ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

অবরোধবাসিনীর রোকেয়া

অবরোধবাসিনীর রোকেয়া
×

বেগম রোকেয়া [৯ ডিসেম্বর ১৮৮০–৯ ডিসেম্বর ১৯৩২]

নাহিদা নাহিদ

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) একজন নারী-মুক্তিকামী চিন্তক। তাঁর সাহিত্য প্রয়াসের একটি মৌল প্রতিপাদ্য বিষয়: অবরোধ প্রথার মাধ্যমে প্রচলিত নারী নিপীড়ন সম্পর্কে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সমব্যথী দৃষ্টি জাগ্রতকরণ। এ সংক্রান্ত তাঁর উল্লেখযোগ্য এবং আলোচিত গ্রন্থটির নাম অবরোধ-বাসিনী (১৯৩১); যা ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকের ভারতীয় সমাজে প্রচলিত কঠোর পর্দার নামে নারীর ওপর চাপানো ‘যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত’-এর এক কৌতুকপ্রদ উপস্থাপন। বস্তুত গল্প, রম্যরচনা, রিপোর্টাজ ছাপিয়ে এটি এমন একটি ‘ডিসকোর্স’, যা মোট ৪৭টি অনুগল্পের মাধ্যমে প্রদর্শন করে ভারতবর্ষীয় নারীদের শারীরিক-মানসিক অবরুদ্ধতার বিচিত্র পরিস্থিতি। কুলবালাদের অবরোধ যে কেবল পুরুষদের সম্মুখে নয়, মেয়েমানুষের সম্মুখেও, তাও অবগত করে রোকেয়ার প্রবন্ধ। রোকেয়া এই প্রথাকে প্রাণঘাতক ‘কার্ব্বনিক এসিড’ গ্যাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা বিনা ক্লেশে তিল তিল করে নীরবে মানুষ মারে। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বালিকাদের অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া এবং বাড়ির চাকরানি ব্যতীত অপর কোনো স্ত্রীলোকে দেখতে না পাওয়াকে ঘৃণ্য চোখে দেখেছেন তিনি। রোকেয়া নিজে পাঁচ বছর বয়স থেকেই স্ত্রীলোকের সঙ্গেও পর্দা করতে বাধ্য ছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাওয়ালি মুরগি যেমন আকাশে চিল দেখিয়া ইঙ্গিত করিবামাত্র তাহার ছানাগুলি মায়ের পাখার নিচে পলায়, আমাকেও সেইরূপ পলাইতে হইত।’ অপরিচিত কেউ নারী বা পুরুষ হঠাৎ এসে পড়লে রান্নাঘরে ঝাঁপের অন্তরালে, কখনও কোনো চাকরানির গোল করে জড়িয়ে রাখা পাটির অভ্যন্তরে, কখনও তক্তপোশের নিচে লুকোতেন তিনি। তাঁর নিজ অভিজ্ঞতার উদাহরণে আরও বলেছেন, তাঁর স্কুলের মেয়েদের জন্য তৈরি মোটরবাসটি ছিল প্রায় ‘এয়ার টাইট’ বা ‘চলন্ত অন্ধকূপ’। ফলে কেউ ‘গরমে অস্থির হইয়াছিল’, কেউ ‘বমি করিয়াছিল’, এবং ছোট মেয়েরা ‘অন্ধকারে ভয় পাইয়া কাঁদিয়াছিল’।
যদি ঘরের বাইরের প্রসঙ্গ দেখা হয় তবে পর্দার এই বাড়াবাড়ি কখনও কখনও ছিল চরম ট্র্যাজেডিক। যেমন: কিউল স্টেশনে ট্রেন বদলানোর সময় রোকেয়ার এক দূর-সম্পর্কীয় মামিশাশুড়ি প্রকাণ্ড বোরকায় জড়িয়ে ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে পড়ে গেলে, তাঁর পরিচারিকা ধর্মের দোহাই নিয়ে অনুরোধ জানায়: ‘কোনো পুরুষ যেন বিবিসাহেবার শরীর স্পর্শ না করে।’ ফলত এর পরিণতি হলো, সাহায্য না পেয়ে ‘ট্রেনের সংঘর্ষে মামানি সাহেব পিষিয়া ছিন্নভিন্ন হইয়া গেলেন এবং এই অবস্থায় ১১ (এগারো) ঘণ্টা অতিবাহিত হইবার পর তিনি দেহত্যাগ করিলেন।’ এ ছাড়া রোকেয়া দেখান যে, তাঁর সময়ে বিয়ে উপলক্ষে কনেকে ‘মাইয়াখানা’ নামক অন্ধকার ও রুদ্ধ ঘরে ছয় মাস আবদ্ধ করে রাখায়, ‘সর্বদা চক্ষু বুজিয়া’ থাকার ফলে কনের চোখ দুটি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়।
অবরোধ-বাসিনীর আরও এক গল্পে উল্লেখ আছে, হজযাত্রী সম্ভ্রান্ত বিবিরা মোটা বোরকা পরিয়া প্ল্যাটফর্মে উবু হয়ে বসলে, হাজিসাহেব তাদের উপর মোটা শতরঞ্জি ঢেকে দেন। এ অবস্থায় তাদের এক-একটা ‘বোঁচকা’ বা ‘বস্তা’র মতো দেখাচ্ছিল। যখন এক ইংরেজ কর্মচারী সেগুলোকে ‘আসবাব’ মনে করে সরাতে বললেন, তখন বেগমেরা পর্দার সম্মান রক্ষায় ‘জুতার গুঁতা খাইয়াও টুঁ শব্দটি করেন নাই’। এই বর্ণনায় নারী কীভাবে ‘মানব-বোঝা’ বা ‘আসবাব’-এ পরিণত হয়েছে, সে বাস্তবতা ছিল করুণ। সবচেয়ে পীড়াদায়ক হলো, পর্দার নামে এই চরম নারী অবমাননায় নারী নিজেই ছিল নিস্পৃহ। এজন্য অবরোধে থাকা অভ্যস্ত নারীদের প্রসঙ্গে রোকেয়া বলেন: ‘মেছোনিকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, ‘পচা মাছের দুর্গন্ধ ভালো না মন্দ?’ সে কী উত্তর দিবে?’ এরূপ অসংখ্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির অপ্রিয় বিশ্লেষণে ঋদ্ধ অবরোধ-বাসিনীর প্রেক্ষাপট।
শৈশব থেকে দেখে আসা নারীর নানারূপ করুণ অবস্থা রোকেয়ার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, পরিপ্রেক্ষিতে ‘কতকগুলি ঐতিহাসিক ও চাক্ষুষ সত্য ঘটনার হাসি-কান্নাকে আশ্রয় করে অবরোধ-বাসিনী রচিত হইল’; এবং সেখানে সবচেয়ে প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠল নারীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিশেষ কিছু শিষ্টাচারের প্রতি তীক্ষ্ণ বিদ্রুপবাণ। তাঁর এই বিদ্রুপ একই সঙ্গে হাস্যরস ও বেদনা উদ্রেককর। যদিও রোকেয়া তাঁর মতাদর্শে ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্ট কিন্তু তাঁকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রও নেহাত কম নয়। তিনি অবরোধ-বাসিনীর নিবেদনে বলেন: ‘আমি কারসিয়ং ও মধুপুর বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সুদর্শন পাথর কুড়াইয়াছি; উড়িষ্যা ও মাদ্রাজে সাগরতীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিবিধ আকারের ঝিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি। আর জীবনের ২৫ বৎসর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইতেছি।’ রোকেয়া কখনোই পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে ছিলেন না, বরং তাঁর আপত্তি ছিল এর বাড়াবাড়ি প্রয়োগের বিরুদ্ধে। তাঁর মতিচুর গ্রন্থের ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘বোরকা পরিয়া হাত-পা মুড়িলে দোষ নাই; কিন্তু জ্ঞানচর্চার অবকাশ না থাকা দোষ।’ এ ছাড়া ‘বোরকা’ নামক প্রবন্ধে তিনি প্রমাণ করেছেন যে নারীর প্রকৃত অন্তরায় শারীরিক পর্দা নয়, বরং মানসিক দাসত্ব যা নারীর মনকে অন্তঃপুরে আবদ্ধ রাখে। অর্থাৎ পর্দা যখন নারীর জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কর্মের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে ‘জীবন্ত কবর’-এ পরিণত করে, তখনই তিনি তার বিরুদ্ধে অবস্থান করেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এই অবরোধ প্রথার নেপথ্যে ধর্মাচরণের নামে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব বিদ্যমান। ফলে চরম রক্ষণশীল সমাজের মধ্যেও তিনি অবরোধের বাস্তব অবস্থা প্রদর্শনে ছিলেন আপসহীন। অবরোধ প্রথায় নারীর শরীর ও মনে সমাজের অতিগোপন অপ্রকাশ্য চাপেরও যে ক্ষতিকর প্রভাব রয়ে যায় রোকেয়ার দৃষ্টি সেদিকেও ছিল নিবদ্ধ। তিনি বলেছেন, ‘সর্বদা গৃহকোণে বন্দিনী থাকায় তাহাদের স্বাস্থ্য ভঙ্গ হয়’; প্রকৃতই কঠোর পর্দায় আবদ্ধ থাকা নারী-শরীর ভিটামিন ডি-এর অভাব বোধ করে এবং এর ফলে দুর্বল হাড় ও স্থূলতাজনিত রোগ বৃদ্ধির সঙ্গে বাইরের জগৎ সম্পর্কে তাদের মনোজগতে তৈরি হয় আতঙ্ক। ফলে অবরোধ-বাসিনী প্রবন্ধের রমণীগণের মতো তাদের করুণ পরিণতি না হলেও দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগজনিত ব্যাধি ও বিষণ্ণতা তাদের নৈমিত্তিক অনুসর্গ হয়ে দাঁড়ায়।
রোকেয়ার সংগ্রাম ছিল অযৌক্তিক রীতির বিরুদ্ধে, যা নারীদের ‘মাইয়াখানা’, ‘চলন্ত অন্ধকূপ’ বা পালকির পাঁচ স্তরের প্যাকেজিংয়ের শারীরিক বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিতে পারে। ফলে তাঁর অবরোধ-বাসিনী’র বার্তা তৎকাল ছেড়ে বর্তমান সময়ের জন্যও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। রোকেয়ার সময়ে দেখা যায়, যখন তিনি তাঁর স্কুলের মেয়েদের জন্য মোটরবাসের ব্যবস্থা করেন, তখন পর্দা বাতাসে উড়ে যাওয়ার অজুহাতে বেনামি চিঠিতে হুমকি আসে, গাড়িটি ‘বে-পর্দা’ হয়ে যাওয়ায় স্কুলের কুৎসা রটানো হবে। এটি ছিল নারীর দৃশ্যমানতার বিরুদ্ধে সমাজের আক্রমণ। 
বর্তমানেও এই আক্রমণ চলমান ও সুসংগঠিত। এই বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসেও বিনোদনকর্মী, পেশাজীবী, এমনকি রাজনীতিতে প্রবেশ করা নারীকে প্রায়শই সামলাতে হয় ‘সাইবার বুলিং’। পোশাক ও জীবন-যাপনের প্রশ্নে শিকার হন অনলাইন ‘মোরাল পুলিশিং’-এর দণ্ডে। যা তাদের পেশাগত দক্ষতা ছাপিয়ে ‘অবরুদ্ধ হওয়া’ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত করার প্রতি উৎসাহী করে। শুধু দৈশিক নয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এরূপ দমন ঘটছে অহরহ। কট্টর রক্ষণশীল কিছু দেশে হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করতে গিয়ে তরুণীদের যে মৃত্যু ঘটছে তা রোকেয়ার বর্ণনাকৃত ‘মামিশাশুড়ির ট্রেনের সংঘর্ষে পিষিয়া ছিন্নভিন্ন’ হওয়ার মতো করুণ। এ ছাড়া প্রতিবেশী একাধিক দেশে নারীদের পেশাগত কাজ (যেমন– সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা) সরাসরি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়াগুলো কেবল নারীর অবমাননা নয়, বরং যে কোনো দেশের একশ্রেণির জনগোষ্ঠীর একপেশে উচ্চম্মন্যতার চরম বিকশিত রূপ।
এই সামগ্রিক পরিবেশগত পরিস্থিতিতে জ্ঞানীয় পুনর্গঠন ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যাগুলো যেমন: পুরুষতান্ত্রিক করুণা চিহ্নিত ও চ্যালেঞ্জ করে একটি স্বাস্থ্যকর ও স্বাধীনতা-সমর্থক জীবনধারার প্রয়োগ, নারীর জন্য উন্মুক্ত ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ শুধু কাগজে-কলমে না রেখে বরং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা নারীকে কার্যকর সহায়তা দান ও রোকেয়ার ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা এবং আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ সন্ধান করা যেতে পারে। রোকেয়ার বক্তব্য অনুযায়ী ‘আমরা অন্যায় পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব’। প্রকৃতই পর্দাকে আমরা কেবল অন্তঃপুরের চারপাশে প্রাচীর দেওয়া অবরোধে ব্যবহার না করে মনোজগতের অপরাধপ্রবণতা ও হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তির প্রয়াসে ব্যবহার উপযুক্ত করলেই রোকেয়ার দেখানো পথ ধরে নারী একটা প্রাণবন্ত জীবনের সন্ধান খুঁজে পেতে পারে। 

আরও পড়ুন

×