দুই দেশের আলোচনার কেন্দ্রে ৫ বিষয়
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (বাঁয়ে), শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ (ডানে) -এএফপি
বিবিসি
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
আলোচনার ভেন্যু প্রস্তুত, নিরাপত্তা বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। রাস্তার প্রবেশপথগুলোর দুই পাশে কালো ও হলুদ রং করা হয়েছে। অপেক্ষায় আছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আয়োজক হিসেবে রয়েছেন পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তারা। তারাও এ আলোচনা ঘিরে আশার আলো দেখছেন। তারা জোর দিয়ে বলছেন, অন্য অনেক দেশের তুলনায় উভয় পক্ষের প্রতিই তাদের আস্থা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, তিনিও আশাবাদী সুরেই কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে তিনি বলেন, ‘যদি ইরানিরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে আমরাও অবশ্যই সহযোগিতার হাত বাড়াতে প্রস্তুত রয়েছি।’ তবে তিনি সতর্কবার্তাও দিয়েছেন, ‘যদি তারা আমাদের সঙ্গে চালাকি করার চেষ্টা করে, তাহলে আমরাও বিষয়টি এত সহজভাবে দেখব না।’ সত্যি করে বলতে গেলে, এই আলোচনা সফল হওয়া নিয়ে পাহাড়সম বাধাও রয়েছে।
লেবানন ইস্যু
একদিকে ইরানে যখন যুদ্ধবিরতি চলছে, অন্যদিকে তখন লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান চলমান। এ কারণে আলোচনার শুরুতেই তা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্স অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধবিরতির আলোচনাই অর্থহীন হয়ে পড়বে। আমাদের আঙুল এখনও ট্রিগারেই রয়েছে। ইরান কখনোই তাদের লেবাননের ভাইবোনদের ছেড়ে যাবে না।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এখন কিছুটা কম হবে। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হবে। তবে সেটি কি ইরানকে খুশি করতে নামকাওয়াস্তে আলোচনা হবে কিনা, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায় না।
হরমুজ প্রণালি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় শুরুতেই যে বিষয়টি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে তার একটি হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান শুরুতে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা বললেও এখন খুবই নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের সঙ্গে এমন চুক্তি ছিল না। ইরান ওয়াদার বরখেলাপ করেছে।’
বর্তমানে খুব অল্প সংখ্যক জাহাজই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করছে। শত শত জাহাজ এবং আনুমানিক ২০ হাজার নাবিক এখনও পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ইরান এটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে। তারা এ প্রণালিকে নিজেদের সার্বভৌম জলসীমা বলে দাবি করছে। কোন জাহাজ চলতে পারবে আর কোনটি পারবে না, তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। এর জন্য নতুন নিয়মও তৈরি করেছে।
গত বৃহস্পতিবার ইরান জানিয়েছে, বিদ্যমান আলাদা দুটি ট্রাফিক চ্যানেলের উত্তরে নতুন আরেকটি ট্রানজিট রুট চালু করা হচ্ছে। তারা বলেছে, হরমুজের নৌপথে বিভিন্ন ধরনের জাহাজবিধ্বংসী মাইনের উপস্থিতি এড়াতেই নতুন এ রুট জরুরি ছিল। সম্প্রতি এ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ পার হতে পেরেছে, তাদের মধ্যে কিছু জাহাজকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত টোল পরিশোধ করতে হয়েছে। এমন খবরের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, কোনো জাহাজ থেকে ইরানের ফি নেওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো।
পরমাণু শক্তি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ ও অমীমাংসিত ইস্যু হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরু করেছিলেনই মূলত ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করতে না পারে, সে জন্য। ইরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর বেশির ভাগই এই দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখে। তবে ইরান বলছে, পারমাণবিক অস্ত্র নয়, এনপিটি স্বাক্ষরকারী হিসেবে শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার বিষয়টিকে ট্রাম্প একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। যদিও এর মধ্যেই রয়েছে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিটি। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনায় ইরানকে নিজ ভূখণ্ডে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার দাবি রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র বা তা অর্জনের সক্ষমতা পাবে না।
ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের অন্যতম হলো– লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, গাজার হামাস ও ইরাকে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন। এ নিয়ে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন চলছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের এ মিত্র শক্তিগুলোও (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) ধারাবাহিক হামলার মুখে রয়েছে। ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত সিরিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদও আগেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। ইরান চায়, তার মিত্রদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যেন হামলা না চালায়।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। যখনই কোনো আলোচনায় শর্তের বিষয়টি সামনে আসে, তখন তারা আন্তর্জাতিক এ নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। গত শুক্রবার পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, আলোচনার আগে ইরানের প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার বা ৮৯ বিলিয়ন পাউন্ড জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করতে হবে।
- বিষয় :
- যুদ্ধবিরতি
- ইরানে হামলা
