যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মপ্রতিকৃতি
খালেদ হোসাইন
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিরপ্রণম্য এক মানবিক সত্তা। ১৬৫তম জন্মবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। যদিও বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন পড়ে না, আমাদের ব্যক্তিগত ও সমবেত জীবনের সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, প্রত্যাখ্যানে ও প্রত্যাশায় রবীন্দ্রনাথই আমাদের সবচেয়ে মহৎ আশ্রয় ও নিরাপদ আশ্রম। ব্যর্থতা বা সাফল্যে, প্রণয়ে বা প্রতিকূলতায়– অকূল অন্ধকারে তিনিই আমাদের প্রথম ও প্রধান অবলম্বন। এখন, যখন জাতীয় জীবনে ঘনীভূত হয়েছে অনিঃশেষ অন্ধকারের আদিগন্ত আশঙ্কা, মনে উঁকি মারে রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’ কবিতাটি। কবিতা, কারণ কবিতা পাঠককে তার বস্তু-পরিপার্শ্বগত এবং জাগতিক ও মানসিক আলোড়নে প্রকম্পিত অথবা সুস্থিত পরিস্থিতি থেকে অন্য এক মায়ালোকে নিয়ে যায়, সেখানে পাঠক এক ধরনের মানসিক স্বস্তি ও প্রশান্তি অথবা আনন্দ এবং জীবন-যাপনের প্রণোদনা লাভ করে, পাঠকের চৈতন্যে সংযোজিত হয় অভিনব অভিসারের অভিজ্ঞান। ‘দুঃসময়’ শিরোনামে একাধিক কবিতা আছে তাঁর, কারণ দুঃসময় আমাদের জীবনে নানান রূপে, নানানভাবে উপর্যুপরি হামলে পড়ে। কিন্তু আমার মাথায় রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’টি “কল্পনা” কাব্যের। প্রায় সর্বজনপরিচিত একটি কবিতা, যার শুরু– ‘যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে/ সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া।/ যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,/ যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,/ মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,/ দিক-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা–...’। কিন্তু না এমন দুঃসহ দিগন্ত-প্রসারিত বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে, অবসাদে বিপর্যস্ত অবস্থার অনুপম বর্ণনার মধ্যেই এই কবিতার প্রথম স্তবকটি শেষ হয়নি, শেষ হয়েছে অনিঃশেষের ব্যঞ্জনাগর্ভ প্রবল আশাবাদের মধ্য দিয়েই– ‘তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,/ এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।।’ স্তব্ধ ও স্তম্ভিত চরাচরে, অন্তহীন আকাশে অভ্রস্পর্শী বাসনা নিয়ে আকাশে ভ্রাম্যমাণ পাখিটির ডানা যেন গুটিয়ে না যায়, চোখ যেন বন্ধ হয়ে না যায়– রবীন্দ্রনাথ এ কবিতার পাঁচটি স্তবকে, প্রতিবার, এই আহ্বানটি উচ্চারণ করেছেন। কারণ, জীবনের করাল কালবেলায় মানুষের আশার আলোও বারবার ফিরে ফিরে আসে। আশাই ভরসা, আশাই আনন্দ এবং আনন্দের মৃত্যু নেই।
আমাদের জীবন থেকে যখন মানবীয় সুকুমারবৃত্তির যাবতীয় সঙ্গ ও অনুষঙ্গ আক্রান্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, সংগীতমগ্নতার জন্য বাউলদের ওপর খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে কোনো একটি সশস্ত্র সম্প্রদায়, প্রগাঢ় আধ্যাত্মিকতার বোধে আচ্ছন্নদের আক্রমণ করা হয়, বিস্তৃত হয় হত্যার বিভীষিকা, পুড়িয়ে, মাড়িয়ে ও জ্বালিয়ে দেওয়া হয় মাজারের পর মাজার– দেশটা তখন সত্যি হয়ে ওঠে মৃত্যু-উপত্যকা। সুন্দর চিন্তা, পরিচ্ছন্ন দর্শন, প্রকৃত মানবিক বোধ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনধারা হয়ে পড়ে এক অবরুদ্ধ বাস্তবতা, সমস্ত আকাশে তখন হাহাকারই বিরাজ করে, তখন এমন অনুভূতিই মনে তীব্র হয়ে বেজে ওঠে, ‘সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া।’
শতবর্ষ পূর্বে কোন পরিপ্রেক্ষিতে, অনুভূতির কোন আলোড়ন থেকে এ কবিতাটি লেখা হয়েছিল, কতবার এ খসড়া প্রণয়ন করেছিলেন, সেইসব তথ্য দুর্লভ নয়, কিন্তু আমাদের চিত্তকে অভিভূত করে শিল্পের সেই অনিবার্য বিশেষত্বটি, যাকে বলা হয় শিল্পে স্বতঃপুনরুৎপাদনের সামর্থ্য। ‘দুঃসময়’ কবিতাটিও তা-ই। সৃষ্টিকালীন আত্মিক ও যুগ-চাহিদার মধ্যেই তার তাৎপর্য নিঃশেষ হয়ে যায় না, পরিবর্তিত বাস্তবতায় এর অন্তর্গত আকুলতা বারবার আমাদের নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হয়ে আসা প্রাণে উজ্জীবন-রস সঞ্চারিত করে, আমরা সর্বান্তঃকরণে জেগে উঠি, সক্রিয় হয়ে উঠি। এ কবিতা আমাদের জাতীয় জীবনের অতিক্রান্ত নানা কালপর্বের নানা আন্দোলনে এ কবিতা থেকে আমরা উদ্দীপনা ও সাহস সঞ্চয় করে লড়াই করেছি, বিজয়ও ছিনিয়ে এনেছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। হতাশার ম্রিয়মাণতা বাতাসে মিলিয়ে দিয়েছে এই কবিতা। এবং এখন, আবারও আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক এমন এক বাস্তবতা আমরা আমাদের শ্বাস রুদ্ধ করে ফেলেছে, নিরাশা ও হতাশা পঙ্গপালের মতো চারদিক থেকে উড়ে এসে চরাচরে জুড়ে বসেছে– জমাট এক অন্ধকারের উঁচু ও ভারী এক দেয়াল-ঘেরা কারাগারে যেন বন্দি হয়ে পড়েছি আমরা। কিন্তু প্রবল ও পরাক্রান্ত প্রতিকূলতায় আত্মসমর্পণ মোটেও মানবীয় বাস্তবতা নয়। নিস্তেজ ও নিস্পৃহ আশাকে তাই জাগিয়ে তুলতে হয়, সদর্থক স্বপ্নের সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। ইচ্ছের এই তীব্রতাই মানুষকে সক্রিয় ও স্পর্ধিত করে তোলে।
মানুষের সাধনা মূলত মুক্তপ্রাণের সাধনা। ‘সাধনা’, কারণ মুক্তপ্রাণের বাস্তবতা বা অবারিত আনন্দ সহজলভ্য নয়। নানা ধরনের রক্ষণশীল চিন্তায় আকীর্ণ কূপমণ্ডূক মানুষের সংখ্যা সমাজে বা রাষ্ট্রে কম নয় এবং তা আশঙ্কজনকভাবে বাড়ছে, বেড়েই চলেছে। সুস্থ ও স্বাভাবিক, স্বচ্ছ চিন্তা করার সামর্থ্যসম্পন্ন মানুষমাত্রই তাই অসহায়ত্বের বোধে আক্রান্ত হতেই পারেন কিন্তু তারা কখনোই হতোদ্যম হয়ে পড়েন না। শেষ-পর্যন্ত লড়াইটা অব্যাহত রাখতে চান বজ্রচেরা আশার আলোকে সর্বত্র সম্প্রসারিত করার মানসিকতা নিয়ে আঁকড়ে ধরে। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, কূপমণ্ডূক ধ্যান-ধারণা, আত্মপরায়ণ জীবনদৃষ্টি, গর্জন ও আস্ফালন যখন চারপাশকে বিমথিত করতে থাকে, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের স্পৃহা তখন দৃশ্যাতীত এক অন্তর্গরজে ফুঁসে উঠতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে এ কথাই সত্যকে মূর্ত করে তোলে যে, ‘এ নহে মুখর বনমর্মর গুঞ্জিত,/ এ যে অজাগর গরজে সাগর ফুলিছে।/ এ নহে কুন্দ কুঞ্জকুসুমরঞ্জিত,/ ফেনহিল্লোলে কলকল্লোলে দুলিছে।’ কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায় না যাবতীয় তামসিক আয়োজন, এখনও সম্মুখে ‘সুচির শর্বরী’ বা এক ভয়াল অন্তহীন রাত, সূর্যও যেন ঘুমিয়ে আছে বহু আলোকবর্ষ দূরে। তবু নিরাশার অন্ধকারে নিজেকে নিমজ্জিত হতে দেওয়া যাবে না। কারণ, এই বিপর্যয়ের মধ্যেই ‘অকূল তিমির’ সাঁতরে দেখা দেবে ‘দূর দিগন্তে ক্ষীণ শশাঙ্ক বাঁকা’। আর তাই, ‘ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,/ এখনি অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।’
শিল্পের কাছে, সুতরাং কবিতার কাছেও মানুষের একটি মহৎ প্রত্যাশা জীবন-যাপনের প্রণোদনা। প্রবল প্রতিকূলতায় এই কবিতা আমাদের জৈবনিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশাকে টিকিয়ে রাখে, জাগিয়ে রাখে, বাঁচিয়ে রাখে। অন্তহীন ধৈর্য আর এক স্ফুলিঙ্গ আশাবাদকে রবীন্দ্রনাথ খুব কোমল সব শব্দের বিন্যাসে, ষড়মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আবিষ্ট আবহে অবিচ্ছেদ্য এক মমতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর আশাবাদে কোনো বিভ্রাট নেই, বিরাম নেই, উদ্ভটত্বের এতটুকু স্পর্শ নেই। নেই ভয়ও– এটাই মূল বিবেচ্য। কেননা প্রত্যাশা-ভাস্বর আশা আছে, আছে মহানভ-অঙ্গন। নিবিড় তিমিরে আচ্ছাদিত ভোরের ইশারাও অবশ্য আচ্ছাদিত। তবু–
‘ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।’
- বিষয় :
- গল্প
