‘আলোর দিকে যেতে ছবিগুলো আঁকা’
শিল্পকর্ম :: ফারহানা আফরোজ বাপ্পী
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর দ্বীপ গ্যালারিতে শিল্পী ফারহানা আফরোজ বাপ্পীর শিল্পকর্মের একক প্রদর্শনী ‘মেডিটেশন অন পিস’ শেষ হয়েছে ১৪ অক্টোবর। শিল্পী কালের খেয়াকে জানিয়েছেন প্রদর্শনীটির পেছনের গল্প, মানবিক বোধ ও শিল্পভাবনার কথা। আলাপনে হামিম কামাল
lমেডিটেশন অন পিস– প্রদর্শনীর এমন নামকরণের পেছনের গল্পটা শুনতে চাই
ll কাজগুলো শুরু করি করোনার সময়ে, যখন আশপাশের পরিবেশ নিয়ে আমাদের ভেতর বিপুল আক্ষেপ কাজ করছিল। মানুষ হয়ে আমরা মানুষের পাশে যেতে পারছিলাম না। অসুস্থ হলে কাউকে দূরে রাখছি। অথচ মানুষ হিসেবে এর উল্টোটাই ছিল আমাদের করণীয় ও সংস্কৃতি। অর্থাৎ আমাদের নীতি-নৈতিকতার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছি সেই সময়ে। এ রকম একটা সংকটময় সময়ে আমার এই কাজগুলো শুরু। ক্যানভাস সামনে রেখে আঁকার কিছু খুঁজে পেতাম না, মনে স্থিরতা ছিল না। শুধু রং টেনে যাচ্ছিলাম, ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়। এ সময় একটা ব্যাপার ঘটল। আঁকতে আঁকতে লক্ষ্য করলাম, আমার মন শান্ত হয়ে আসছে, আমি ধ্যানস্থ হয়ে পড়ছি। সবই যে আমি কভিড মহামারির সময়ে এঁকেছি তা নয়। ২০২২, ২০২৪, সর্বশেষ ২০২৫-এ আঁকা। প্রদর্শনীর সময়ে ছবিগুলোর আবির্ভাব মুহূর্তের স্মরণে নাম রাখা হলো– মেডিটেশন অন পিস।
lছবির ভেতর আমাদের তখনকার মনোজগৎ ধরা পড়েছে মনে হয়েছে। ভেতরটা ভেঙে পড়ছে যখন, মূল্যবোধ সব মূল্যহীন এবং মৃত্যু খুব কাছেই। ফলে সহজাত আচরণের বিরুদ্ধে যাচ্ছি আমরা।
ll হ্যাঁ, সহজাত মানবিক আচরণের বিরুদ্ধে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি তখন, আর ক্রমাগত ভাঙছি। কাজগুলোর ভেতর এই ভাঙনটা ধরা আছে। সব আলাদা আলাদা হয়ে গেছে, বিভক্তি চলে এসেছে।
lআপনি রং টেনে গেছেন এবং ক্রমশ নির্ভার বোধ করেছেন, অর্থাৎ আঁকতে আঁকতে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা ঘটেছে। রঙের ব্যবহারে এই যাত্রা কীভাবে ধারণ করেছেন?
llঅন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাওয়ার চেষ্টা থেকেই ছবিগুলো আঁকা। ছবিতে বিভিন্ন রঙের সন্নিবেশ এসেছে, কোথাও গোলাপি; রংটা লাভেবল (Lovealbe), কোথাও প্রচুর সবুজ। কারণ, আমাদের ঘরবন্দি মন তখন সবুজ খুঁজছে। যখন আঁকছি, কোন ছবিতে কোন রঙের প্রাধান্য থাকবে তা পরিকল্পনায় ছিল না। শুধু যে রং ব্যবহার করেছি সে রঙেরই হারমোনি (Harmony) রেখেছি। যে ছবিতে সবুজ প্রধান রং, সেখানে সবুজের নানান প্রচ্ছায়া, অপচ্ছায়া এসেছে। এর বাইরে হয়তো হলুদ এসেছে। অর্থাৎ রঙের কিছুটা ভিন্নতা এলেও হারমোনি রাখতে চেয়েছি। সমসুর ভাব ভেঙে যেতে পারে এমন রং আসেনি। গোলাপি, ম্যাজেন্টা (Magenta), নীল ছবিগুলোর বেশির ভাগ চব্বিশ-পঁচিশ সালে আঁকা। করোনার সময়ে যেগুলো আঁকা সেগুলোর বেশির ভাগই বাদামি, সবুজাভ– এ ধরনের।
lএকটা বিশেষ ভালোলাগার ছবি আমার, সেখানে কমলা রঙের প্রাধান্য। ভেতর থেকে একটা আলো যেন ফুটে বেরোচ্ছে।
llহ্যাঁ, কমলা এবং একটু সাদা। আকৃতিটা অনেকটা পদ্মফুলের মতো। মনে হচ্ছে পদ্মফুলের অবয়বে আলোটা উঠে আসছে।
lপদ্মফুল শুনে মনে এলো, প্রাচ্যদর্শন কিংবা কোনো পুরাণ আপনাকে আঁকার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছে?
llনা, এমন কোনো প্রভাবে কাজ করিনি। শুধু কাজের টেবিলে মন শান্ত করার জন্য যেতাম। একেকটা কাজ করতে পাঁচ-সাত দিন লেগেছে। কখনও পক্ষকাল, কখনও এক মাসও। যেখানে সূক্ষ্ম কাজের অবকাশ সেখানে আতশ কাচ ধরে তুলি চালিয়েছি। প্রদর্শনীতে কিছু ছবি আছে যেন শিশুহাতে আঁকা। সব বিচ্ছিন্ন, আলাদা। মহামারির সময়ে প্রথমদিকের কাজ। এগুলোও বড় ছবিগুলোতে প্রভাব ফেলেছে। বিচ্ছিন্নতা মানেই রেখা। ছবিগুলোয় রং, এরপর ব্যারিকেড, রং, আবার ব্যারিকেড। কোথাও জমাট, কোথাও খানিক বিস্তৃত। ঠিক আমাদের সম্পর্কের মতো। কভিড সময়ে যে বিচ্ছিন্নতার যে বাস্তবতা গভীর কষ্ট দিয়েছে তা এমন– হয়তো বাবা অসুস্থ, কিন্তু আমি দূরত্ব রাখছি, দরজা নিচ দিয়ে খাবার দিচ্ছি, বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকছি। নিজ স্বার্থে? করোনার সময়টা আমাদের পাল্টে দিয়েছে।
lআমাদের স্খলন এগিয়ে এনেছে, ক্ষরণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে মেঘের সোনালি কিনারার মতো, ছবিগুলো আমরা পেয়েছি। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ প্রিয় শিল্পী।
llআপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- ছবি
