ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের রঘু রাই

মুক্তিযুদ্ধের রঘু রাই
×

রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

পারভেজ চৌধুরী

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিষয় শক্তিশালী হলে একটি আলোকচিত্রই ইতিহাসের বড় সাক্ষী হতে পারে– কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই [পুরো নাম রঘুনাথ রাই চৌধুরী] এ কথাটি তাঁর তোলা প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রেই সত্য। কথাটি প্রায় সবাইকেই বলতেন পরম শিক্ষকের মতো।
যে ক’জন দেশি ও বিদেশি আলোকচিত্রী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছেন, তাদের মধ্যে রঘু রাই অন্যতম। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ভারতের বিখ্যাত ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার তরুণ ফটোগ্রাফার। ছবি তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন শরণার্থী শিবিরের অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা, পাইপে আশ্রয় নেওয়া কাতরগ্রস্ত মানুষের দুঃসহ যন্ত্রণা, ক্লান্ত অবুঝ শিশুর করুণ চাহনি, আর্তচিৎকার, উদ্বাস্তু মানুষের গন্তব্যহীন ছুটে চলা। প্রতিটি ছবিই যেন যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক। যুদ্ধ চলাকালীন প্রতিদিন নিরাপত্তাহীন যাপনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র ও পতাকা হাতে নিয়ে রিকশায় চড়ে যাতায়াতের হাসিমাখা ছবি ফ্রেমে বন্দি করেছেন। এসবই যেন সাহসিকতার অগ্নিময় উত্তাপ। আরও ছবি তুলেছেন ১৬ ডিসেম্বর রমনার রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের। এসবই কি সেই সময়ের নিছক ছবি? না। সে সময়ে সব আলোকচিত্রীর প্রকৃত ক্যামেরা হয়ে উঠেছে অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী।
এসব ছবি বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে, বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় জাতীয় স্মৃতির অংশ। গৌরবময় জাতিসত্তার এক-একটি দ্যুতিময় হীরকখণ্ড।
মুক্তিযুদ্ধের আর সব ফটোগ্রাফারের আলোকচিত্রের মতো রঘু রাইয়ের ছবিগুলোও এই বর্তমান সময়কে কেন্দ্র করে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ– এই তিন পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখে। প্রথমত, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছবিগুলো প্রকাশের মাধ্যমে পাকিস্তানি সরকারের পবিত্র যুদ্ধের প্রবল প্রচারণার বিপরীতে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশে সংগঠিত নির্মমতা ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বজনমত তৈরিতে বিশাল ভূমিকা রাখে রঘু রাইয়ের ছবি।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান সময় অর্থাৎ ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণহত্যা, জেনোসাইড, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীনতাবিরোধীদের ভূমিকা অস্বীকার করার যে ‘রেটোরিক ডিনায়াল’ প্রবণতা ও অপতৎপরতা দেখা দেয়, এই সংকটময় সময়েও রঘু রাইয়ের ছবি নির্ভরযোগ্য ভিজ্যুয়াল প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
তৃতীয়ত, অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশে গণহত্যা স্বীকৃতির আন্দোলন চলে আসছে এবং তা স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত ভবিষ্যতেও এ আন্দোলন চলতে থাকবে। আন্তর্জাতিক পরিসরে ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি না দেওয়ার রাজনীতি চলে আসছে পাশাপাশি স্বীকৃতি আদায়ে চলছে বিভিন্ন পর্যায়ের বৈশ্বিক তৎপরতা। সেইসব তৎপরতার অন্যতম বিশ্বস্ত দলিল রঘু রাইয়ের ছবি। তিনি তাঁর ক্যামেরায় ধরেছেন জাতিগত নিধনের সরাসরি কর্মকাণ্ড। ভবিষ্যতের যে কোনো ট্রাইব্যুনালের জন্য তা অকাট্য ডকুমেন্টস। 
এই প্রবহমান অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের দীপ্তিময় ভিত্তি নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধকালীন রঘু রাইয়ের ছবিগুলো অন্যতম অনুষঙ্গ। সেজন্যই আলোকচিত্রী রঘু রাই এবং রঘু রাইয়ের তোলা মুক্তিযুদ্ধের ছবি আমাদের মানে বাংলাদেশের কাছে সব সময়ই গুরত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। যদিও শারীরিকভাবে পৃথিবীতে রঘু রাই নেই কিন্তু তাঁর তোলা ছবি অমোঘ প্রামাণ্য হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল। রঘু রাই এই অনন্য কাজের জন্য ১৯৭২ সালে ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হন। বাংলাদেশে তাঁর ছবি নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে, তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন। বাংলাদেশের তরুণ আলোকচিত্রীদের সাথে দল বেঁধে বিভিন্ন স্থানে ছবি তুলে বেড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ : দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম’ নামে একটি বই। ২০১৩ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার অনার’ সম্মাননা জানায়। গত শতকের সত্তর দশকে নিজের কাজের মাধ্যমে অস্থির, অশান্ত সময়কে অবগাহন করেছেন আলোকচিত্রী রঘু রাই। সরাসরি দেখেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের উত্তাল জোয়ার, পশ্চিমবঙ্গের নকশাল বিদ্রোহের অগ্ন্যুৎপাত। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে প্রচলিত শিল্পের সীমান্ত ভাঙার প্রবণতা। সেই উত্তাল সময়ে মানুষ মুখোমুখি হয়েছে নতুন নতুন প্রশ্নের। দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছে সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের। ৭০ দশকের শিল্পবিদ্রোহ শুধু শিল্পমাধ্যম বদলের গল্প নয়, গল্পগুলো ছিল সিস্টেম পরিবর্তনের। সে সময়ে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যুক্ত হতে থাকে ভিজ্যুয়াল ইমেজ। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মতো সমীকরণ পাল্টাতে থাকে ফটোগ্রাফির। প্রমাণ হতে থাকে ছবি কেবল ইতিহাসের পাশের দৃশ্য নয়, ক্ষমতারও প্রতীক। কাজ করতে করতে পালা বদলের এসব রূপান্তর নীরবে নিঃশব্দে প্রত্যক্ষ করে গেছেন আর দিনের পর দিন অনুসন্ধিৎসু আলোকচিত্রী রঘু রাই নিজেকে   
করে তুলেছেন উর্বর, ঋদ্ধ। পেশাগত জীবনে কাজ করেছেন বিভিন্ন স্বনামখ্যাত পত্রিকা, ম্যাগাজিনসহ বিশ্বখ্যাত ম্যাগনাম ফটো এজেন্সিতে। সে সময়ে তাঁর সাথে কাজ করেন কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কারতিয়ে-ব্রেঁসো, রিচার্ড অ্যাভেডন, সুজান উড, জোসেফ কাউডেলকা প্রমুখ।
কবি জালালুদ্দিন রুমির একটি কথা আছে– ‘তোমার ভেতরটা যা বাইরে তুমি তাই-ই দেখো।’ রঘু রাই জালালুদ্দিন রুমি পড়েছেন কিনা আমার জানা নেই কিন্তু তিনি সব সময় বলে গেছেন একজন আলোকচিত্রীর আসল সেন্সর থাকে ক্যামেরায় নয়, হৃদয়ে যা উন্মীলন করে তৃতীয় নয়ন। একজন আলোকচিত্রী কী ছবি তুলবেন, কী ফ্রেমিং করবেন, তা নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
রঘু রাই কেবল নিজের ছবির ভাষা তৈরি করেননি। চেয়েছেন এই অঞ্চলের আন্তর্জাতিকময় দৃশ্যভাষা তৈরি হোক। সেভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন নবীনদের। রাজনীতিবিদ ইন্দিরা গান্ধী, অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়, দালাই লামা, বিসমিল্লাহ খানের নিজ নিজ মহিমার অভিব্যক্তি থেকে শুরু করে লেন্সবন্দি করেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী শিবিরের সেই ক্ষুধা ও পীড়নে জর্জরিত মানুষের চোখ ও চামড়ার ভাঁজে ফুটে ওঠা নীরব যন্ত্রণা। মানবিক বোধের দৃশ্যায়ন করেছেন বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে ভারতের ভুপাল ট্র্যাজেডির। আর এ সবকিছুতেই পরিস্ফুট হয়েছে রঘু রাইয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক ন্যায্যতায় বিশ্বাসের সরাসরি অংশ হয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে রঘু রাইয়ের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। 

আরও পড়ুন

×