স্বাস্থ্যসেবায় বড় স্বস্তি: নানা চিকিৎসা উপকরণে কর-শুল্ক ছাড়, কমবে রোগীর ব্যয়
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ১৯:২৯ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ২০:৩৬
দেশের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা ব্যয় কমাতে একগুচ্ছ কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে এ কর ছাড়ের কথা জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের রিং, চোখের লেন্স, চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ শিল্পের কাঁচামালে ভ্যাট ও শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। ফলে রোগীদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
ডায়ালাইসিস ফিল্টারে ভ্যাট ও এআইটি প্রত্যাহারে প্রতি সেশনে খরচ প্রায় ৮০০ টাকা কমতে পারে। হার্টের রিংয়ের ভ্যাট প্রত্যাহারে প্রতি রিংয়ে সাশ্রয় হবে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং চোখের লেন্সে খরচ কমতে পারে প্রায় ৫ হাজার টাকা।
চিকিৎসা যন্ত্র উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত এবং ওষুধ শিল্পে ৭৭টি মৌলিক উপকরণে শুল্ক-ভ্যাট ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্রও সম্পূর্ণ কর অব্যাহতির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার বলছে, এসব পদক্ষেপ স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা বাড়াবে।
ডায়ালাইসিসে খরচ কমবে, স্বস্তি পাবেন কিডনি রোগীরা
কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ফিল্টার আমদানির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রতি ডায়ালাইসিস সেশনে রোগীপ্রতি খরচ অন্তত ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
হার্টের রিংয়ে ভ্যাট প্রত্যাহার, রোগীর সাশ্রয় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত
হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ে বিদ্যমান ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রতিটি রিংয়ে রোগীর খরচ সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
চোখের লেন্সে দাম কমতে পারে ৫ হাজার টাকা
চোখের ছানি অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের সরবরাহ পর্যায়ে বিদ্যমান ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে, ফলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
চিকিৎসা যন্ত্র শিল্পে শুল্ক রেয়াত
চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্প খাতের অতি প্রয়োজনীয় কিছু কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য কিছু কাঁচামালে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওষুধ শিল্পে বড় কর ছাড়
দেশীয় ওষুধ শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৭৭টি মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের ৯টি উপকরণ, এপিআই উৎপাদনের ৫১টি এবং রপ্তানিমুখী ১৭টি কাঁচামাল রয়েছে।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের সহায়ক যন্ত্রে কর অব্যাহতির প্রস্তাব
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের চলাচল ও জীবনমান উন্নয়নে ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্র আমদানিতে সম্পূর্ণ শুল্ক, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সহায়ক উপকরণ সহজলভ্য হবে এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর স্বনির্ভরতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে।
বাজেট নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে কর ও শুল্ক ছাড়ের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের রিং, চোখের লেন্স এবং ক্যানসারসহ বিভিন্ন ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর কমানো হলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং অনেক পরিবার আর্থিক স্বস্তি পাবে।
তবে নিশ্চিত করতে হবে যে, এই সুবিধা সরাসরি রোগীদের কাছে পৌঁছায়। এ জন্য কার্যকর বাজার তদারকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক এই সদস্য বলেন, দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য বীমা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে এই পদক্ষেপ দেশীয় ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্র শিল্পের বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনও স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এসব কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছিল বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।
