ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হেপাটাইটিস নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

হেপাটাইটিস নির্মূলে সমন্বিত  উদ্যোগ জরুরি
×

২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১৭:০০

হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর হারে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ। এমন বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক সর্বজনীন স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু, ব্যাপক জনসচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং টিকা ও চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা জরুরি। 
গত ২৩ জুলাই ‘হেপাটাইটিস: জানুন, পরীক্ষা করুন, চিকিৎসা নিন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসব কথা বলেন। পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি, অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব লিভার ডিজিজেস বাংলাদেশ (এএসএলডিবি) ও সমকাল ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে এ বৈঠকের আয়োজন করে।

অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম
সভাপতি, এএসএলডিবি এবং চেয়ারম্যান, হেপাটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় 

হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বর্তমানে হেপাটাইটিস বি ও সির প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা দেশে পাওয়া যাচ্ছে এবং বিশ্বের সর্বনিম্ন মূল্যের মধ্যে বাংলাদেশেই এসব ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়েছে। দেশীয় ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিক মানের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে শুধু দেশের চাহিদাই পূরণ করছে না, বিদেশেও রপ্তানি করছে। হেপাটাইটিস বির আরও আধুনিক চিকিৎসা বিশ্বে অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায়। অভিজ্ঞতা বলছে, নতুন ওষুধ অনুমোদনের অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো সেটির জেনেরিক সংস্করণ দেশের মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে সক্ষম হবে। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের হেপাটাইটিস বি টিকার কাভারেজ এখন ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, যা বিশ্বের সফল দেশগুলোর কাতারে বাংলাদেশকে স্থান দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশে হেপাটাইটিস বি ও সির প্রাদুর্ভাব প্রায় ৯ শতাংশ থেকে কমে ৫.১ শতাংশে নেমে এসেছে। এখন ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। সরকার, স্বাস্থ্য খাত, গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মিসর ও তাইওয়ানের অভিজ্ঞতার মতো জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করে সবাইকে পরীক্ষা এবং সংক্রমণমুক্ত ব্যক্তিদের টিকার আওতায় আনতে পারলে বাংলাদেশেও হেপাটাইটিস নির্মূল করা সম্ভব।

আমাদের ২৫ লাখ তরুণ-তরুণী আছে, যারা চাকরিপ্রার্থী, যাদের হেপাটাইটিস বি আছে। এটা অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত যে কারও এইচবিএসএজি পজিটিভ হলে তাঁকে চাকরির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।  ব্যাংক, মোবাইল কোম্পানিসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এইচবিএসএজি পজিটিভ হলে চাকরি দেওয়া হয় না। এটা কুসংস্কার। কারণ, হেপাটাইটিস বি থালা-বাটি বা জামাকাপড়ের মাধ্যমে ছড়ায় না, হ্যান্ডশেক করলে বা কোলাকুলি করলে এটা ছড়ায় না, এটা ছোঁয়াচে নয়। এই যে একটা কুসংস্কার দেশে প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে, এটা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। 

চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে চাকরিপ্রার্থীর স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা ঠিক করার জন্য এইচবিএসএজি লাগে না। আমেরিকান লিভার অ্যাসোসিয়েশনের এক্স-প্রেসিডেন্ট প্রফেসর অ্যানা লক তারাসহ মধ্যপ্রাচ্যে এটাকে ইমপ্লিমেন্ট করার চেষ্টা করছে যে ফিটনেসের জন্য এইচবিএসএজি আর পরীক্ষা করা হবে না।  মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে যদি আমরা কনভিন্স করাতে পারি তাহলে দেশের জন্য খুবই উপকার হবে।

অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম
ভাইস প্রেসিডেন্ট, এএসএলডিবি এবং বিভাগীয় প্রধান, লিভার ও 
গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল

ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হেপাটাইটিস বি ও সি-জনিত লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারে ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও রোগ দুটি পুরোপুরি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা– দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসার আওতা বৃদ্ধি এবং নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধ। বাংলাদেশে জন্মের সময় হেপাটাইটিস বি টিকার শতভাগ কাভারেজ, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি নির্মূল করা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে দেখা যাচ্ছে,  বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে মৃত্যুর শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, হেপাটাইটিস সি-জনিত সংক্রমণের হার ও মৃত্যু দেশে অনেক কমে এসেছে। তবে সরকার যদি যক্ষ্মার ওষুধের মতো হেপাটাইটিস সি ওষুধও রোগীদের বিনামূল্যে দেয়, তবে এটি নির্মূল করা সম্ভব। ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি হুমকি হিসেবে একে নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি বর্তমানে সঠিক পথে নেই। ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য কার্যকর ও প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ ইতোমধ্যে বিদ্যমান। তবে এসব কর্মসূচির দ্রুত ও ব্যাপক সম্প্রসারণ এখন জরুরি। এর মাধ্যমেই ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি হুমকি হিসেবে নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক
যুগ্ম সম্পাদক, এএসএলডিবি এবং বিভাগীয় প্রধান, লিভার বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ

হেপাটাইটিস এমন একটি রোগ, যা সময়মতো প্রতিরোধ ও চিকিৎসা না হলে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর এবং লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতার কারণ হতে পারে। তবে আশার কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ রোগ প্রতিরোধযোগ্য। হেপাটাইটিস এ এবং ই সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমিত রক্ত, অপরিষ্কার সূচ, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন এবং অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই শুধু চিকিৎসাসেবা নয়; সামাজিক সচেতনতাই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অনেকের মধ্যে এখনও ভুল ধারণা রয়েছে– হেপাটাইটিস স্পর্শ, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া বা হাত মেলানোর মাধ্যমে ছড়ায়। এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ও সুচের ব্যবহার, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা ও ডেন্টাল যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে নিরাপদ ও কার্যকর টিকা রয়েছে। তাই নবজাতকসহ ঝুঁকিপূর্ণ সব মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি ও সির ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব এবং হেপাটাইটিস বি দীর্ঘ মেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। সচেতনতা, টিকাদান, নিরাপদ স্বাস্থ্যচর্চা, সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার মাধ্যমে হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. এ বি এম শাকিল গনি
যুগ্ম সম্পাদক, এএসএলডিবি 
বিভাগীয় প্রধান, লিভার বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

হেপাটাইটিস বি টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। টিকা লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়। কারণ, হেপাটাইটিস বি অনেক ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিস হওয়ার আগেই ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। দেশে টিকাদানের কাভারেজ প্রায় ৯৮ শতাংশ। তবু এখনও প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বহন করছেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ১৯-২০ বছর বয়সীদের মধ্যে দেখা গেছে, টিকা নেওয়া সত্ত্বেও মাত্র ২৮ শতাংশের শরীরে পর্যাপ্ত সুরক্ষা রয়েছে এবং প্রতি ২০০ জনে একজন হেপাটাইটিস বি-পজিটিভ। এ কারণে শুধু টিকা নয়; পরীক্ষাও জরুরি। দেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম প্রায় ১৮ লাখ নারী হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত। অথচ অধিকাংশই তা জানেন না। অন্তঃসত্ত্বা নারীর হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে মা থেকে শিশুর সংক্রমণ কমানো সম্ভব। নবজাতককে দ্রুত টিকা ও হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবিউলিন দিলে ২০৩০ সালের নির্মূল লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে। প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক মানুষের জীবনে অন্তত একবার হেপাটাইটিস বি, সি পরীক্ষা করা উচিত। যাদের সংক্রমণ নেই, তাদের টিকা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী, অন্তঃসত্ত্বা, ডায়ালাইসিস রোগী, নিয়মিত রক্ত গ্রহীতা, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী, কারাবন্দি ও হেপাটাইটিস রোগীর পরিবারের সদস্যদের অবশ্যই স্ক্রিনিং ও প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা নিতে হবে। হেপাটাইটিস এ টিকাকে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয় এখন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। 

ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন
সাংগঠনিক সম্পাদক, এএসএলডিবি এবং সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

দেশে হেপাটাইটিস বি এখনও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ২০০৩ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হেপাটাইটিস বি টিকা অন্তর্ভুক্তির পর সংক্রমণের হার কমেছে। ১৯৮৪ সালে দেশে আক্রান্তের হার ছিল ৯.৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে অধ্যাপক শাহিনুল স্যারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্তের হার ৫.১%। আক্রান্তের দিক থেকে পুরুষের সংখ্যা নারীর চেয়ে বেশি। গ্রামের চেয়ে শহরে আক্রান্তের হার অধিক। দেশে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৫৭ লাখ এবং নারী ২৮ লাখ। আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। অনেক পরিবারে মা-বাবা এবং তাদের সন্তানরাও আক্রান্ত। প্রায় ১৫ লাখ পরিবার বি ভাইরাসে আক্রান্ত। কর্মক্ষম তরুণ-তরুণী ও প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক। সঙ্গে হেপাটাইটিস সি-ও লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ। এ বছরের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য– ‘হেপাটাইটিস : লেট’স ব্রেক ইট ডাউন’। হেপাটাইটিস নিয়ে যত কুসংস্কার, ভয়, ভ্রান্ত ধারণা, সামাজিক কলঙ্ক ও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে তা দূর করতে হবে। মানুষ যত বেশি সচেতন হবে, তত বেশি পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আসবে; আর তত দ্রুত হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
 

ডা. মো. শাহেদ আশরাফ সেতু
অর্থ সম্পাদক, এএসএলডিবি 
সহকারী অধ্যাপক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ

হেপাটাইটিস শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য বড় অর্থনৈতিক বোঝা। রোগ নির্ণয়, নিয়মিত পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ, চিকিৎসকের পরামর্শ, হাসপাতালে ভর্তি, আইসিইউ, এন্ডোস্কপি, লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা ও প্রয়োজনে লিভার প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয় অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়; ঋণ গ্রহণ বা সম্পদ বিক্রি করতে হয়। একই সঙ্গে রোগীর কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিবার, দেশের উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি ও সির চিকিৎসা অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। একটি হেপাটাইটিস বি রোগীর আজীবন চিকিৎসা ও জটিলতার ব্যয় কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। হেপাটাইটিস সি এবং লিভার প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিপুল ব্যয়ের মুখে পড়তে হয়। তুলনামূলক অল্প খরচে হেপাটাইটিস বির টিকা এবং সময়মতো স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে; চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। হেপাটাইটিস এ-এর ক্ষেত্রেও টিকাদান এবং হেপাটাইটিস ই প্রতিরোধে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন নিশ্চিত করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। 

মো. আহসানুর রহমান
জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক
পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি

হেপাটাইটিস নির্মূলে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো প্রতিরোধ। ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’– এই নীতিই হেপাটাইটিস বি মোকাবিলার মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক হলো, এখন দেশীয় প্রযুক্তিতেই হেপাটাইটিস বির ভ্যাকসিন উৎপাদন করা হচ্ছে, যা টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় নবজাতকরা হেপাটাইটিস বির টিকা পেলেও ২০০৫ সালের আগে জন্ম নেওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ এই সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের স্ক্রিনিং করে যারা সংক্রমণমুক্ত, তাদের টিকার আওতায় আনা জরুরি। হেপাটাইটিস নিয়ে এখনও নানা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে অপচিকিৎসা বা ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন, যা রোগকে আরও জটিল করে তোলে। এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। হেপাটাইটিস নির্মূলে সরকার, চিকিৎসক, পেশাজীবী সংগঠন, ওষুধ শিল্প, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্ক্রিনিং, সময়মতো চিকিৎসা এবং টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এএসএলডিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সচেতনতামূলক কার্যক্রম বিস্তৃত করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

×