নগরমুখী জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
কারিতাস বাংলাদেশ ও সমকাল আয়োজিত নগর জলবায়ু অভিযোজন: সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি চ্যালেঞ্জ ও করণীয় শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৭:০৯ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৯:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকা থেকে দুর্গত মানুষ রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানসহ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। নগরমুখী জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন এই খাতে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা। গত ১৫ এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে ‘নগর জলবায়ু অভিযোজন: সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কারিতাস বাংলাদেশ ও সমকাল যৌথভাবে এর আয়োজন করে।
অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় বিগত সময়ে ৭০০ কোটি টাকার ফান্ড করা হয়েছিল। ডেল্টা প্ল্যান এবং লস অ্যান্ড ডেমেজ প্রজেক্টও নেওয়া হয়েছিল। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে এগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাস্তব সমস্যা। এর সমাধানও বাস্তবতার আলোকে হতে হবে। বিশ্বের জনসংখ্যা বর্তমান হারে বাড়তে থাকলে ২০-৫০ বছর পর কৃষি উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিকল্পনা নিতে হবে।
উদ্বাস্তুদের প্রতি মানবিক হতে হবে, জেন্ডার সংবেদনশীল হতে হবে। জলবায়ুর জন্য যারা উদ্বাস্তু হন, তাদের ওই এলাকায়ই থাকতে উৎসাহিত করতে হবে। কারণ জনবিস্ফোরণের এই দেশে কাকে রেখে কাকে পুনর্বাসন করবেন?
জলবায়ু অভিযোজনের প্রভাবে এখনই বিশ্বের তাপমাত্রা ১ থেকে দেড় শতাংশ বেড়েছে। ৫০ বছর পর ৩ শতাংশ এবং শতাব্দী শেষে সাড়ে তিন শতাংশ
বাড়বে। গবেষণা বলছে–২ শতাংশ বাড়লেই বিশ্বে খাদ্য সংকট দেখা
দেবে। ফলে ২০-৫০ বছর পর কৃষি ওলটপালট হয়ে যাবে। চালের দাম এতটাই বাড়বে যে নাগালের বাইরে চলে যাবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে।
দেশের জনসংখ্যা এখনই ১৮ কোটি, সেটিও কমিয়ে বলা হয়। বাস্তবে হয়তো জনসংখ্যা ২০ কোটি। ২০-৫০ বছর পর কত হবে? সেটি মাথায় রেখেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিতে হবে।
ড. তাসনিম সিদ্দিকী
উদ্বাস্তুরা মাইগ্রেট, কিন্তু তারাও এক ধরনের বাস্তুচ্যুত অভিবাসী। জলবায়ু অভিযোজন, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর প্রচুর মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছেন। তার জায়গা থেকে যারা অন্যত্র সরে যাচ্ছেন, তারাই মাইগ্রেট। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনই কোনো পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সাল নাগাদ সারাবিশ্বে ২১ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে পারে; যার মধ্যে চার কোটি দক্ষিণ এশিয়ার। বাংলাদেশের এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশে কেবল ২০২৪ সালেই ২৪ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এখন বাস্তুচ্যুত মানুষ কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন তিনি বেছে নেন। সেটি তার অধিকার। বেশির ভাগ মানুষই পছন্দের ভিত্তিতে মাইগ্রেট করেন। তবে বাধ্য হয়েই তাদের অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অবৈধ আশ্রয় নিতে হয়।
২০২১ সালে দেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি নেওয়া হয়েছে, এটির বাস্তবায়নে অ্যাকশন প্ল্যানও নেওয়া হয়েছে। দুঃখজনক হচ্ছে, এই ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যদিও কিছু ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের এখনও কোনো ভয়েস নেই, তারা ভয়েসলেস। তাদের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও তাদের ভয়েস নেই। যার কারণে সমাজ তাদের এখনও দূরে সরিয়ে রেখেছে। সরকার এ জায়গায় কাজ করতে পারে। রাষ্ট্র যদি জায়গা করে দেয়, তাহলেই কেবল তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন হতে পারে।
সাবিনা খাতুন
২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার কারণে ভিটামাটি হারিয়ে খুলনার কয়রা থেকে খুলনা শহরে এসেছি। আইডি কার্ড না থাকায় কোনো সুযোগ-সুবিধা পাইনি। আমার স্বামী একজন অটোচালক। আমি একটা লাইসেন্স তৈরি করব। তাও বলে হবে না, এখান থেকে কোনো সুবিধাই পাবেন না। টিসিবি কার্ড থেকে শুরু করে কোনো কিছুই পাইনি এই ১৭ বছরে। আপনারা দেখবেন–এই আইডি কার্ড, টিসিবি কার্ড, লাইসেন্স–এগুলোতে কিছু করা যায় কিনা। আমার মতো এমন হাজার হাজার পরিবার আছে। তাদের পক্ষ থেকে আমার এটি আবদার। এগুলো হলে হাজার হাজার পরিবার বেঁচে যাবে। আমরাও তো এ দেশের নাগরিক, অথচ আমাদের কোনো অধিকার নেই, কথা বলার জায়গা নেই। আমরা যারা বস্তিতে থাকি আমাদের ঘরগুলো অধিকাংশই ঘিঞ্জি, অন্ধকারময় এবং অস্বাস্থ্যকর। বৃষ্টি হলেই বাসাবাড়ির সামনে পানি জমে যায়। অনেক সময় ময়লা পানি ঘরে উঠে যায়। আমাদের টয়লেট ও ভালো ড্রেনের ব্যবস্থা নেয়। রোগব্যাধি লেগেই থাকে। আমাদের সন্তানরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসও সব সময় মেলে না।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
নদীভাঙনে সরকারি হিসাবে এক লাখ আর বেসরকারি হিসাবে ১০ লাখ মানুষ প্রতি বছর উদ্বাস্তু হয়। দেশের ২১ জেলার মানুষ নদীভাঙন, লবণাক্ত পানি ও জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। আরও নতুন নতুন দুর্যোগ হতে পারে। তার জন্যও আগাম সতর্কতা থাকতে হবে।
আমরা বলি, জলবায়ু অভিযোজনে উপকূল প্লাবিত হয়ে যাবে। তাহলে আমরা এই উপকূলের মানুষগুলোকে রক্ষার জন্য তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন বা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করি না কেন? এনজিওগুলো কিছু জায়গায় কাজ করছে, কিন্তু সেটি পাইলটিং হতে পারে। বড় আকারে পদক্ষেপ সরকারি পর্যায়ে নিতে হবে। উদ্বাস্তু মানুষগুলোর আশ্রয় হয় বস্তিতে। বস্তি ভেঙে দেওয়া সহজ।
বস্তিবাসীসহ সব নাগরিকের বাসস্থানসহ সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তাদের গ্রামে ফিরিয়ে নিলেও উপযুক্ত আশ্রয় ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা উদ্বাস্তু হচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে পুনর্বাসন করতে হবে। সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে, সেখানে উদ্বাস্তুদের জন্য আলাদা ক্যাটেগরি রেখে তাদেরও এই সুবিধার আওতায় আনতে হবে। উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দও বাড়ানো দরকার। সরকারের সঙ্গে এনজিও মিলে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দাউদ জীবন দাশ
বর্তমান বাস্তবতায় আমরা সবাই বিশেষ করে যারা নগরে বসবাস করি, তারা উদ্বাস্তু ইস্যুতে বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ইস্যুতে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছি। আমরা দেখি, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২৪ লাখ মানুষ উপকূল থেকে ঢাকাসহ দেশের বৃহত্তম শহরগুলোয় উদ্বাস্তু হয়েছে। প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ শুধু ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উদ্বাস্তু হচ্ছে।
পাশাপাশি বেকারত্ব, পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব এবং নানা গ্রামীণ অর্থনীতিকেন্দ্রিক, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ অন্যান্য সমস্যার কারণেও মানুষ ইন্টারনাল ডিসপ্লেসড হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে শুধু প্রকল্পের মধ্যে নয়, কারিতাস তার সামগ্রিক কার্যক্রমেও সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কীভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে আলোকপাত করবে।
রেজওয়ানুর রহমান
নদীভাঙন, বন্যা বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছেন, তাদের জন্য কেবল ঘর করে দিলেই হবে না। তাদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের
জন্য কৃষিবীমা বা গৃহবীমা চালু করতে হবে।
বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় হলে যারা ঘর-বাড়ি হারান, তাদের আমরা সাধারণত টিন দিয়ে থাকি। জীবিকা হারানোর কারণে তারা বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র চলে যান। নদীভাঙন ঠেকানো খুবই কঠিন। এ কারণে যারা উদ্বাস্তু হন, তাদের একই এলাকার পাশেই কোনো জায়গায় আশ্রয় করে দেওয়া যেতে পারে। নিজ এলাকায় তাদের জীবিকাও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে মাইগ্রেশন হয়ে আসা নগর উদ্বাস্তুদের রিকশা চালানো বা অন্য কোনো কষ্টকর পেশায় জড়িত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হবে না। এ ক্ষেত্রে সবারই সহযোগিতা দরকার।
ড. অঞ্জন কুমার দেব রায়
আমাদের এত সমস্যার মধ্যে মাইগ্রেশনও অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা কারণে এটি হয়ে থাকে। তবে প্রতিবছর কতজন মানুষ মাইগ্রেট করেন, তার কোনো ডেটা আমাদের নেই। মাইগ্রেশনের শিকারদের বড় একটি অংশ ঢাকাসহ নগরে আশ্রয় নেন। এখন ঢাকা শহরের নতুন কোনো লোককে ধারণ করার মতো ক্ষমতাও নেই। এখানে হাঁটা, এমনকি রাস্তা অতিক্রম করার কোনো জায়গাও নেই। গবেষণা অনুযায়ী একটি নগরীতে মানুষের হাঁটাচলার জন্য ৪০ শতাংশ জায়গা থাকার কথা। বাংলাদেশের কোনো শহরেই এটি নেই।
সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, তারা নির্বাচনী ইশতেহারে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কথা বলেছে। তাদের জন্য ফান্ড দেওয়ার কথা বলেছে। নানা কারণে যারা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছেন, তাদের নগরজীবনে বসবাসের বিষয়ে উৎসাহিত করা ঠিক হবে না। স্থানীয়ভাবে রেখে তাদের জীবনমান উন্নয়ন কীভাবে করা যায়, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে
মোস্তাফা মাহমুদ সারোয়ার
উদ্বাস্তুদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের ক্ষেত্রে সরকার আন্তরিক। বস্তিবাসী যারা দীর্ঘদিন বস্তিতে বসবাস করছেন, কিন্তু এনআইডি কার্ড নেই, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য স্থানীয় কাউন্সিলরের প্রত্যয়ণ সাপেক্ষে তাদেরও ৪৬ রকমের তথ্য নিয়ে সুযোগ সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। বস্তিবাসীদের জন্য ৭৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ছোট আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সবার সঙ্গে বসে ও প্রাথমিক স্টাডির মাধ্যমে
এই প্রকল্প নেওয়া, যেখানে স্বল্পমূল্য বা ভাড়ার ভিত্তিতে বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। আর মাইগ্রেশন বিষয়ে তথ্যগত সমস্যার সমাধানও করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে ৪৬ রকমের তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
রিদিতা রকিব
জলবায়ু উদ্বাস্তু বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জার্মান সরকার দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতামূলক কাজ করে আসছে। আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট পোর্টফোলিও আছে, যারা এটা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করেন। কেবল জলবায়ু উদ্বাস্তু, এমন আড়াই লাখ মানুষকে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতা এবং উদ্বাস্তুদের পরিচয় নির্ধারণে জটিলতা গুরুতর সমস্যা তৈরি করছে। ফলে এ ক্ষেত্রটিকে স্বচ্ছ করতে হবে। জেন্ডারবান্ধবও করতে হবে। যাতে অভিবাসী পরিবারগুলোর সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।
এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সব সংস্থার মাধ্যমে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে উদ্বাস্তুদের জীবনমানের উন্নয়ন করা সম্ভব।
ইকবাল হাবিব
জলবায়ু অভিযোজন বা নানা কারণে প্রতিবছর দেশে ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হন। তাদের বড় অংশই নগরের দিকে ধাবিত হন, বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠী যখন লক্ষ্যহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হন, তখন তাদের সামনে কোনো আশাও থাকে না। তাদের অদৃশ্য রেখে বা অনিবন্ধিত রেখে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনাও কোনোভাবেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এটি সরকার বা সংশ্লিষ্টরা যত দ্রুত বুঝতে পারবেন, ততই ভালো।
সবাই কেবল প্রকল্প নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু উদ্বাস্তুদের প্রকৃত উন্নয়ন কিসে হবে, সেটি কারও ভাবনায়ই নেই। সরকারের কাছে উদ্বাস্তুর সংখ্যাগত তথ্যও নেই। সিটি করপোরেশনের জরিপে বলা হচ্ছে, ঢাকা মহানগরীতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ৬ শতাংশ বস্তিতে থাকেন। অথচ ২০২২ সালেই বেসরকারি সংস্থাগুলোর জরিপে দেখা গেছে, তখনই নগরীর অধিবাসীদের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বস্তিবাসী। এ ধরনের প্রচারণা থেকে সরে আসতে হবে। সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্যেরে ভিত্তিতে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। একটি সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব নগর উদ্বাস্তু তথা নগর দরিদ্রদের জন্য নগরভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সব ধরনের মৌলিক চাহিদা পূরণকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বহুমুখী কার্যক্রমের সমন্বয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি সমন্বিত ও অন্তর্বর্তিতা পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের এখনই সময়।
আলেকজান্ডার ত্রিপুরা
জলবায়ু উদ্বাস্তুদের নিয়ে কারিতাস বাংলাদেশের গত ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের কাজের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, জলবায়ুবিষয়ক সরকারের নীতিমালা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত কর্মসূচি ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ে কার্যকর কোনো কাঠামো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী বা জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যেরও ঘাটতি রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে এ-সংক্রান্ত আমরা যেসব তথ্য পাই সে অনুসারে দেখলে দেখা যায়, তাদের ৪২ শতাংশ মানুষ এখন শহরে বাস করে। যাদের ৫৪ শতাংশ আবার বস্তিতে বাস করে। তাদের বসবাসের ঘনত্ব স্বাভাবিক ঘনত্বের চেয়ে ৬-৭ গুণ বেশি। তাদের জন্য কাজ করতে গিয়ে আবার নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১’ অনুসরণ করে জলবায়ু উদ্বাস্তুসংক্রান্ত সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা সরকার ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে অংশীদার হতে চাই। এ ক্ষেত্রে সকল সমমনা অংশীজনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের যথাযথ ক্ষেত্র ও পরিবেশ তৈরি করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে।
সোহরাব হাসান
অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের দায়িত্ব প্রধানত রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের কাছে কি কোনো হিসাব আছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর কতজন অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হন এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য রাষ্ট্র কী করছে? এখন সংখ্যাটাই যদি না জানি, তাহলে চলবে? কেউ উপকূল, উত্তরাঞ্চল বা পার্বত্য চট্টগ্রাম যেখান থেকেই আসুন না কেন, রাষ্ট্রের সহায়তায় এখানে আসার সুযোগ পান? তারা তো নিজেদের উদ্যোগেই আসেন এবং এখানে আসার পর আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতায় প্রথমেই তাদের ঠিকানা হয় বস্তি। যেখানে মানুষের বসবাসের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধাগুলো একেবারেই নেই। স্বাস্থ্যসেবা নেই, শিক্ষা নেই, বাসস্থানগুলো একেবারেই অনিরাপদ। অনেকগুলো ‘অ’ তাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। অনিরাপদ, অনিশ্চিত, অমানবিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকারও তারাই বেশি হন।
উদ্বাস্তুরা যে এলাকার বস্তিতে আশ্রয় নেন, সেই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধিরা আছেন। এই জনপ্রতিনিধিরা কী করছেন–এই প্রশ্ন তৃণমূল থেকেও ওঠাতে হবে। রাষ্ট্র ছাড়াও যারা জনপ্রতিনিধি হচ্ছেন বা হতে চাইছেন, তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে–নির্বাচিত হলে উদ্বাস্তুদের জন্য কী করবেন। সেটির বাস্তবায়নও করাতে হবে। কার কী স্বপ্ন আছে জানি না, তবে সম্মিলিতভাবে সবার স্বপ্নগুলো জনগণের স্বপ্নের সঙ্গে একীভূত হলে, সেটিই সবার জন্য স্বস্তির হবে। না হলে যারা উদ্বাস্তু হয়েছেন, তাদের জন্য মঙ্গলের কিছু হবে না।
দোলন যোসেফ গমেজ
মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী শিশু ও নারী। এখানে কাজের ক্ষেত্রে যে গ্যাপটা রয়ে যায়, সেটি হচ্ছে আমাদের পলিসি, স্ট্র্যাটেজি এবং স্ট্রাকচার। অর্থাৎ আমরা দেখতে পাই, ২০২২ সালে যে ডিসপ্লেসমেন্ট প্ল্যানটা আমাদের হয়েছে ২০ বছরের জন্য, সেটি কিন্তু সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সেটির ইমপ্যাক্ট পড়ে শিশু, তরুণসহ বড় জনগোষ্ঠীর ওপর। যে নারীরা বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেন, তাদের ওপরও প্রভাব পড়ে। আবার যে কোনো কারণেই হোক, আগুন লেগে যখন বস্তিগুলো পুড়ে যায় কিংবা উচ্ছেদ হয়, তখন এই উদ্বাস্তুরা আবারও উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। কিন্তু আগুনে বা উচ্ছেদ হলে দ্বিতীয়বার উদ্বাস্তু হওয়া এই মানুষগুলোর জন্য কোনো পলিসি নেই। নগর উদ্বাস্তুদের বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের জায়গায় কী হচ্ছে–সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের প্রধান ভূমিকা থাকতে হবে। আমাদের মাইগ্রেশন পলিসি স্ট্র্যাটেজিও করতে হবে।
শেখ রোকন
সবাইকে ধন্যবাদ, আজকে দীর্ঘ সময় ধরে এই আলোচনা শুনেছেন। আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে এই আলোচনার প্রতিফলন দেখতে চাই। সমকাল এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করবে। আজকের গোলটেবিল বৈঠক নিয়ে এক পাতার ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। আশা করি, এই জলবায়ু পরিবর্তন, অভিযোজন ও এ থেকে সামাজিক সুরক্ষা ইস্যুতে সবাই আমরা একসঙ্গে কাজ করব। এসব উদ্যোগসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনও আসবে।
সুপারিশ
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০২১ সালে গৃহীত জাতীয় কৌশলপত্র
যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাস্তুচ্যুতদের প্রতি মানবিক ও জেন্ডার সংবেদনশীল হতে হবে। জলবায়ুর জন্য যারা বাস্তুচ্যুত হন, তাদের ওই এলাকায়ই থাকতে উৎসাহিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করে পুনর্বাসন করতে হবে। উপযুক্ত আশ্রয় ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তুচ্যুতদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়নে কৃষিবীমা বা গৃহবীমা চালু
করতে হবে।
বাস্তুচ্যুতদের সঠিক সংখ্যা ও চাহিদা নিরূপণ করে পরিকল্পনা নিতে হবে।
সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে, সেখানে বাস্তুচ্যুতদের জন্য আলাদা ক্যাটেগরি রেখে তাদেরও এই সুবিধার আওতায় আনতে হবে।
সভাপতি
শাহেদ মুহাম্মদ আলী
সম্পাদক, সমকাল
স্বাগত বক্তব্য
দাউদ জীবন দাশ
নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ
মূল প্রবন্ধ
ড. তাসনিম সিদ্দিকী
চেয়ারপারসন, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)
আলোচক
অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও উপদেষ্টা
সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
প্রধান নির্বাহী, বেলা
সাবেক উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তী সরকার
রেজওয়ানুর রহমান
মহাপরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
ড. অঞ্জন কুমার দেব রায়
অতিরিক্ত সচিব, পরিকল্পনা কমিশন
মোস্তাফা মাহমুদ সারোয়ার
উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)
সমাজসেবা অধিদপ্তর
রিদিতা রকিব
উপদেষ্টা, ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন
জার্মান দূতাবাস
স্থপতি ইকবাল হাবিব
নগরবিদ
সোহরাব হাসান
সম্পাদক, চরচা ডটকম
দোলন যোসেফ গমেজ
পরিচালক, হিউম্যানিটেরিয়ান ইমার্জেন্সি অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাফেয়ার
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ
আলেকজান্ডার ত্রিপুরা
প্রধান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
কারিতাস বাংলাদেশ
সাবিনা খাতুন
উদ্বাস্তু প্রতিনিধি, খুলনা
সঞ্চালক
শেখ রোকন
সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
সমন্বয়
হাসান জাকির
হেড অব ইভেন্টস, সমকাল
সরোজ পিটার কোড়াইয়া
সমন্বয়ক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
কারিতাস বাংলাদেশ
- বিষয় :
- গোলটেবিল
