তেলের দামে ছয়বার ওঠানামা, সমঝোতার এক নাটকীয় সপ্তাহ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সমঝোতার আশা তৈরি হলেও এক সপ্তাহে নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। ছবি: সংগৃহীত
দ্য গার্ডিয়ান
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ১৯:৩২ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ১৯:৩৮
যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে। সাতদিন আগেও দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ছিল, আলোচনার গতি ছিল প্রায় স্থবির। এর মধ্যেই এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক আদান-প্রদানের খবর নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারের পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতি আবার বদলে দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, পরিস্থিতি আসলে কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে কিংবা কোন দিকে যাচ্ছে? এটি বুঝতে গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এগুলো দুই দেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও তৎপরতার ধারবাহিকতা বোঝায়। পাশাপাশি আনুষঙ্গিক কিছু বিষয়কেও প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের বাজারে। সাতদিনের সাত ঘটনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছয়বার ওঠানামা করেছে।
১ মে, শুক্রবার: ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতার মেয়াদ শেষ
ইরানে যুদ্ধ শুরু এবং তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের ৬০ দিনের ‘ওয়ার পাওয়ারস’ ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয় এদিন। তাই মার্কিন কংগ্রেসের সামনে যুদ্ধ অবসানের পরিস্থিতি দেখানোর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর একটি চাপ ছিল। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা এদিন ঘোষণা দেন, সামরিক অভিযানের অবসান হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ওয়াশিংটনকে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের কাছে একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। কিন্তু ট্রাম্প তখন জানান, তিনি প্রস্তাবের শর্তগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট নন। এদিন পরিস্থিতির নাটকীয়তা আরো বাড়িয়ে দেয় পেন্টাগন। তারা ঘোষণা দেয়, জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে। একইদিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জ্বালানির দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
২ মে, শনিবার: হরমুজে নিস্তব্ধতা
এদিন ফ্লোরিডার এক সমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের একটি জাহাজ জব্দ করার অভিযানে মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ কাজ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জাহাজের ওপর নামলাম এবং সেটি দখল করে নিলাম। জাহাজের মালামাল ও তেল- সবই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। এটি খুবই লাভজনক এক ব্যবসা।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্যের দিনে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২৬ থেকে ১১০ ডলারে নেমে যায়।
৩ মে, রোববার: প্রজেক্ট ফ্রিডম চালুর ঘোষণা
হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলো উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র নতুন একটি উদ্যোগ শুরুর ঘোষণা দেয়। ট্রাম্প এই পরিকল্পনার নাম দেন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে মূলত আটকে থাকা জাহাজগুলোকে দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে সমন্বয় করা। মার্কিন নৌবাহিনীর সম্পদ ব্যবহার করে জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের কড়া প্রতিক্রিয়া দেখান ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির নতুন সামুদ্রিক ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে।
৪ মে, সোমবার: শুরু হলো প্রজেক্ট ফ্রিডম
মার্কিন অভিযান শুরু হতেই হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরানের ছয়টি ছোট নৌকা ধ্বংস এবং ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। যদিও ইরান এসব দাবি অস্বীকার করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানায়, তারা ফের ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে।
এদিন উত্তেজিত ট্রাম্প হুমকি দেন, হরমুজ খুলে দেওয়ার চেষ্টাকালে যদি কোনো মার্কিন জাহাজে হামলা চালানো হয়, তবে ইরানি বাহিনীকে ‘পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা’ হবে। তাঁর সেই হুমকির পর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলারে দাঁড়ায়।
৫ মে, মঙ্গলবার: পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত
এদিন পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। হেগসেথ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে প্রণালি দিয়ে চলাচলের পথ নিশ্চিত করেছে। ইরানের হাতে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু কেইন জানান, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে এবং দুটি কনটেইনার জাহাজ জব্দ করেছে।
একইদিন হোয়াইট হাউসে ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি এপিক ফিউরি অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দিয়ে বলেন, তারা এখন প্রজেক্ট ফ্রিডমের দিকে মনোযোগ দেবেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই পরিকল্পনায় আকস্মিক পরিবর্তন আসে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিতের ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে তিনি শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের এই পিছু হটার খবরের পর তেলের দাম ১০৯ ডলারে নামে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ হিসেবে অভিহিত করে।
৬ মে, বুধবার: সমঝোতা স্মারক ও শান্তির আশা
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস এদিন জানায়, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরান এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে আছে। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তে ইরানের সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় আছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু একইদিন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দ্য গার্ডিয়ানকে জানান, আলোচনা এখনো কঠিন অবস্থায় আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে লিখেন, ইরান শর্তে রাজি হলে এপিক ফিউরি নামের সামরিক অভিযানের ইতি ঘটবে। ব্যতিক্রম হলে তীব্র বোমা বর্ষণ শুরু হবে। এই বার্তার কিছুক্ষণ পরই মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের পতাকাবাহী একটি তেলের ট্যাঙ্কারে গুলি করে। যেটির কড়া প্রতিক্রিয়া দেখান ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। সেদিন তেলের দামও হঠাৎ ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। কিন্তু পরে আবার ১০১ ডলারে ওঠে।
৭ মে, বৃহস্পতিবার: সৌদির অসন্তোষ, হরমুজে গোলাগুলি
ট্রাম্প কেন হঠাৎ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করেছিলেন, তার একটি সম্ভাব্য কারণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এনবিসি নিউজ। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে সৌদি আরব অসন্তুষ্ট ছিল। তাই তারা ওয়াশিংটনকে দেওয়া বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করে। আকাশসীমাও বন্ধ করে দেয়।
অপরদিকে পাকিস্তানের একটি খবরের ভিত্তিতে তেলের দাম ৯৬ ডলারে নেমে যায়। ওই খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি অস্থায়ী চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। উভয়পক্ষই নমনীয় এবং নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনছে। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, প্রণালিতে চলাচলকারী তাদের তিনটি ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে ইরান হামলা করেছে। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, কেশম দ্বীপে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে তাদের গোলাগুলি হয়েছে। এরপর এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, গোলাগুলি হলেও যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর আছে। তিনি এই সংঘর্ষকে ‘লাভ ট্যাপ’ বা সামান্য সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেলের দাম আবারও ১০১ ডলারের ওপরে ওঠে।
- বিষয় :
- ইরান যুদ্ধ
- যুক্তরাষ্ট্র
- হরমুজ প্রণালি
- তেলের দাম
