বিশ্লেষণ
ট্রাম্প চোরাবালিতে আটকে গেছেন, ইরান ঘিরে ‘প্ল্যান সি’ কী
ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের বোমাবর্ষণ ও সমঝোতার কৌশল কাজে আসেনি। ছবি: এএফপি
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ১৯:২৮ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৩৪
ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের তিনদিন আগের ঘটনা। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান এই চুক্তি নিয়ে গর্ব করতে পারবে। তারা মার খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ট্রাম্পের সেই দাবির কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইরান হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে হামলা করেছে। জবাবে তেহরানকে দেওয়া তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল করেছে ওয়াশিংটন। একইসঙ্গে ১৭০টির বেশি ইরানি সামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছে। সমঝোতা স্মারককে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এখন স্থগিত।
এমন অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ‘প্ল্যান সি’ থাকলেও তারা সেটির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করছে না। বরং কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, তারা সেই বোমাবর্ষণ আর নিষেধাজ্ঞা জারির কৌশলেই ফিরে যাচ্ছে। স্থানীয় সময় বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দেওয়া এক বক্তব্যে এর ইঙ্গিত আছে। তিনি বলেছেন, ‘তারা যদি জাহাজে গুলি চালায়, আমরা তাদের তুলোধুনো করব।’
এ থেকে বোঝা যায়, ইরানকে তেল বিক্রি করে আয়ের লোভ দেখানো কিংবা সমঝোতা করার সুযোগ শেষ। বরং শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন করে আবার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বোমাবর্ষণ শুরু হলে সেটি কীভাবে সফলতা এনে দেবে- সে বিষয়ে প্রশাসন এখনও উত্তর দিতে পারেনি।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশসহ কয়েকটি প্রশাসনের অধীনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে দায়িত্ব পালন করেছেন রিচার্ড এন হাস। তিনি বলছেন, প্রশাসন এক ধরনের কৌশলগত চোরাবালিতে আটকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র যত আগ্রাসী হবে, ইরানিরাও পারস্য উপসাগরের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে তত বেশি আক্রমণ করবে। ট্রাম্প প্রশাসন এখনও সেসব স্থাপনা রক্ষার উপায় বের করতে পারেনি।
রিচার্ড হাস আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে আশা করেছিলেন বোমাবর্ষণ করে তিনি ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করবেন। কিন্তু এর কোনোটিই ঘটেনি।
বৃহস্পতিবার ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন থেকে দেশে ফিরে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে জনসমক্ষে তেমন কিছু বলেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসন এখনও শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আশা করা হচ্ছে ‘টেকনিক্যাল’ আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু এই শব্দের মধ্যেও এক ধরনের স্ববিরোধিতা আছে। কারণ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিভেদগুলো কোনো ‘টেকনিক্যাল’ বা কারিগরি বিষয় নয়- এগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। প্রথম রাজনৈতিক লড়াইটি হতে পারে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে-সেই প্রশ্ন ঘিরে। আর এখানেই সমঝোতা স্মারকের একটি অস্পষ্ট অনুচ্ছেদের খেসারত দিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।
স্মারকের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর, ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং ওমান সাগর থেকে পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কেবল ৬০ দিনের জন্য সেখানে কোনো টোল আদায় হবে না।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা মনে করেছিলেন এই অনুচ্ছেদই জাহাজ চলাচল সচল করার মূল চাবিকাঠি এবং পুরো দায়ভার ইরানের ওপর বর্তেছে। অন্যদিকে, ইরানিরা এটিকে জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে লুফে নিয়েছে। জাহাজগুলোকে তাদের নির্ধারিত চ্যানেল দিয়ে চলাচলের দাবি জানাচ্ছে। একইসঙ্গে বার্তা দিয়েছে, নৌযান চলাচলের জন্য এক ধরনের ‘সার্ভিস ফি’ আদায় করা হবে।
এমন অবস্থায় মার্কিন নৌবাহিনী ওমানের কাছাকাছি অন্য একটি চ্যানেল দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা করে। আর তখনই ইরান কয়েকটি নৌযানে গুলি চালায়। ফলাফল হিসেবে জাহাজ চলাচল আবারও স্থবির হয়ে পড়েছে। মূলত, এ বিষয়টিই ট্রাম্পকে চরম হতাশ করেছে। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, সমঝোতা স্মারক বা প্রাথমিক চুক্তি ভেস্তে গেছে।
এসব ঘটনা ট্রাম্পকে আবারও গত এপ্রিল মাসের পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। বোমাবর্ষণ করে ইরানকে কাবু করতে না পারায় ওই মাসে কূটনীতির পথ বেছে নেয় ওয়াশিংটন। তখনই অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, আলোচনার এই প্রক্রিয়া; নতুন করে সংঘাত শুরুর আগে সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল মাত্র।