সিএনএনের বিশ্লেষণ
ট্রাম্পের আসন্ন ইরান চুক্তি ফাঁকা বুলি নাকি রাজনৈতিক চাল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
সিএনএন
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০০:৫৫
ইরান যুদ্ধ কি আসলেই শেষের পথে, নাকি পুরো বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সুনিপুণ রাজনৈতিক প্রচার– এ প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে তেহরান কিংবা তেল আবিব, সব জায়গায় একই বাস্তবতা। ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষের দাবি যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত দাবি করা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে একটি দারুণ ও ঐতিহাসিক চুক্তি আসন্ন। কিন্তু বিশ্ব কূটনীতির পর্দার আড়ালের খবর বলছে ভিন্ন কথা। হোয়াইট হাউসের এই অতি উৎসাহকে বিশ্লেষকরা দেখছেন ট্রাম্পের একটি চেনা কৌশল হিসেবে।
ট্রাম্পের ৪০ বারের চেনা বয়ান
ট্রাম্পের এই চুক্তি হয়ে গেছে বা চুক্তি শিগগিরই বলার অভ্যাস নতুন কিছু নয়। সিএনএনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও হিসাব অনুযায়ী, চলতি সংকটের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ট্রাম্প ৩৯ থেকে ৪০ বার দাবি করেছেন, ইরান চুক্তি একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী চাপ সৃষ্টি হয়, তখনই ট্রাম্প ঘোষণা করেন– চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়, এই ঘোষণার পর কেটে যায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ, অথচ দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয় না। ফলে এবারের দাবিকেও আন্তর্জাতিক মহল গভীর সন্দেহের চোখেই দেখছে।
সংকটের কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক কার্যক্রম
বিশ্লেষকদের মতে, যদি কোনো সমঝোতা হয়েও থাকে, তবে তা বড়জোর সাময়িক একটি যুদ্ধবিরতি বা কৌশলগত বোঝাপড়া। একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ-অবরোধ শিথিল করবে, আর বিনিময়ে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মূল সংকট ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ভবিষ্যৎ আলোচনার টেবিলে তোলা থাকছে। ইতিহাস বলে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং তা আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। তাই শুধু আলোচনার টেবিল তৈরি হওয়া মানেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা বনাম বাস্তব কূটনীতি
ট্রাম্প কেন বারবার এই দোলাচল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছেন, তার পেছনে রয়েছে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। কয়েক সপ্তাহের কথা বলে শুরু করা এই সংঘাত মাসের পর মাস ধরে চলছে। যুদ্ধে মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে ট্রাম্পের একটি সাফল্যের গল্প খুবই প্রয়োজন।
ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার মিল নেই। এর বড় প্রমাণ দুই পক্ষের দুই রকম সুর। একদিকে ট্রাম্প যখন দাবি করছেন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নতি স্বীকার করেছে, অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবিকে স্রেফ গুঞ্জন ও অনুমান বলে উড়িয়ে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের এই একতরফা দৌড়ঝাঁপ তার মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ইসরায়েল কোনো দায়সারা চুক্তিতে রাজি নয়। তেল আবিবের চাওয়া, ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস এবং হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক প্রক্সিদের অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।
তা ছাড়া ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত বারাক ওবামা আমলের ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইরান পারমাণবিক চুক্তির দাঁড়িপাল্লাতেই মাপা হবে। ট্রাম্প নিজেই সেই চুক্তি ২০১৮ সালে বাতিল করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত নিখুঁত ও দীর্ঘ আলোচনার ফসল ছিল। এখন ট্রাম্প যদি তার চেয়ে দুর্বল বা অস্পষ্ট কোনো ধারণাগত চুক্তি করে সেটাকে ঐতিহাসিক বলে চালাতে চান, তবে তা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দেবে।
- বিষয় :
- ট্রাম্প
- ইরান-ইসরায়েল
- ইরান যুদ্ধ
