৩১

কৃষির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। এ জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজীকরণ, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমির সুষ্ঠু বণ্টন প্রয়োজন। সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসী, চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার প্রান্তিক মানুষের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীকৃষকের ন্যায্য মজুরি ও প্রণোদনা দেওয়া দরকার। এ জন্য স্থায়ী জাতীয় ভূমি ও কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে ভূমির নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয়কে দেওয়া উচিত।

গত ১৫ জানুয়ারি সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘ভূমিতে অধিকার ও দারিদ্র্য নিরসন: নীতি ও আইনের সংস্কার’ শিরোনামে এ আলোচনার আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও দৈনিক সমকাল। এতে বক্তারা অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নতুন সরকারের উদ্দেশে ভূমি ও কৃষি সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। 

মূল প্রবন্ধ

কৃষি এখনও আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খাত

শামসুল হুদা

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এখনও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ খাত। যদিও আমাদের মূলধারার অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে কৃষি লাভজনক এবং সম্ভাবনাময় খাত নয়।  পক্ষান্তরে বাস্তবতা হচ্ছে কৃষিই আমাদের সবচেয়ে ভরসার ও নির্ভরযোগ্য খাত। কৃষিতে দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ ভাগ নিয়োজিত। কৃষির বিভিন্ন উপখাত বিবেচনায় নিয়ে এর সুরক্ষা এবং সম্ভাবনার দ্বারগুলোকে বাধামুক্ত করে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়া হলে এই খাতে শ্রম শক্তির ৫০ ভাগেরও বেশি নিয়োজিত হতে পারে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্ত নতুন প্রজন্মের শ্রমশক্তি কৃষিতে আকৃষ্ট হচ্ছে না বলে প্রচলিত ধারণাও বদলে যাবে। কৃষি খাত আমাদের স্বাধীনতা-পূর্ব কাল থেকেই বঞ্চনা, অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার। ১৯৭১-এর পরও সেই অবহেলা ও বৈষম্যের অবসান হয়নি।

কৃষিশুমারি ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ, যাদের ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। তারাই ২ কোটি ৫৮ লাখ একর জমিতে শ্রম দিয়ে বিভিন্ন ফসল ফলান। যদিও তাদের অধিকাংশ এসব জমির মালিক নন। গ্রামীণ কৃষিনির্ভর জনসংখ্যার ৫৬ ভাগই ভূমিহীন। গত তিন দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি উৎস থেকে যত ঋণ সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকরা সর্বসাকল্যে পেয়েছেন শতকরা ২৪ ভাগেরও কম। কৃষকদের মধ্যে যারা ৯১ শতাংশের বেশি, তাদের কাছে এই ঋণ বা ভর্তুকি পৌঁছাচ্ছে ৩ শতাংশেরও কম। শিল্প, বাণিজ্য ও অন্যান্য খাতে প্রদত্ত ঋণের একটি বড় অংশই খেলাপি। কৃষিখাতে ঋণের অনাদায়ী অংশ নিতান্তই কম। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, শিল্প ও অন্য উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কিংবা ইটের ভাটা, আবাসন খাত দ্রুত বৃদ্ধির কারণে কৃষি জমি কমছে।  গত তিন দশকে কৃষিজমির পরিমাণ কমপক্ষে ১২ শতাংশ কমেছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের খাদ্যের উৎপাদন কম-বেশি স্থিতিশীল রয়েছে। কোনো কোনো বছর চাহিদার তুলনায় কিছু ঘাটতি থাকে। আমদানিও করতে হয়। তবে জনসংখ্যা ১৯৭১-এর সাড়ে ৭ কোটির স্থলে এখন সরকারি হিসাবে প্রায় ১৮ কোটি। বাস্তবে হয়তো আরও বেশি।

ভূমি প্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে
ড. ইফতেখারুজ্জামান

সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের মধ্যে আছে ভূমি। এ খাতের কর্মচারীদের আয়-ব্যয়ের হিসাবটা প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টারা নিজে জাতির কাছে সম্পদের হিসাব দিতে চেয়েছিলেন। তারা দিলেন না। যদি দিতেন তাহলে তাদের বিদায় পর্যন্ত একটি চিত্র দেশবাসী পেত। ভূমি, প্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যারা জড়িত সেখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।  নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীরা হলফনামা দিচ্ছেন।

রাজনৈতিক নেতারা পর্যাপ্ত তথ্য দেন না। ভূমিদস্যুতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও শিল্পায়নের নামে ভূমি দখলের যে সংস্কৃতি দেশে চলে তার মূল সুবিধাভোগী রাজনৈতিক শক্তি, ব্যবসায়ী, আমলা। আদিবাসী, সংখ্যালঘু, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যে সমস্যায় আছে, ৫ আগস্টের পর সেটি থেকে বের হয়ে আসা যাবে বলে মানুষ আশা করেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে  নারীকে অপমান করা হচ্ছে।

নারী কমিশনের মাধ্যমে সরকার নারীকে আরও অপমান করেছে। সরকার নারীবিদ্বেষীদের উস্কে দিয়েছে। মবতন্ত্রে উস্কানি দিয়েছে। এই দায় সরকারকে নিতে হবে। ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তির সঙ্গে মূল ধারার রাজনৈতিক শক্তি একাকার হয়ে গেছে। অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম–এই তিনটি এখন পুঁজি ও ক্ষমতা। চব্বিশের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার।  সরকার সেই জায়গা থেকে সরে আসবে ভাবতে পারিনি। আমাদের হাল ছাড়লে হবে না। নির্বাচিত যে সরকার আসবে তাদের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে। সবকিছু রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে।

সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের জলমহালের বরাদ্দ দিতে হবে
ফেরদৌসী সুলতানা বেগম

নারীর ১৫টি ইস্যু নিয়ে কমিশনে কাজ করেছিলাম। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নারীশিক্ষা, উত্তরাধিকার, খাসজমি, চা বাগান শ্রমিক ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছিলাম।  সম্পত্তিতে নারীর নাম না থাকার কারণে একেকভাবে ভূমি ব্যবস্থাপনা হচ্ছে। তারা সরকারের দেওয়া সার-বীজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ জমিতে নারীরা সবচেয়ে বেশি কাজ করেন।

যারা সম্পদ ব্যবহার করেন, তাদের মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। ২০-২৫ বছর সংসার করার পরও নারীরা তালাকপ্রাপ্ত বা বিচ্ছিন্ন হন। তখন তাদের যাবার কোনো জায়গা থাকে না। তাঁকে আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

জলমহালের সংজ্ঞায় না পড়া ছোট জলমহালগুলো লুটেপুটে খাওয়ার ঘটনা ঘটে। সেখানে নারীকে ছোট ছোট গ্রুপ করে বা সমবায়ের মাধ্যমে তাদের বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। য

খন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, তখন মালিকানার কাগজপত্র ছাড়া কাউকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না। এ জন্য রিসেটলমেন্ট পলিসি তৈরি হয়েছিল ২০১০ সালে। আজ পর্যন্ত সেটির বাস্তবায়ন হয়নি। 
 

নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা যেন দৃষ্টির আড়ালে না থাকে
খুশী কবির

এখনও দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে এ সংখ্যা আরও বেশি।  এর মধ্যে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি। অথচ অধিকারের প্রশ্নে নারীরা পিছিয়ে রয়েছে। এখানে ভূমি ব্যবস্থাপনায় একটি বড় জটিলতা রয়েছে।

বিশেষ করে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি নিজের নামে পাওয়ার সময়। রেজিস্ট্রেশন হলেও দেখা যায় সম্পত্তির দখলে আরেকজন। ভূমি খাতে অনেক ধরনের দুর্নীতি হয়ে থাকে। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

এখানে নারীরা মজুরি সুবিধা পাচ্ছেন না, যেটি নারীর জন্য বেশি করে প্রয়োজন। যেসব আদিবাসী কৃষির সঙ্গে যুক্ত সেখানে নীতিনির্ধারকদের সার্বিকভাবে দৃষ্টি থাকে না। আইন-নীতিমালা সরকারের দিক থেকে সঠিকভাবে না এলে দারিদ্র্য নিরসন, উন্নতি সম্ভব হবে না। 

যারা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন আছে তাদের অধিকার ও দারিদ্র্য নিরসন গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় তারা দৃষ্টির আড়ালে থাকেন। আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়ে দলিত, আদিবাসী, চা বাগান শ্রমিক, উর্দুভাষীদের কথা বলেছি।

সংসদ নির্বাচনে যেন ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়া হয়- দীর্ঘদিন এমন দাবির পর সেটি ৫ শতাংশ হয়েছিল। ২০২৬ সালে এসে সেটিও পাচ্ছি না। গণতান্ত্রিক চর্চাটা নিশ্চিত করতে না পারলে এই পরিবর্তন হবে না। স্বচ্ছতাটা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য একসঙ্গে কাজ করতে হবে। 

বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে কৃষক কার্ড করবে
ড. মাহদী আমিন

আলোচনার মূল প্রবন্ধে ৩৬টি প্রস্তাব এসেছে। এখানে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তার কোনোটির সঙ্গে বিএনপির দ্বিমত নেই। বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে সেগুলো যেন সংযুক্ত করা হয় সে চেষ্টা আমি করব।বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় এলে, নিশ্চয়ই এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজের সুযোগ হবে।

আমরা মনে করি, গুলশানের ভোটারের যে মূল্য, প্রান্তিক সমাজের ভোটও তার সমান। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদিভাবে  বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।  প্রতিটি ক্ষেত্রে বৃহত্তর পরিসরে আলাপ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রেও কথা দিতে পারি সবার সঙ্গে আলোচনা করব।

সমতল-পাহাড়ে যে যেখানেই থাকি না কেন ঐক্য থাকলে সব কিছুই সম্ভব। আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় এলে নারীর ক্ষমতায়নে মা ও স্ত্রীর নামে ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হবে। কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড করা হবে।

এ কার্ডের আওতায় প্রান্তিক, ভূমিহীন বর্গাচাষি, মাঝারি কৃষক এবং কৃষাণী সার-বীজসহ নানা সুবিধা পাবেন। বছরে দুবার তাদের সহযোগিতা করা হবে। ইতোমধ্যে আমাদের ইশতেহারে এ বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে।

রাজনীতিবিদদের কমান্ডার হতে হবে
বজলুর রশীদ ফিরোজ

অতীতে বিএনপি-আওয়ামী লীগ ভালো ভালো ইশতেহার দিয়েছে। ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়াবে। একটি বাড়ি একটি খামার হবে। গ্রাম হবে শহর। ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে। আওয়ামী লীগ কি সেটা বাস্তবায়ন করেছে? দেশের ৮০ শতাংশ জনগণ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

করোনার সময় সব বন্ধ থেকেছে। কৃষক ঠিকই মাঠে গেছেন। এখানে দাবিগুলোর সঙ্গে দ্বিমতের কোনো বিষয় নেই। এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে আমলাতন্ত্র রয়েছে। রাজনীতিবিদদের কমান্ডার হতে হবে। যতদিন পর্যন্ত রাজনীতিবিদরা কমান্ডার হতে পারবেন না, ততদিন এগুলো বাস্তবায়ন হবে না। ৫৪ বছর ধরে এই আলোচনা চলছে। বাস্তবায়ন হয়নি।

দৃষ্টিভঙ্গিটা গুরুত্বপূর্ণ। দর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা চলে। দেখা যায়, বিবিএস একটা পরিসংখ্যান দিল আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরেকটা দিল। সেখানে ব্যাপক পার্থক্য।

এটি কীভাবে হয়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে চাহিদা-জোগান ঠিক থাকে না। এতে গড়বড় হয়ে যায়। 

ভূমিহীন চরের বাসিন্দাদের দেখার কেউ নেই
হাবিবুল্লাহ বাহার

আমি সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের মানুষ। চর নিয়ে কাজ করি। চর এলাকায় এক লাখ পরিবার বাস করে। বন্যা-ঝড়ের শঙ্কায় থাকে। একেক সময় তারা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গিয়ে বাস করে। তাদের নিজের কোনো জায়গা নেই।

তাদের নিজের জমি ভাঙল, বসতি ভাঙল। সেই জমির আর অধিকার ফিরে এলো না। যেখানে তারা বসবাস করছে সেই জমি তার না। নদীশাসনের নামে চরকে ধ্বংস করা হয়।

ভুক্তভোগীরা কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে। তাদের দাবি জানানোর জায়গা নেই। তাদের দেখার কেউ নেই। নদীগর্ভে  সর্বস্ব হারানো চরাঞ্চলের নিঃস্ব মানুষের জন্য উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের কর্মসংস্থান ও বাসস্থান নিয়ে নীতিগতভাবে সরকারকে কাজ করতে হবে।

কিছু এক খতিয়ানের জমি আছে। সেই জমিও যদি সরকার দেয় তাহলে সেখানে তারা বসবাস করতে পারত। চরাঞ্চলের মানুষ সবার কাছ থেকে আন্তরিকতা প্রত্যাশা করে। 

ক্ষুদ্র কৃষকরাই সুষম খাদ্য বেশি উৎপাদন করেন
জাকির হোসেন

চব্বিশের পট পরিবর্তনের পর প্রথম ছয়টি কমিশন হয়। এর পর আরও পাঁচটি কমিশন হয়। এটি জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভূমি ও শিক্ষা কমিশনের কিছু হচ্ছে না। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই বলেছিলেন।

মনে করেছিলাম এই সরকার এটির সমাধান করবে। এটি জাতিসংঘ সনদেও আছে। রাইট টু ল্যান্ড অ্যান্ড সিডস। এখন করপোরেট ফার্মিং হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ক্ষুদ্র কৃষকরাই সুষম খাদ্য বেশি উৎপাদন করেন। করপোরেট ফার্মিং তা পারে না।

সরকার পাহাড়ে করপোরেট ফার্মিং করছে। ফ্যামিলি লেবার দিয়ে ছোট কৃষকরা কাজ করেন। এটি লাভজনক হচ্ছে না। একজন উপদেষ্টা বললেন, ভূমি অফিস দুর্নীতির আখড়া। সে বিষয়ে পদক্ষেপ তো নিলেন না।

আদালতের ৭০ শতাংশ মামলা ভূমি নিয়ে। আমলাতন্ত্র কোনো সংস্কারের মধ্যে যেতে চায় না। দলিত আদিবাসী ও উর্দুভাষীরাও যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারেন। তাদের অধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। 

এখানে একটা সিরিয়াস পরিবর্তন লাগবে। বর্তমান সরকার আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কাজ করেনি। আমি আশা করব, নির্বাচনের পরে যে নতুন সরকার আসবে তারা বিষয়টি দেখবে।

 

ভূমিতে নারীর অধিকার এতদিনেও প্রতিষ্ঠা করা যায়নি
রেবেকা সুলতানা

নারীরা খাবার তৈরি করে সবার মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছেন। নারী ঠিক কতটুকু খাচ্ছেন,  তারা প্রয়োজন মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করছেন কিনা– সেটি কমই দেখা হয়।

ফলে তারা আরও প্রান্তিকতায় চলে যাচ্ছেন। একসময় তারা মানবেতর জীবনযাপন করেন–এটিই সত্যি। নারীরা কৃষিতে সবচেয়ে বেশি কাজ করে থাকেন। সেখানে তাদের স্বীকৃতি নেই। অনেক বেশি কাজ করলেও নারীর ভূমিকার স্বীকৃতি থাকে না।

ভূমিতে নারীর ন্যায্য অধিকার এতদিনেও প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। রাষ্ট্র এবং আইন সবার জন্য সমান। নারীরা কেন বঞ্চিত হবে। তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা নিতে হবে।

 

আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে
সঞ্জীব দ্রং

সমতলের আদিবাসীদের নিয়ে  অনেক দিন ধরে বলছি, লিখছি। আদিবাসীদের সমষ্টিগত ভূমির ওপর যে অধিকার, সংখ্যাগরিষ্ঠদের মাথায় সেটি নেই। ভূমি যে কেবল দলিল করার বিষয় না সেটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে বলা আছে, অনগ্রসর ও আদিবাসী জনগণ অগ্রাধিকার পাবে। সমতলের আদিবাসীরাও ভূমিসংক্রান্ত সমস্যায় জর্জরিত। মধুপুরে ২০ হাজার গারো আদিবাসী আছেন। তারা কৃষিকাজ করছেন। তাদের ঘরবাড়ি আছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে; কিন্তু জমির দলিল নেই। সিলেটেও একই রকম আছে। সরকার বিভিন্ন সময় এসব জমিকে রিজার্ভ ফরেস্ট, ইকোপার্ক ঘোষণা করে। এগুলো প্রথাগত জমি। আমরা চাই, আদিবাসীদের জন্য একটি ভূমি কমিশন করা হোক।

অন্তত সরকারিভাবে চিঠি দেওয়া হোক, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যে জমিতে তারা বসবাস করে, ওই জমি তাদেরই থাকবে। তাহলে আর ইকোপার্ক হবে না। নদীর কি কাগজ আছে? পদ্মা, মেঘনা, যমুনা তার উদাহরণ। কিছু জমি রেজিস্ট্রি হবে না। সেটি হবে সবার। জাতীয় নীতিমালা হোক।

স্বাধীনতার পাঁচ বছর পর ১৯৫২ সালে ভারত এই নীতিমালা করতে পারল। অথচ ৫৪ বছরেও বাংলাদেশ এটা পারল না। সমতলের আদিবাসীদের চিন্তা ও সংস্কৃতিকে তাদের মতো করে দেখা–এ রকম একটা রিকনসিলিয়েশন হোক।  ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটা রাষ্ট্রীয় চিন্তা দরকার।

টুরিজমের নামে পাহাড়ে রিসোর্ট বানানো হচ্ছে। দেশে টুরিজমের সংস্কৃতি তো দেখছি না। ইকো টুরিজম করতে হলে স্থানীয় জনগণই করবে। সরকারকে সাহায্য করতে হবে।

প্রকৃত মালিককে ভূমির অধিকার দিতে হবে
শান্তি বিজয় চাকমা

আমার মৌজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আমার ওপর। দেখা যাচ্ছে আমি জানি না কখন আমার স্বাক্ষর জাল করে একশ একর জমি বরাদ্দ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ভূমির প্রকৃত মালিককে জমি ফেরত দেওয়া; আমরা সেটি পারিনি। তথাকথিত ভূমি ব্যবস্থাপনা চলমান। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, সেটি খুঁজে বের করতে হবে।

 

ভূমির সংকট চিহ্নিত করতে হবে
পাভেল পার্থ

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ সেটি রাষ্ট্র মনে করে কিনা এটি একটি বড় প্রশ্ন।  রাষ্ট্র কখনো ভাবল না দেশের জনগণের খাদ্য কেমন হবে! শিশুরা কী খাবে। ভূমি ও কৃষির প্রশ্ন ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক।

তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে। সেই কৃষকদের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্র ধারণ করেনি। বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি-সমতল ভূমি আছে। ভূমির বৈচিত্র্য অনুযায়ী আমাদের জাতীয় কোনো মানচিত্র নেই।

আমাদের চিহ্নিত করতে হবে ভূমি কেন সংকটাপন্ন হয়েছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকট।

 কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা করা দরকার, যেটি নিয়ে রাষ্ট্র কথা বলছে না। সরকারের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা প্রকট। আমি একটা উদাহরণ দিতে চাই, গোচারণ ভূমি আসলে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে– কৃষি নাকি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে।

 এটা নিয়ে কথা বলতে হলে আমরা কোন মন্ত্রণালয়ে যাব? এর সমাধান দরকার, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় খুব জরুরি।

 

জুমচাষিদের দিকে নজর দিতে হবে
পল্লব চাকমা

আগে পাহাড়ে বন্যা ছিল খুবই অকল্পনীয়। তিন-চার বছর ধরে পাহাড়ে বন্যা হচ্ছে। চার-পাঁচ দিন ধরে বান্দরবান-খাগড়াছড়ি শহর পানির মধ্যে থাকছে। ড্রেজিংয়ের অভাবে পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো নাব্য হারাচ্ছে।

নদীগুলো পানি ধরে রাখতে পারছে না। আবার কাপ্তাই বাঁধের পানি ছেড়ে দিলে উজানের কৃষিজমি জেগে ওঠে। কৃষকের ধান যখন পাকতে শুরু করে তখন ফসল পানির নিচে চলে যায়। একটু নিয়ম রক্ষা করে এ তথ্য কৃষকদের দিলে তারা উপকৃত হতো। 

জুম চাষের আগের অবস্থা নেই। জনসংখ্যা বেড়েছে। চাহিদা বেড়েছে। জুম ফসল দিয়ে বছরের সাত মাস চলে। বাকি পাঁচ মাস তারা কীভাবে চলবে। বিশেষ করে জুমচাষিরা। তখন পাহাড়ে খাদ্য সংকট দেখা দেয়।

ওই সময় জুমচাষিদের সরকার সাহায্য করলে ভালো হয়। উল্টো সরকারের বন বিভাগ জুম চাষ নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশের অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা ভিন্ন। এটি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প নেওয়া দরকার। 

সুপারিশ

স্থায়ী জাতীয় ভূমি-কৃষি সংস্কার ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা।
কৃষিজমি সুরক্ষা, অধিগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ, কৃষিশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ও ভূমি ক্রয় বিষয়ে ভূমি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা।
অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের কৃষিজমি ব্যবহার ও বর্গাচাষির অধিকার সুরক্ষা।
খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভূমি অধিকার।
ভূমি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার/ ভূমি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
ভূমি-কৃষিতে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা।
নারী অধিকারের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি।
আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকার।
ভূমি, বন ও জলাভূমির সুরক্ষা।
নিরাপদ পানি সরবরাহ ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা।
দেশীয় ও উন্নত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ।
নদী, পানিসম্পদ সংরক্ষণ ও কৃষি সেচ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো। 
প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য চাষের সম্প্রসারণ।
সমবায় পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রবর্তন।
স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা। 
প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা।

সভাপতি 

খুশী কবির
চেয়ারপারসন,এএলআরডি  
সমন্বয়ক, নিজেরা করি

মূল প্রবন্ধ

শামসুল হুদা
নির্বাহী পরিচালক
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)

আলোচক

ড. ইফতেখারুজ্জামান
নির্বাহী পরিচালক
 ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)

ফেরদৌসী সুলতানা বেগম
সাবেক সদস্য, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন

ড. মাহদী আমিন
 বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা

বজলুর রশীদ ফিরোজ
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ

জাকির হোসেন
প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ

সঞ্জীব দ্রং
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

পাভেল পার্থ
লেখক ও গবেষক 
পরিচালক, বারসিক

হাবিবুল্লাহ বাহার
নির্বাহী পরিচালক
 মানব মুক্তি সংস্থা, সিরাজগঞ্জ

রেবেকা সুলতানা
নির্বাহী পরিচালক
অন্যচিত্র ফাউন্ডেশন, ময়মনসিংহ

শান্তি বিজয় চাকমা
সাধারণ সম্পাদক
হেডম্যান-কারবারি নেটওয়ার্ক, রাঙামাটি

পল্লব চাকমা
নির্বাহী পরিচালক, কাপেং ফাউন্ডেশন

সঞ্চালনা

শাহেদ মুহাম্মদ আলী
সম্পাদক, সমকাল

সমন্বয়

হাসান জাকির
হেড অব ইভেন্টস, সমকাল

রফিকুল ইসলাম
প্রোগ্রাম অফিসার (অ্যাডভোকেসি) 
এএলআরডি

আরও পড়ুন

×