ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বন্দরনগর মোচা দখলে নিল হুতিরা, বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণের আরও কাছে

বন্দরনগর মোচা দখলে নিল হুতিরা, বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণের আরও কাছে
×

ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:০২

ইয়েমেনের ঐতিহাসিক বন্দরনগর মোচার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। বৃহস্পতিবার ইয়েমেন সরকারের চারটি সামরিক সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। মোচা দখলের মধ্য দিয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল হুতিরা।

সরকারি সূত্রগুলো জানায়, হুতিরা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় ইয়েমেন সরকারের বাহিনী ও তাদের মিত্ররা দক্ষিণে ধুবাব এলাকার দিকে সরে যাচ্ছে। ধুবাব বাব আল-মান্দাব প্রণালির ঠিক পাশে অবস্থিত এবং এর বিপরীতে রয়েছে পেরিম দ্বীপ।

সামরিক সূত্রগুলোর মতে, ধুবাব ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া গেলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

গত কয়েক দিনে ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে থাকা সৌদি আরবের মিত্র বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। ইরান-সংক্রান্ত চলমান সংঘাতের মধ্যে ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধের এই বিস্তার বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ওপরও হুমকি তৈরি করছে।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইয়েমেনে একটি যুদ্ধবিরতি হয়। এর ফলে কয়েক বছরের যুদ্ধ অনেকটাই থেমে যায়। তবে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। নতুন করে সংঘাত বাড়ায় দেশটিতে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

‘বিষাদের ফটক’ নামে পরিচিত বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। একদিকে আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন, অন্যদিকে আফ্রিকার জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অনেক। এসব পণ্য বাব আল-মান্দাব হয়ে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে ভূমধ্যসাগরে যায়। এ ছাড়া এশিয়াগামী বিভিন্ন পণ্য পরিবহনেও এই নৌপথ ব্যবহার করা হয়।

ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি পরিবহনের প্রধান সামুদ্রিক পথ। বাব আল-মান্দাবও বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

ইয়েমেনে সংঘাত বাড়ার সময়েই উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলাও তীব্র হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজ চলাচলের ওপর এটি সবচেয়ে বড় ঘোষিত হামলার পর্বগুলোর একটি।

এদিকে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে থাকা একটি বাহিনীর সামরিক নেতা তারেক সালেহ বৃহস্পতিবার পশ্চিম উপকূলে থাকা তার বাহিনীকে নিরাপদ স্থানে বিকল্প কমান্ড সেন্টার স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি নিহত ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা। তার এই নির্দেশকে পশ্চিমাঞ্চল থেকে হুতিদের ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সকে পিছু হটতে বাধ্য করার আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তান তেহরানকে হুতিদের লাগাম টানার বার্তা দিয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র জানিয়েছে। মঙ্গলবার পাকিস্তান এই বার্তা ইরানের কাছে পৌঁছে দেয় বলে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে না ইরান।’

তবে দুটি ইরানি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহে তেহরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। একই সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কয়েকজন কমান্ডার হামলার সমন্বয়ে সহায়তা করতে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে হুতিরা। সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় এই গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে তারা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা এবং ইসরায়েল লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছিল হুতিরা। পরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর চলতি বছর সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে হামলা আবারও বাড়িয়েছে গোষ্ঠীটি।

এদিকে মোচা থেকে বৃহস্পতিবার শত শত নারী ও শিশু ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রিত লাহিজ ও এডেন প্রদেশের দিকে চলে গেছে। লড়াইয়ে স্বজন হারানোর পর তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সেখান থেকে চলে যাচ্ছে বলে ইয়েমেন সরকারের তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

তাইজ ও আল-হুদাইদা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় গত দুই সপ্তাহের সংঘর্ষে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

হুতিরা বুধবার দাবি করেছে, সৌদি আরব ইয়েমেনের জাওফ, মারিব ও সাদা প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। সৌদি সীমান্তবর্তী এসব এলাকার পাশাপাশি দক্ষিণের তাইজ এবং লোহিত সাগরের তীরে হুতিদের শক্ত ঘাঁটি আল-হুদাইদাতেও হামলা হয়েছে বলে দাবি তাদের। আল-হুদাইদাকে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে হুতিরা। তবে সৌদি আরব এসব হামলার কথা নিশ্চিত করেনি।

সৌদি আরবের দাবি, গত কয়েক দিনে হুতিরা দেশটিতে হামলা বাড়িয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছেন।

২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণে এডেনের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়।

ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি এবং সীমান্তে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় ২০১৫ সালে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল হুতিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করা।

এরপর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মিত্র দেশগুলোর বিমান হামলা ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।

আরও পড়ুন

×