জলবায়ু
নদীতে ভেসে আসছে হাজার বছরের পুরোনো কার্বন
আলাস্কার প্রায় শুষ্ক নদীগুলোতেও এখন দেখা যাচ্ছে বরফগলা স্রোত আর্থ ডটকম
আসিফ মাহমুদ খান
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৫৬ | আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আর্কটিক অঞ্চলের পার্মাফ্রস্ট গলে যাওয়ার বিষয়টি এতদিন মূলত জটিল সব হিসাব-নিকাশ ও আশঙ্কার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বরফাবৃত বিশাল এই অঞ্চলের শুভ্র বরফ চাদরের নিচে কত গিগাটন কার্বন জমে আছে, কত দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে ভূমি– এসব পরিসংখ্যানই আলোচনায় প্রাধান্য পেত। তবে নতুন এক গবেষণা এই চিত্র অনেকটা স্পষ্ট করে তুলেছে, নদী ও দিনভিত্তিক পরিবর্তনের মাধ্যমে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস এমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের করা সাম্প্রতিক এই গবেষণায় উঠে এসেছে, আলাস্কার উত্তরাঞ্চলের পার্মাফ্রস্ট গলতে থাকায় নদীগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে পানিপ্রবাহের পরিমাণ। এরই সঙ্গে বাড়ছে দ্রবীভূত জৈব কার্বনের (ডিওসি) প্রবাহ। এর ফলে শুধু স্থলভাগ নয়, উপকূলীয় সমুদ্রিক পরিবেশেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে।
গবেষণাটি আলাস্কার নর্থ স্লোপ অঞ্চলের এক বিশাল এলাকা নিয়ে পরিচালিত হয়েছে, যার আয়তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য উইসকনসিনের প্রায় সমান। এই অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শত শত নদী ও খাল গিয়ে মিশেছে আর্কটিক মহাসাগরের উপসাগর বিউফোর্ট সিতে। ৪৪ বছরের তথ্য ও উচ্চ রেজল্যুশনের মডেল ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীতে পানিপ্রবাহের সঙ্গে বাড়ছে কার্বন বহনের পরিমাণও।
পার্মাফ্রস্টকে সাধারণত স্থায়ীভাবে জমাটবাঁধা মাটি হিসেবে ধরা হয়। তবে এর ওপরের স্তর যা ‘অ্যাকটিভ লেয়ার’ নামে পরিচিত, তা প্রতি বছর গলে এবং আবার জমে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই স্তরটি ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ফলে কয়েক হাজার বছর ধরে জমে থাকা জৈব পদার্থ এখন পানির সংস্পর্শে এসে নদীর মাধ্যমে ভেসে সাগরে যাচ্ছে।
এই কার্বনের একটি বড় অংশ দ্রবীভূত জৈব কার্বন হিসেবে নদীপথে প্রবাহিত হয়। আর্কটিক মহাসাগর ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি ডিওসি গ্রহণ করে। সেখানে এই কার্বনের একটি অংশ ভেঙে কার্বন ডাই-অক্সাইডে রূপ নেয়, যা আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে গিয়ে পৃথিবীর উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করে। গবেষণা অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর প্রায় ২৭ কোটি ৫০ লাখ টন কার্বন কার্বন ডাই-অক্সাইড আকারে বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হচ্ছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ভূ-বিজ্ঞানী মাইকেল রলিন্স জানান, উত্তর আলাস্কায় সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। বিস্তীর্ণ ও দুর্গম এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাপ ব্যবস্থা নেই। তাই উন্নত মডেল ব্যবহার করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে– সময়। আগে যেখানে পার্মাফ্রস্ট গলনের মৌসুম শুধু সংক্ষিপ্ত গ্রীষ্মকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; এখন তা শীতকালের সেপ্টেম্বর এমনকি অক্টোবর মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে বছরের শেষভাগেও নদী হয়ে সাগরে বেশি পানি ও কার্বন প্রবাহিত হচ্ছে, যা উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে নতুন ধরনের প্রভাব ফেলছে।
ভৌগোলিক দিক থেকেও পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। উত্তর-পশ্চিম আলাস্কা সমতল ভূমি হওয়ায় সেখানে জমে থাকা জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি এবং গলনের ফলে সেখান থেকেই বেশি কার্বন নদীতে প্রবেশ করছে। বিপরীতে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় এই প্রবণতা তুলনামূলক কম।
গবেষকরা বলছেন, স্থলভাগ থেকে সমুদ্রে কার্বনপ্রবাহের এই সংযোগ এখনও জলবায়ু বিজ্ঞানের অন্যতম অজানা ক্ষেত্র। এই বিষয়ে আরও গবেষণা জরুরি। কারণ আর্কটিকের এই পরিবর্তন শুধু স্থানীয় নয় বরং এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পার্মাফ্রস্ট গলন এখন আর শুধু বরফ গলার গল্প নয়; এটি নদী, সমুদ্র ও বৈশ্বিক জলবায়ুর এক জটিল পারস্পরিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় উন্মোচন করছে।
সূত্র: গ্লোবাল জিওবায়োকেমিক্যাল সাইকেল জার্নাল
