ঘুড়ির মতো আন্দাজ
শিল্পকর্ম :: সমর মজুমদার
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৩ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সারাদিন পাতা ঝরেছে। হয়তো হেমন্ত আসছে না কিন্তু পাতারা ভরে গেছে হলুদ রঙে। চারুকলার ক্লাসে বলা হয়েছে হেমন্তের রং হলুদ। হেমন্তের পর আসে শীত, তারবাদে বসন্ত। বসন্তের জন্য পাঁচটি ঋতু প্রার্থনা করতে হয়। আটার দলায় কালিজিরা মাখাতে মাখাতে লতার মনে হয় শহরের রাস্তায় সব সময় বসন্তের ভিড় থাকে। এখানে কত জীবনের কত ফিসফাস, কত গার্হস্থ লুকোচুরি। মানুষ যখন বিল থেকে শহরে আসে, মানুষ যখন পাহাড় থেকে শহরে আসে বা মানুষ যখন নদী থেকে শহরে আসে, তখন তার পায়ের তলার চামড়ায় জড়িয়ে থাকে নানান ঋতুর নানান বয়সের বাসনা। শহরের নানান কিসিমের যানবাহন ঐসব বাসনাকে রুটির দলার মতো মাখাতে মাখাতে রাস্তায় বিছিয়ে দেয়। আমরা সেইসব আদি রুটি-রাস্তার ওপর দিয়ে এক দরজা থেকে আরেক দরজায় যাই, কখনওবা বাজার কখনও ইশকুল কি হাসপাতাল। আটার ময়ান থেকে কালিজিরার গন্ধ ছোটে। লতার তো কত কথা মনে আসে, পরপর দুইবার যখন তার পেট আর বাচ্চা ধরে রাখতে পারল না, সে কী দুঃসহ ময়ান, সব যেন দলিত মথিত করে বদলে দিল সব। তখন থেকেই ঘরে ফিরলে শশাঙ্কের চামড়ায় কী সব অচেনা খসখস লতা ঠাহর করে। আর ভাবে দুনিয়ায় হয়তো কেবল পুরুষরাই ঘরে ফিরে বা ফিরে না। পুরুষের চামড়াতেই লেগে থাকে কত জানা-অজানা সম্পর্কের কুংকুম। আজ সারাদিন ঝরেছে, লাল লাল সাদা সাদা ফেনা ফেনা স্রাব। লাল ছাড়া বসন্ত হয় না, কখনও কখনও নাকি লাল মেঘ নিয়ে অঝোর ধারায় নামে বিকল শ্রাবণ। লতার কাছে সব সম্পর্কই এক-একটা ঋতুর বদল মনে হয়, যেন তা গ্রহণের পর গ্রহণ ডিঙিয়ে জল ভরা কাঁসার থালায় উসকে উঠবে। শশাঙ্কের চামড়ায় কী সব খসখস, একেবারেই অস্থির। ডাক্তার বলেছে আপনারা কয়েক মাস একসাথে থাকতে পারবেন না। একসাথে শব্দটিকে তার খুব বেমানান মনে হয়েছে, যদিও ডাক্তার কি লতা কি শশাঙ্ক তারা সকলেই এর মানে বুঝতে পারে। রুটির পেট ফুলে উঠছে। আর একবার মাত্র লতার পেট ফুলানো যাবে তাও খুব ঝক্কি ঝামেলার কী সব ব্যাপার। হয়তো তখন কোনো ঋতু থাকবে না, হয়তো তখন কোনো রঙের প্রার্থনা থাকবে না। কিন্তু একটা বিল পেরিয়ে আরেকটা বিল শামুকেরা যেমন তাদের ঘরের দিকে যায়, লতার কি তেমন কোনো স্বীকার-অস্বীকার থাকবে না? ব্যাংক ছুটির পর শশাঙ্ক অনেকটা সময় মোড়ে সিনেমা হলের পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। এখানেই অনেক ছেলে জুটে যায়, শহরের বিবাহিত পুরুষেরা আজকাল সমকামী সম্পর্কেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে কোনো দায় বা দায়িত্ব নেই। কোনো মতে গরমটা বের করতে পারলেই কাজ শেষ হয়ে যায়। বেশির ভাগ সময়ে বিনা পয়সাতেই হয়ে যায়। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের খোঁজ মেলে। বউ-বাচ্চারা কেউ এইসব সম্পর্ক বিশ্বাস-অবিশ্বাস করতে পারে না। শশাঙ্ক তিনজনকে পছন্দ করেছে, এখনও বাছাই করেনি। এইসব কাজে বাছাই করতে হয়তো একটু সময় নেয় কিন্তু লতার জন্য এই একটু-আধটু বাড়াবাড়ি তার কাছে খুব একটা কিছু মনে হয় না। ছেলেটার সাথে শশাঙ্ক তাদের বাসায় যায় কিন্তু তারা কোনো কাজ করে না, বেরিয়ে আসে। আজ ডাক্তারের রিপোর্ট নিতে হবে। হয়তো আবার একটি ডাক আসবে তার, আবার একটি ঋতুর জন্য প্রার্থনায় বসতে হবে। বাসের ভেতর ঝিমলাগা সন্ধ্যা মোবাইলের টুপটাপ আলোয় জোনাক পোকার স্মৃতি টান দেয়। শীতের রোয়া তোলা ধানের জমিনের ভেতর ভিজতে থাকা সাদা খামের ভেতর লতার ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট ঘুমিয় আছে। খামটিকে শুকাতে শুকাতে শশাঙ্কের নিজের শরীর ভিজে যায়, সবাই নেমে যায়। শরীর থেকে নামে প্রার্থনার ঘাম। লতা জানে, একটি খাম নিয়ে শশাঙ্ক বাসায় ফিরবে, তাকে সান্ত্বনা দেবে, বলবে আমরা একটি বাচ্চা এনে পালব, কত মানুষেরই তো নিজেদের বাচ্চা নেই, বলবে মনটাকে একটু বড় কর সব বাচ্চাকে নিজের বাচ্চা মনে কর। বিলের ভেতর যেখানে পানি কম সেখানে হোগলার বনে আটকে গেছে একটি নৌকা, বড়শিটাও খুঁজে পাচ্ছে না দুই ভাইবোন। আকাশ খয়েরি করে নামছে ভুবনচিল। তার একটি ডানার ঝাপটায় আটকে যায় আধখান আসমান। ভাই তোর দুধের দিব্যি আমায় জলে ফেলিস না, বোন তোর ভাতের দিব্যি আমায় জলে ফেলিস না। তলিয়ে যাবার আগেই বালতি থেকে গামছাটা তুলে তারে মেলে দেয় লতা। গামছা থেকে স্রাবের ঝাঁজ বারান্দা ডিঙিয়ে গলির মোড়ে হোঁচট খায়। গলির মোড়ে নেমে শশাঙ্ক ভাবে আজ লতাকে সে চমকে দেবেই। ডাক্তার বলেছে, লতার পেটে বাচ্চা সুস্থ আছে। লতা তা টের পায়, পুরোনো কাপড় দিয়ে কাঁথায় মায়াফুল বুনে। সেইসব মায়াফুলেরা প্রার্থনা করে বসন্ত আসবে, আজ না হয় কাল। তা না হলে শহরের রাস্তায় মানুষ কী নিয়ে দাঁড়াবে, কার আশায় দাঁড়াবে। গাড়িগুলো তা না হলে কোনো উছিলায় ব্যস্ত করে তুলবে চারপাশ। এখানে যদি কোনো আলিঙ্গন না থাকে, যদি কোনো সরগরম না থাকে, তবে কেন ছাত থেকে ছাতে লাফিয়ে পড়বে বেহিসাবি গুঞ্জরণ। এখানে আর কিইবা আছে যার ঘুণাক্ষরে বন্দি হবে সংসারের দহনের ঘুণ! তাই একটা সময় দরজায় দাঁড়ালেই দরজাটা খুলে যাবে, আবার তারা একসাথে থাকতে শুরু করবে। ডাক্তাররা এইসব নিয়ে কত কথা বলবে, লতা কি শশাঙ্ক কি ডাক্তারদের তা জানা আছে।
- বিষয় :
- পাভেল পার্থ
