ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

চীনে ‘ভুয়া কনের’ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন নিঃসঙ্গ পুরুষরা

চীনে ‘ভুয়া কনের’ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন নিঃসঙ্গ পুরুষরা
×

নারী-পুরুষের সংখ্যায় বড় ব্যবধানের কারণে চীনে বিবাহ উপযোগী পাত্রীর গুরুত্ব অনেক বেশি। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

বিবিসি

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৪২ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৫৪

চীনা যুবক ওয়াং ঝুয়াং ৩৭ বছর বয়সে এসে জীবনসঙ্গীর খোঁজ পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। ঠিক তখনই তাঁর চোখে পড়ে ঘটকালি সংস্থার কিছু বিজ্ঞাপন।

সেই বিজ্ঞাপনগুলোতে একটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যৎ নেই এমন কোনো সম্পর্ক গড়ে তোলার পেছনে বছরের পর বছর সময় নষ্ট করতে হবে না। এর বদলে তারা এমন নারীর সঙ্গে ওয়াংকে পরিচয় করিয়ে দেবে, যারা নম্র ও স্বামীর প্রতি অনুগত।

ওয়াং বলেন, ‘ঘটক বা ম্যাচমেকাররা বলেছিল, গুইঝৌ অঞ্চলের মেয়েরা বেশ মিতব্যয়ী হয়। তারা ঘরের কাজে বেশ দক্ষ। পরিবারগুলোও গরিব। ফলে আপনার সঙ্গে বিয়ের পর তারা সারাজীবন কাটিয়ে দেবে।’ এ কথা শুনে ওয়াং নিজের মনের মতো জীবনসঙ্গীর খোঁজে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ গুইঝৌয়ের গুইয়াং শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

একটি মেয়ের সঙ্গে যখন দেখা করানো হলো, তখন ওয়াং ভেবেছিলেন, তিনি বুঝি সেই কাঙ্ক্ষিত জীবনসঙ্গীকে পেয়ে গেছেন। কারণ মেয়েটির মধ্যে তাঁর পছন্দের সব গুণই ছিল। এরপর মেয়েটির সঙ্গে তাঁর সংসার জীবন যত দ্রুত শুরু হয়েছিল, তেমনই আচমকা শেষ হয়ে যায়।

ওয়াং বলেন, ‘আমার পুরো পরিবারটা এক নিমিষে এলোমেলো হয়ে গেল।’ স্ত্রীর সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয়েছিল, তার সবটাই ছিল মিথ্যা। মেয়েটি এক সময় কারাওকে হোস্টেস (কারাওকে বারের আপ্যায়নকর্মী) ছিলেন। আগে তিনবার বিয়ে হয়েছিল, তিনটি সন্তানও আছে। এছাড়া, তিনি যৌনবাহিত রোগ এবং ঋণে জর্জরিত ছিলেন। নিজের বয়সের ব্যাপারেও মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন।

বর্তমানে ওয়াং আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। বিয়ের জন্য ঘটকালির সংস্থাকে দেওয়া অর্থের অন্তত একাংশ তিনি ফেরত চান। এই অর্থ তিনি বহু বছর ধরে জমিয়েছিলেন। ওয়াং বলেন, ‘মা-বাবা আমাকেই দোষ দিচ্ছেন। আমি অনিদ্রা ও চরম দুঃশ্চিন্তায় ভুগছি। কাজেও মন দিতে পারছি না।’

পুরুষ বেশি, নারী কম
ওয়াংয়ের এই ঘটনাটি চীনে জনসংখ্যা সংক্রান্ত সংকটের একটি চরম পরিস্থিতি। ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টি কয়েক দশক ধরে এক সন্তান নীতি জারি করে রেখেছিল। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার এই নীতি থেকে সরে এলেও, ততদিনে বড় একটি সংকট তৈরি হয়। 

বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

সরকারের ওই নীতির পাশাপাশি ছেলে সন্তান জন্মদানের সামাজিক আকাঙক্ষার কারণে দেশটিতে নারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি বেশি। এই সংখ্যাটি যুক্তরাজ্যের মোট পুরুষ জনসংখ্যার চেয়েও বেশি এবং অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার সমান।

এর ফলে ওয়াংয়ের মতো প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি বয়সের পুরুষদের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে যারা ছোট শহর কিংবা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। এসব এলাকার নারীরা জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ওয়াং বলেন, ‘আপনার একটি গাড়ি ও বাড়ি থাকতে হবে। সম্ভব হলে পরিবারিক ব্যবসা থাকা বাঞ্ছনীয়।’

ছেলেপক্ষ থেকে মেয়েপক্ষকে পণ দেওয়াটা চীনে দীর্ঘদিনের প্রথা। যে অঞ্চলগুলোতে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে এই প্রথাটি এখন আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। আর এ কারণে গুইঝৌর মতো প্রদেশে ঘটকালি সংস্থার কদর অনেক বেড়ে গেছে। একইসঙ্গে অনেক সংস্থা বেশি বয়সী পুরুষদের কাছে থেকে সুবিধা আদায় করছে। এর মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই খাত এখন অবৈধ কর্মকাণ্ড ও বিশৃঙ্খলা উসকে দিচ্ছে।

ঘটকালি সংস্থার প্রতারণা
চীনজুড়ে এ ধরনের প্রতারণার প্রকৃত মাত্রা বোঝা বেশ কঠিন। তবে সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনা নজরে এসেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে প্রসিকিউটররা ঘটকালি বা ম্যাচমেকিং খাতে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৫৪৬ জন ব্যক্তির মামলা পরিচালনা করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে জন-উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় চলতি মাসে পাঁচটি সরকারি সংস্থা ম্যাচমেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান শুরু করেছে। একটি প্রতিষ্ঠানকে পাওয়া গেছে, যারা কারাওকে বারের আপ্যায়নকারীদের ব্যবহার করে ১২৮ ব্যক্তির কাছে থেকে প্রায় ২৫ লাখ ইউয়ান হাতিয়ে নিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে বেইজিং জিংশি ল ফার্মের নানজিং কার্যালয়ের ফ্যান বিংহে বিবিসিকে বলেন, সরকারের উচিত এই খাতের জালিয়াতি বন্ধে কিছু বিধিনিষেধ বা নিয়মকানুন কার্যকর করা।

ওয়াংয়ের ক্ষেত্রে একটি সংস্থা বলেছিল, তিনি প্রতারণার শিকার হলে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন। এতে আশ্বস্ত হয়ে ওয়াং সংস্থাটিকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেন। তাদের কর্মীদের সহায়তায় কয়েকদিনের মধ্যে আটজন নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে একজনকে তাঁর পছন্দ হয়।

ওয়াং জানান, বিয়ের জন্য তিনি ৩ লাখ ইউয়ানেরও বেশি খরচ করেছেন। ভোজসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করলে এর পরিমাণ প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ ইউয়ান দাঁড়ায়। বিয়ের পুরো প্রক্রিয়ার ছবি তুলে রেখেছিল ঘটকালি সংস্থাটি। পরে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচারের জন্য ব্যবহার করে।

বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় পাওনাদারদের ফোন আসতে শুরু করে। তারা দাবি করে, মেয়েটি (ওয়াংয়ের স্ত্রী) তাদের কাছে ঋণগ্রস্ত। এরপর ওয়াংয়ের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। একদিন তিনি স্ত্রীর মোবাইল ফোন যাচাই করতে গিয়ে অতীতের পেশাসহ আগের বিয়ের কাগজপত্র খুঁজে পান।

এ নিয়ে ওয়াং যখন প্রশ্ন করেন, তখন স্ত্রীর কাছে থেকে পণের অর্থ ফেরত ছাড়াই বিচ্ছেদের প্রস্তাব পান। ওয়াং জানান, যে সংস্থাটি বিয়ের আয়োজন করেছিল তিনি তাদের খুঁজতে শুরু করেন। কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন, তারা ব্যবসা গুটিয়ে উধাও হয়ে গেছে।

ওয়াং এখন গুইয়াং এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে বসে সামাজিক মাধ্যমের জন্য ভিডিও বানান। তিনি অন্য পুরুষদের সতর্ক করার চেষ্টা করছেন, যাতে তাদের সঙ্গেও এমন কিছু না ঘটে।

প্রতারণার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে গুইয়াংয়ের ঘটকালি সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিল বিবিসি। একটি সংস্থার প্রধান তাদের কার্যালয়ে গেলে আলাপ করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পরে ওই ব্যক্তির ব্যবসায়িক অংশীদার কথা বলার অনুরোধ নাকচ করে দেন।

আরও পড়ুন

×