ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পুষ্টিকে কেন্দ্রে রেখেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা সাজাতে হবে

পুষ্টিকে কেন্দ্রে রেখেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা সাজাতে হবে
×

‘স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: ম্যালেরিয়া যক্ষ্মা এবং জলবায়ুজনিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পুষ্টির ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জের মধ্যে বাংলাদেশ। এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুষ্টিকে আর প্রান্তিক ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটিকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জলবায়ু অভিযোজন ও উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা জরুরি। 
গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ের সভাকক্ষে ‘স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: ম্যালেরিয়া যক্ষ্মা এবং জলবায়ুজনিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পুষ্টির ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও সমকাল যৌথভাবে এর আয়োজন করে।

ডা. মো. রিজওয়ানুর রহমান 
পুষ্টি একক কোনো খাত নয়। এটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি। দেশে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হলেও চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে স্টান্টিংয়ের (খর্বকায়ত্ব) হার প্রায় ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে একজন এখনও স্টান্টিংয়ের শিকার। ওয়েস্টিং বা ওজন স্বল্পতার হার ১৩ শতাংশ। ওয়েস্টিংয়ের হার ১৫ শতাংশ হলে এ ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। আমরা সে পরিস্থিতির কাছাকাছি অবস্থান করছি। জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশন পুষ্টি সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে। সে কারণে পুষ্টি নিয়ে আমাদের কাজ করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মার মতো রোগ আগের চেয়ে অনেক কমলেও এখনও সংকটজনক অবস্থায় আছে। যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও এইচআইভির মতো সংক্রামক রোগের সঙ্গেও পুষ্টির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পুষ্টি উন্নয়ন ছাড়া এসব রোগ মোকাবিলাও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের জাতীয় পুষ্টি নীতি ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে। এটি হালনাগাদের কাজ চলছে। নতুন নীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের মধ্যে ‘ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন ফর নিউট্রিশন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু অপুষ্টি প্রতিরোধে কাজ করলেই হবে না। স্থুলতা ও অতিপুষ্টি নিয়ন্ত্রণেও ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ এর সঙ্গে অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক রয়েছে। আমরা এখনও উপজেলা পর্যায়ে পুষ্টি কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পারিনি। পুষ্টি নিশ্চিত করতে জনবল কাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় আমরা ভালো অবস্থানে আছি, তবে প্রয়োগে হয়তো কিছু ঘাটতি আছে।

ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী 
পুষ্টি উন্নয়নের বুনিয়াদ। পুষ্টিকে যদি আমরা সামগ্রিক উন্নয়নের বুনিয়াদ হিসেবে না দেখে শুধু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন হিসেবে দেখি, তবে দেশজুড়ে কিন্তু আমরা পুষ্টিসেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হবো না। পুষ্টিকে সব পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। পুষ্টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে আমাদের ইউনিয়ন,  উপজেলা, জেলা থেকে কেন্দ্রে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত কমিটি রয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়ের জেলা, উপজেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা এ কমিটির সদস্য। কিন্তু কমিটি কার্যকর না।  সদস্যরা এখানে ভূমিকা রাখলে সবার কাছে পুষ্টিসেবা পৌঁছানো সহজ হতো। 

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান সীমিত বাজেটের মধ্যেও পুষ্টি উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন সহযোগীসহ অংশীদারদের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে। খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন, ভিটামিন-ডি ঘাটতি নিয়ে গবেষণা এবং মায়ের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। এডিবল অয়েলে ভিটামিন-ডি সংযুক্ত করতে গবেষণা কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য বিশেষ খাদ্য এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা সেবা দিচ্ছি, তবে সেটি হয়তো সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানের হচ্ছে না। আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছি। আমরা একটি সুষম খাদ্য নির্দেশিকা তৈরি করেছি। পুষ্টি সপ্তাহে মানুষের দোরগোড়ায় পুষ্টিবার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। বিশেষ করে শিশু, বাড়ন্ত কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি গ্রহণের বিষয়ে জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।

ডা. রওশন জাহান আখতার আলো 
মাঠ পর্যায়ে পুষ্টিসেবা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় বাধা দক্ষ জনবলের অভাব। অনেক হাসপাতালে পুষ্টি কর্নার থাকলেও প্রশিক্ষিত কর্মী নেই, অথবা বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোয় যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তা ও যাতায়াত সমস্যাও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ব্রেস্টফিডিং কর্নার বা কোল্ড চেইন ব্যবস্থাও নেই। প্রশিক্ষিত জনবল নেই। যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন, অনেক কর্মীকে দুর্গম এলাকায় গিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। যারা কাজ করছেন তাদের, বিশেষ করে নারী কর্মীদের, নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখাটাও চ্যালেঞ্জিং। অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। স্বাস্থ্য খাতে কিন্তু কোল্ড চেইন মেইনটেইন করা জরুরি। ডিজিটালি সংযুক্ত থাকতে ইন্টারনেটও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটবিহীন এলাকায় রোগীর ডেটাবেজ তৈরি করা জটিল। কোথাও কোথাও দেখা যায়, লজিস্টিকস সুবিধা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি আছে, আবার কোথাও একেবারেই নেই। এ ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। 

ড. এএফএম ইকবাল কবীর
গত কয়েক দশকে অগ্রগতি হলেও দেশে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এখনও প্রকট। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, সংক্রামক রোগ এবং অপুষ্টির চাপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ত্রিমাত্রিক জটিলতা।  এই তিনটি চ্যালেঞ্জ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। আবার সংক্রমণও পুষ্টির ঘাটতি আরও বাড়িয়ে তোলে, যা একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। এই চক্র ভাঙতে হলে পুষ্টিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে হবে। উন্নত পুষ্টি যক্ষ্মা চিকিৎসার সাফল্য বাড়ায়, এইচআইভি আক্রান্তদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ম্যালেরিয়ার জটিলতা কমাতে সহায়তা করে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি থাকলে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি এবং কৃষি উৎপাদন হ্রাস খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর। এই বাস্তবতায় কার্যকর পরিবর্তন আনতে পাঁচটি নীতিগত পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া দরকার। এর মধ্যে রয়েছে রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে পুষ্টিকে অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু কৌশলে পুষ্টির সংযোজন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং তথ্য ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা উন্নত করা। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পুষ্টিকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে আনতে হবে। পুষ্টিই হতে পারে স্বনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি। 

ড. তারিকুল ইসলাম 
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণে দৈনিক প্রায় ১১২ টাকা প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এই ব্যয় বহন করা কঠিন হওয়ায় পুষ্টিতে বৈষম্য বিরাজ করছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্বাচনী অঙ্গীকার হলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো। আমারও মনে হয় সেটা খুব প্রয়োজন, বিশেষ করে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে। এ ক্ষেত্রে পণ্যমান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সে জন্য একটি গাইডলাইন দরকার। যদি পুষ্টিপণ্যের মান ঠিক না থাকে, যদি সেগুলো সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না থাকে এবং যারা এ খাতে যুক্ত তারা যদি জবাবদিহিতার মধ্যে না থাকে, তাহলে খুব একটা লাভ হবে না। এটা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে। আমরা যদি এখনও মনে করি পুষ্টি কার্যক্রমকে অনুদাননির্ভর রাখব, তাহলে সেটা ঠিক হবে না। আমাদের আগামী প্রজন্ম স্কুলে গিয়ে বাইরের যেসব খাবার খায়, সেগুলোর পুষ্টিমান কী সেটা নিয়ে ভাবতে হবে? ঘরে তো বটেই, বাইরের খাবারেরও পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে একটা রেভ্যুলেশন প্রয়োজন। যাই বলি না কেন দিন শেষে বাজার থেকেই তো আমাদের খাদ্যপণ্য কিনতে হবে। ফলে যেন আমার প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য যেন মানসম্মত হয়, ক্রয়সীমার মধ্যে থাকে, যেন সবকিছু জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে– এটি নিশ্চিত করতে হবে। 

ডা. মো. মুনীরুল ইসলাম
আমরা গত ৫০ বছর ধরে একই কথা বলে আসছি পুষ্টি একক কোনো খাতের বিষয় নয়। এটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সব খাতের সঙ্গেই যুক্ত। দেশে বহু এলাকায় এখনও মাল্টিডাইমেনশনাল দারিদ্র্য ও খাদ্য অনিরাপত্তা বিদ্যমান। কিছু অঞ্চলে মৌসুমি খাদ্যসংকট খুবই প্রকট। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে শিশু ও মায়েদের ক্যালরি বা প্রোটিন গ্রহণ তুলনামূলকভাবে ঠিক থাকলেও তা মূলত উদ্ভিদজাত উৎস থেকে আসছে, যা শরীরে শোষণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। অন্যদিকে প্রাণিজ উৎসের খাদ্যের ঘাটতি এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পুষ্টি শুধু খাদ্য গ্রহণের বিষয় নয়, বরং শরীরের ভেতরে শোষণ ও কার্যকারিতার সঙ্গেও জড়িত। এ ক্ষেত্রে ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবেশগত এন্টারিক ডিসফাংশন (ইইডি) নামের সমস্যা দেখা যাচ্ছে, যেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। ফলে পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করলেও শরীরে পুষ্টি শোষণ ঠিকভাবে হয় না। অপুষ্টির পাশাপাশি অতিপুষ্টিও এখন একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শৈশবে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে, যা অপুষ্টি-প্রবণ শিশুদের জন্য আরও ঝুঁকি তৈরি করছে। অধিকাংশ প্রকল্প স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হয় না। প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক উদ্যোগও থেমে যায়। আচরণ পরিবর্তন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শিশুদের খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চল ও হাওরাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি পানিবদ্ধতার কারণে পুষ্টি পরিস্থিতি আরও নাজুক। পুষ্টি কর্মসূচিগুলোকে আরও অভিযোজনযোগ্য হতে হবে, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যায়। 

ডা. একেএম মুসা
দেশে পুষ্টিকে কেবল স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অথচ পুষ্টির সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। পুষ্টিকে ব্যয় হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি তৈরি হলে সব খাতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকলে বড় উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব। স্বল্প সময়ে বড় কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদাহরণ ইতোমধ্যে রয়েছে। পুষ্টির ক্ষেত্রে কী পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে, এটির সমন্বিত কোনো মনিটরিং সিস্টেম নেই। এই সিস্টেম তৈরি জরুরি। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। যারা পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন এবং বাজারজাত করছে তাদের প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। আবার যারা ক্ষতিকর খাবার তৈরি করছে তাদের ওপর বাড়তি করারোপ করা যেতে পারে। 

বেলাল উদ্দীন
পুষ্টি নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে সত্যি, তবে সমন্বয় নেই। যার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপারটা এমন– একটি দল ফুটবল খুব ভালো খেলছে কিন্তু গোল দিতে পারছে না। আমরা আজ পুষ্টি কার্যক্রমে বহুপাক্ষিক অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছি। বাস্তবতা হলো এর প্রয়োজনীয়তা আমরা চিহ্নিত করেছি ১৫ বছর আগে। কিন্তু বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ যোগাযোগে দুর্বলতা। বাইরের যোগাযোগের কথা বাদ দিন– মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যেই মাল্টিসেক্টরাল সল্যুশন হচ্ছে না। কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যেই পুষ্টিকে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেবল পুষ্টি-সংবেদনশীল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। আমরা বলছি, পুষ্টিতে ১ ডলার ব্যয় করলে ফল পাওয়া যাবে ২৩ ডলারের। কিন্তু এ বিষয়টি আমরা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা ফলাফল নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি। এই ব্যর্থতা আমাদের স্বীকার করতে হবে এবং এদিকে মনোযোগ দিতে হবে। 

 

ড. আলী আব্বাস মোহাম্মদ খোরশেদ
বাংলাদেশে পুষ্টিকে এখনও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দেখা হয়। এটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। পুষ্টিকে আমরা অনেক সময় কেবল স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার ভিত্তি। পুষ্টিকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের নীতিগত অঙ্গীকার প্রয়োজন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি হলে নীতি ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। পুষ্টি কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। বর্তমানে জাতীয় পুষ্টি পরিষদ সমন্বয়ের কাজ করলেও তাদের ক্ষমতা মূলত নীতিগত ও পরামর্শমূলক পর্যায়ে সীমিত, বাস্তবায়ন বা প্রয়োগের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সম্ভব নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে পুষ্টি উন্নয়নের সঙ্গে শর্তযুক্ত করলে তা আরও কার্যকর হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের সমন্বয়ে খাদ্যের পুষ্টিবৃদ্ধিকরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

সাইকা সিরাজ
জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত অর্থায়ন থেকে পুষ্টি খাতে  সম্পদ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন ও নীতিগত সমন্বয় প্রয়োজন। বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত কতটা দেশে আসে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নের  একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ বাস্তবে নিশ্চিত হয়েছে। এই অর্থেরও কতটা কমিউনিটি পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তার কার্যকর প্রভাব কী, তা নিয়ে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন। সম্প্রতি জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি)-তে প্রথমবারের মতো পুষ্টিকে অন্তর্ভুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে জলবায়ু অর্থায়নের প্রবাহকে পুষ্টি খাতে সুনির্দিষ্টভাবে সংযুক্ত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এটি এখনও পুষ্টি বা স্বাস্থ্য সমস্যাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে  স্বীকৃতি দেয় না। অথচ উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং জলবায়ুজনিত চাপ শিশুদের অপুষ্টি ও স্টান্টিংয়ের মতো সমস্যাকে তীব্র করছে। আমাদের কাছে প্রমাণ আছে, কিন্তু সেই তথ্য-উপাত্ত এখনও জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামোগত চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রয়োজনীয় ফান্ডিং এক্সেস করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু-সংবেদনশীল পুষ্টি গবেষণা ও তথ্য ব্যবস্থায় ক্লাইমেট কম্পোনেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। তা না হলে আগামী ১০ বছর পরও এই খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হবে। নীতিগত পর্যায়ে জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি, এনডিসি এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে নীতিতে প্রতিফলিত করতে হবে।  বিনিয়োগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্নকে জলবায়ু প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে পুষ্টি খাত আরও বেশি অগ্রাধিকার পায়। ভবিষ্যতে কেবল অনুদাননির্ভর অর্থায়ন নয়, বরং ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ও কনসেশনাল লোনের মতো নতুন অর্থায়ন কাঠামোর দিকে যেতে হবে। বড় আকারের আন্তর্জাতিক তহবিলের পাশাপাশি স্থানীয় সিভিল সোসাইটি ও কমিউনিটি পর্যায়ের উদ্যোগগুলোকে অর্থায়নের আওতায় আনতে কার্যকর লিংকেজ তৈরি করতে হবে। এতে পুষ্টি খাতে জলবায়ু অর্থায়নের প্রকৃত সুফল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

ডা. আফসানা হাবিব শিউলী
বাংলাদেশে পুষ্টি খাতে অনেক প্রকল্প দাতানির্ভর ও স্বল্পমেয়াদি, যা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে যথাযথভাবে যুক্ত নয়। ফলে প্রকল্প শেষ হলে কার্যক্রমও অনেক ক্ষেত্রে থেমে যায়। সীমিত বাজেট সঠিকভাবে ব্যবহার এবং নিম্ন ব্যয়ের কার্যকর উদ্যোগে গুরুত্ব দিলে বিদ্যমান সম্পদ দিয়েই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। এ ছাড়া বাজেট ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রকিউরমেন্ট ও বাস্তবায়ন জটিলতা কমানো এবং সমন্বিত মনিটরিং ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পুষ্টি খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বাড়ানো দরকার। এ ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিকর খাদ্য ও পানীয়ের ওপর বেশি কর আরোপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে সেটা পুষ্টি কার্যক্রমে ব্যয় করা যায়। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে পুষ্টি খাতকে যুক্ত করা এবং জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এই খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো সম্ভব।

 

ডা. মো. আজিজ খান 
মাতৃপুষ্টি নিয়ে গত বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপে উঠে আসে, প্রতি দুজন গর্ভবর্তী মায়ের একজন রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। গর্ভাবস্থায় ৪০ শতাংশ মা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত চেকআপ, পুষ্টি এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেবা তথা অ্যান্টেনাটাল কেয়ার (এএনসি) পান। তবে কোয়ালিটির প্রশ্নে সেটি ২১ শতাংশে নেমে আসে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিশু এবং মায়েদের মানসম্মত পুষ্টিসেবা কীভাবে দেওয়া যায় সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। নামমাত্র সংখ্যার পরিবর্তে কোয়ালিটির দিকে নজর দিতে হবে।
পুষ্টি খাতে সরকারি বিনিয়োগ সীমিত এবং অধিকাংশ কর্মসূচি দাতানির্ভর। টেকসই উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পুষ্টির কার্যকর সমন্বয় জরুরি। পুষ্টিকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। পুষ্টিকে জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডায় অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও বাজেটে এর প্রতিফলন থাকে।

ডা. মিথুন গুপ্তা
সংক্রামক রোগ, বিশেষ করে টিবি (যক্ষ্মা) নিয়ন্ত্রণে পুষ্টি নির্ধারক ভূমিকা রাখে, যা নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন উভয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত থেকে স্পষ্ট যে অনেক ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও বাস্তবায়নগত ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী এবং স্টান্টিংয়ের শিকার শিশুদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ও সমন্বিত ইন্টারভেনশন আরও জোরদার করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পুষ্টিকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে। তবে বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখনও পুষ্টি সেবা যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে এখনও স্বাস্থ্য সহকারীদের কাজের মধ্যে পুষ্টি বিষয়টি পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কমিউনিটি পর্যায়ে শিশুদের উচ্চতা ও ওজন পরিমাপসহ মৌলিক পুষ্টি সেবার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী এসব সেবার বাইরে রয়ে গেছে। স্থানীয় সরকার, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু বড় কোম্পানি নয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। তারা নিজেদের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও ওয়াশবিষয়ক সচেতনতামূলক তথ্য দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে। এই উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে শেষ প্রান্তের জনগোষ্ঠীর কাছেও কার্যকরভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবাকে একীভূত করে টেকসই ও স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য মডেল গড়ে তুলতে হবে। 

প্রতীক এজাজ 
পুষ্টি বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে গণমাধ্যমের ভূমিকা  গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তথ্যভিত্তিক, নির্ভুল প্রতিবেদন তৈরি হয়। এই লক্ষ্যে সেমিনার, কর্মশালা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। পুষ্টিবিষয়ক রিপোর্টিংকে উৎসাহিত করতে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ফেলোশিপ চালু করা যেতে পারে। 

 

 

মোহাম্মাদ হাফিজুল ইসলাম
পুষ্টি খাতে সফলতা পেতে  শুধু কাঠামো নয়, বরং সেবা ব্যবস্থাপনা, জনসম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার সবকিছুরই সমন্বয় প্রয়োজন। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তুলনামূলকভাবে পুষ্টি খাতে বরাদ্দ এখনও সীমিত। পুষ্টি ও স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বন্যা ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বছরের একটি বড় সময় স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা ব্যাহত হয়। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে কার্যকর করতে হলে সেখানে প্রশিক্ষিত সেবা প্রদানকারী, শক্তিশালী সমন্বয়, ডেটাবেজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আচরণ পরিবর্তন কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে হবে, যাতে মানুষ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়। রোগী বা সেবাগ্রহীতা যেন একটি কেন্দ্র থেকেই পুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনার মতো সমন্বিত সেবা পায় এমন ‘ওয়ান স্টপ’ মডেল গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদকে এই ব্যবস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। কেবল নীতি নয়,  একই সঙ্গে বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা না বাড়ালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।  

ড. সানথিয়া আইরিণ
পুষ্টিসেবার মূল তিনটি উপাদান– সোশ্যাল বিহেভিয়ার চেঞ্জ (এসবিসি), গ্রোথ মনিটরিং এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্টেশন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিশেষ করে অ্যান্টেনাটাল কেয়ার (এএনসি) সেবার কাভারেজ সীমিত। পুষ্টি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনেক সময়ই গর্ভবতী নারীদের কাছে পৌঁছায় না। এখনও  নিয়মিত গ্রোথ মনিটরিং বা প্রতিরোধমূলক সেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। পারিবারিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জেন্ডার বৈষম্য বড় বাধা। যেসব পরিবারে নারীরা খাদ্য কেনার সিদ্ধান্তে অংশ নেন, সেসব পরিবারের খাদ্য বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে বেশি। কিছু সামাজিক কুসংস্কার গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণেও বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কিছু মাছ ও ফল খাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা এখনও অনেক এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুষ্টি সেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এআইভিত্তিক সমাধান, এসএমএস ও ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দিলে শেষ প্রান্তের জনগোষ্ঠীকে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে। খাদ্যাভ্যাস, কুসংস্কার, লিঙ্গ বৈষম্য ও কম সচেতনতা পুষ্টি উন্নয়নের বড় বাধা। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী মা ও শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মো. আবুল বাসার চৌধুরী 
পুষ্টি উন্নয়নে খাদ্য বৈচিত্র্য, সাপ্লিমেন্টেশন এবং ফুড ফর্টিফিকেশন (পুষ্টিবৃদ্ধিকরণ)– এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এসব উদ্যোগ একীভূতভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে টেকসই পুষ্টি উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে ভিটামিন-ডি ঘাটতি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ এই অভাবজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ভোজ্যতেলে ভিটামিন-এ-এর পাশাপাশি ভিটামিন-ডি যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে বিএসটিআই। ফুড ফর্টিফিকেশন কার্যক্রমকে কার্যকর করতে হলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এ খাতে বাজেট বরাদ্দও বাড়াতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ফল পাওয়া যায়। পুষ্টিতে বিনিয়োগের সমন্বিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে এবং তার ফল কী তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না। এজন্য কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা জরুরি।

 

শেখ রোকন
পুষ্টি শুধু একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি একটি সামগ্রিক উন্নয়ন ইস্যু। একটি জাতির মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার জনগণের পুষ্টিগত অবস্থার ওপর। তাই পুষ্টিকে স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষি, শিক্ষা, অর্থনীতি ও জলবায়ু– সব খাতের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা জরুরি। বাংলাদেশে আমরা একদিকে অপুষ্টি, অন্যদিকে অতিপুষ্টি– এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শহর ও গ্রাম, ধনী ও দরিদ্র সব স্তরেই পুষ্টি বৈষম্য বিদ্যমান। এ বাস্তবতায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং সচেতনতা তৈরি, আচরণগত পরিবর্তন আনতে সহায়তা করা এবং নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করা।

 

 

সুপারিশ

পুষ্টিকে ব্যয় নয়, জাতীয় উন্নয়নে বিনিয়োগ বিবেচনায় সব খাতের কেন্দ্রীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোর মধ্যে পুষ্টিসেবা জোরদার করা
গ্রামের পাশাপাশি নগরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিও সমান গুরুত্ব প্রদান
পুষ্টি উন্নয়ন প্রচেষ্টায় বেসরকারি খাত ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি
পুষ্টি উন্নয়নকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ
জলবায়ু পরিবর্তন ও পুষ্টিকে একীভূত করা
খাদ্য ফোর্টিফিকেশন (পুষ্টিবৃদ্ধিকরণ) ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট কর্মসূচি সম্প্রসারণ
প্রতিকূলতা ও ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী ও শিশুকেন্দ্রিক পুষ্টি সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া
টেকসই অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা
ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও ডেটা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা


সভাপতি

শাহেদ মুহাম্মদ আলী
সম্পাদক, সমকাল

 প্রধান অতিথি

ডা. মো. রিজওয়ানুর রহমান
মহাপরিচালক
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ কার্যালয়

বিশেষ অিতিথ

ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী
পরিচালক, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান 

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক 

ড. এএফএম ইকবাল কবীর
সাবেক কনসালট্যান্ট, বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফ

আলোচক

ডা. রওশন জাহান আখতার আলো
উপপরিচালক, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান 

ড. তারিকুল ইসলাম
কান্ট্রি ডিরেক্টর, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন

ডা. মো. মুনীরুল ইসলাম
 বিজ্ঞানী, পুষ্টি গবেষণা বিভাগ, আইসিডিডিআর,বি

ডা. একেএম মুসা
কান্ট্রি ডিরেক্টর, নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল 

বেলাল উদ্দীন
কান্ট্রি লিড কমিউনিকেশন, কোওয়াটার

ড. আলী আব্বাস মোহাম্মদ খোরশেদ
সহযোগী অধ্যাপক, পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

সাইকা সিরাজ
ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড প্রধান, ব্র্যাক 

ডা. আফসানা হাবিব শিউলী
পুষ্টি ও স্বাস্থ্যপ্রধান, হেলেন কেলার 

ডা. মো. আজিজ খান
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ

ডা. মিথুন গুপ্তা
কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন

প্রতীক এজাজ
সভাপতি, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম

মোহাম্মাদ হাফিজুল ইসলাম
টিম লিডার– পুষ্টি, কেয়ার বাংলাদেশ 

ড. সানথিয়া আইরিণ
উপপরিচালক, ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি 

মো. আবুল বাসার চৌধুরী
 কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন) 

সঞ্চালনা

শেখ রোকন
সহযোগী সম্পাদক, সমকাল

সমন্বয়

হাসান জাকির
হেড অব ইভেন্টস, সমকাল

আরও পড়ুন

×