চীনের টাকায় ২১ হাজার শয্যার ২০ হাসপাতালের পরিকল্পনা
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে চীন। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় চীনের অর্থায়নে দেশে ২১ হাজার শয্যার ২০টি আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব হাসপাতালে লিভার, হার্ট ও ফুসফুস প্রতিস্থাপন, জটিল ক্যান্সারের সমন্বিত চিকিৎসাসহ বর্তমানে দেশে সীমিত বা অনুপস্থিত বিভিন্ন উচ্চতর চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বৈঠকে হাসপাতাল নির্মাণসহ স্বাস্থ্য খাতে চীনের বড় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চীনের অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২০টি হাসপাতাল স্থাপনের বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি হবে এক হাজার শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল। বাকি দুটির একটি হবে দেড় হাজার শয্যার নারী স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং অন্যটি শিশুর জন্য অত্যাধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এ বছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক আলোচনার ভিত্তিতে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি দেবে বাংলাদেশ, আর অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করবে চীন। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও রোবটিক যন্ত্রপাতি সরবরাহেও চীন সহযোগিতা করবে। হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের একটি অংশ চীন থেকে আসতে পারে। সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে হাসপাতালগুলো নির্মাণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে খুলনা, উত্তরাঞ্চল, বৃহত্তর বরিশাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ১০০টি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স ও চারটি মেডিকেল হেলিকপ্টার দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে চীন।
গত ৯ জুন চীনের ইউনান প্রদেশের গভর্নর ওয়াং ইউবোর আমন্ত্রণে কুনমিং সফর করেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। সেখানে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে কায়সার কামাল বলেন, চীনের আধুনিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নকে নতুন গতি দিতে পারে। চিকিৎসা প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। রোবটিক সার্জারির মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তি দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তিনি আশা করেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে তা দুদেশের জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
একই বৈঠকে অংশ নেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য সরকারের নীতিগত পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দেবে। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীরা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে এলে সরকার তাদের সর্বোচ্চ নীতিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নিয়ে চীনের তরফে কিছু শর্ত রয়েছে। দুপক্ষের আলোচনায় অগ্রগতি হলে বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোতে পারে। সরকারের লক্ষ্য জনগণকে স্বল্প বা বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া। বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি রয়েছে এবং বিস্তারিত আলোচনার জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ডাকা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে গিয়ে খরচ করেন বাংলাদেশিরা। দেশে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে এই অর্থের বড় অংশ দেশেই থেকে যাবে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও চিকিৎসাসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ বলেন, বড় অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি হাসপাতাল পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি হাসপাতাল পরিচালনায় বাংলাদেশি জনবলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজন হলে চীনা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে দেশে প্রশিক্ষণ কিংবা বাংলাদেশি চিকিৎসকের চীনে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, শুধু আধুনিক ভবন নির্মাণ করলেই উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হয় না। আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দিতে দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ এবং রোগীবান্ধব সেবার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বড় বিনিয়োগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীনের বিনিয়োগে দেশে তিনটি বড় হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হয়। নীলফামারীতে ১৬ একর জমির ওপর এক হাজার শয্যার একটি হাসপাতালের কাজ চলমান। এ ছাড়া সাভারের ধামরাইয়ে একটি পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামে ৫০০ থেকে ৭০০ শয্যার আরও একটি হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সেখানে একটি বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের কাজও চলমান।
স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে চীনের বিনিয়োগ ও হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। তবে হাসপাতালগুলো কোথায় স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে এখনও আলোচনা চলমান। কয়েক দিনের মধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হবে।
গত জুনে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে হাসপাতালগুলোকে সেবাদানের উপযোগী করার পরিকল্পনা রয়েছে। এমনভাবে হাসপাতাল স্থাপন করা হবে, যাতে রাজধানীর বাইরে উন্নত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা যায়।
- বিষয় :
- হাসপাতাল