ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানুষ ও জীবনের প্রতি মমতা

মানুষ ও জীবনের প্রতি মমতা
×

সেলিম জাহান

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ও বাঙালির জীবনে রবীন্দ্র-প্রভাব সর্বপ্লাবী। তবে এ প্রভাব শুধু রবীন্দ্রনাথের সর্বতোমুখী প্রতিভার কারণেই নয়, বরং এর অন্যতম কারণ এ দেশ, মাটি, সমাজ, মানুষ ও জীবনের প্রতি তাঁর অসীম অনুরাগ ও মমত্ববোধ। বাংলাদেশের সমাজ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রচুর প্রত্যক্ষ রচনা আছে, যা তার সমাজ-ভাবনার স্বাক্ষর বহন করে, এবং প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু শুদ্ধ নন্দনতাত্ত্বিক কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজ-সচেতন একজন আধুনিক মানুষ।
রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেষ্টা করেছেন, যে সমাজে বস্তুগত সম্পর্ক নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মার বন্ধন হবে মুখ্য, যে সমাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে পল্লী অঞ্চল এবং যে সমাজ ঐতিহাসিকভাবে ভারতবর্ষে যেভাবে ছিল সেভাবে স্বনির্ভর হয়ে গড়ে উঠবে। এ জাতীয় সমাজের স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথের মনে ছিল এবং ‘শান্তিনিকেতন’ গড়ার পেছনে এ জাতীয় চিন্তা-চেতনা তাঁর মনে কাজ করেছে। এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এ দেশের সমাজ, তার স্বরূপ ও প্রকৃতি, তার গতিময়তা, এসব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটে যখন জমিদারির কাজ উপলক্ষে তিনি পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে এসেছিলেন এবং বেশ কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেছিলেন। বস্তুত বাংলাদেশের পল্লীসমাজ, কৃষিব্যবস্থা, গ্রামীণ দারিদ্র্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় তাঁর পূর্ববঙ্গে অবস্থানকালেই। অতএব তাঁর সমাজ-সচেতনতা, অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণা এবং সার্বিক চিন্তাধারার গঠন, পরিবর্তন এবং পরিপক্বনের ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের জীবন একটি অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।
ভারতীয় সমাজব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, স্বনির্ভর পল্লীসমাজ ছিল এ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। এ ব্যবস্থার দুটো মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল: এক. এ সমাজে প্রতিটি মানুষ একে অন্যের প্রয়োজন মেটাত এবং দুই. এ সমাজে গ্রামপতি ও গ্রামবাসীদের মধ্যকার সম্পর্কটি ছিল রক্ষণ ও আনুগত্যের। এ সমাজকাঠামো থেকে কয়েকটি জিনিস বেরিয়ে আসে। যেমন– এখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবসায়িক বন্ধন ছিল নিঃসন্দেহে, কিন্তু সে বন্ধনকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে একটি আত্মীয়তার বন্ধন; এখানে শাসক ও শাসিতের মধ্যকার সম্পর্ক শোষণের ছিল না, বরং শাসক শাসিতের স্বার্থ যথার্থভাবে রক্ষা করতেন এবং শাসিত শাসকের অনুগত ছিল। এখানে ধনের আধিক্য দ্বারা যেমন নেতৃত্ব লাভ করা যেত না, তেমনি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণেও সম্পদের কোনো মুখ্য ভূমিকা ছিল না। ভারতীয় সমাজের এই রূপটিকেই রবীন্দ্রনাথ আদর্শস্থানীয় ও কাম্য বলে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তা-চেতনায় এ জাতীয় একটি সমাজকাঠামোয় পৌঁছুনোর প্রয়োজনীয় কর্মধারা প্রাধান্য পেয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের ভাবনায়, মাতৃভূমির যথার্থ স্বরূপ গ্রামের মধ্যেই এবং পল্লীসমাজের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হচ্ছে আত্মীয় ও প্রতিবেশী সম্পর্ক। একে সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে দিলে মানবসম্বন্ধের মাধুর্য অন্য কোনো আধারে রক্ষা করা যাবে না, এটাই ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস। মানুষের সঙ্গে মানুষের কিছু সম্পর্ক থাকে, যাকে বলা চলে প্রয়োজনের সম্পর্ক অথবা ব্যবসায়িক সম্পর্ক। সেখানে একজন মানুষ অন্য মানুষের কাছে মূলত একটি কার্যসাধনের কল। আবার অন্য এক সম্বন্ধ আছে যাতে প্রয়োজনও হয়তো মেটে, কিন্তু প্রয়োজনের বেশি কিছু পাওয়া যায়। মানুষে-মানুষে এ দ্বিতীয় সম্বন্ধের ভিত্তিতেই রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজকে চিহ্নিত করেছেন এবং সে-সমাজ মুখ্যত পল্লীসমাজ।
এ আত্মীয় বা প্রতিবেশী সমাজে এমন দিন ছিল যখন গ্রামের সম্পন্ন ব্যক্তিরা, জমিদার শ্রেণি ও গ্রামপতিরা গ্রামত্যাগী হতেন না, পল্লীই তাদের বাসস্থান ছিল। ধনীর ও পল্লীপতির একটা দায়িত্ব সেদিন ধর্মে স্বীকৃত ছিল; সে-অনুশাসন সকলে সমানভাবে মানতেন এমন নয়, তবু গ্রামসমাজে যারা বিত্তবান, তাদের বিত্ত নানাপ্রকার দানের ভেতর দিয়ে সমাজের সেবায় নিযুক্ত হতো। তারাও সমাজের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সম্মান ও আনুগত্য পেতেন তাদের কর্মের কারণে, বিত্ত বা বৈভবের কারণে নয়। দেশের-সমাজের অভ্যন্তরেই সে ব্যবস্থা ছিল, যার দ্বারা সমাজ নিয়ত রক্ষা পেত ও পুষ্ট হতো।
বাংলাদেশের সমাজের গতিময়তা সম্পর্কে এটাই ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন যে, ভারতীয় ইতিহাসে চিরদিন রাষ্ট্র ও সমাজ দুটো ভিন্নতর সত্তা ছিল, এখানে রাষ্ট্রনীতি ও সমাজনীতির মধ্যে একটা দূরত্ব ছিল। রাষ্ট্র সমাজকে গ্রাস করতে পারেনি। রাজ্য নিয়ে যুদ্ধ চলেছে, এক রাজবংশের পতন ও অন্য বংশের অভ্যুত্থান ঘটেছে, রাজধানীতে পালাবদল দেখা গেছে, দেশি-বিদেশি নানা জাতি, নানা শক্তি সেখানে পর্যায়ক্রমে প্রভুত্ব করেছে; কিন্তু এসবই উপরতলার ইতিহাস, ভারতীয় সমাজ তথা পল্লীসমাজের সংগঠন ও সম্পর্ককে তা কোনোভাবেই বদলায়নি।
এ সমাজকাঠামোর সংগঠন ও সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাঝেই রবীন্দ্রনাথ এ সমাজের ক্রমাগত অনুন্নয়ন ও অবক্ষয়ের কারণ খুঁজেছেন। তিনটি কারণকে এ ক্ষেত্রে মৌলিক বলে তিনি চিহ্নিত করেছেন– যে কারণগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এর প্রথম কারণটি হচ্ছে বিদেশি বণিক ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বনির্ভর পল্লীসমাজ বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে এ সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থার স্থানীয় প্রয়োজন মেটানোর পরিবর্তে বিশ্ব বাজারের চাহিদা মেটানোর কাজে নিয়োজন, এ স্বনির্ভর সমাজের স্বনির্ভর রূপটুকু হারানো এবং এ সমাজ থেকে সম্পদের স্থানান্তর। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে বাণিজ্যের মাধ্যমে ধনসম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটছিল কিছু হাতে। এর দুটো ফলাফল দেখা গিয়েছিল– প্রথমত, আত্মীয় ও প্রতিবেশী সমাজে ব্যবসায়িক সম্পর্কটি বড় হয়ে উঠছিল। দ্বিতীয়ত, গ্রামপতি ও সাধারণ মানুষের সম্পর্কের আগের মানবিক ভিত্তি নষ্ট হয়ে তা ধনকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। সমাজের জন্য সুকর্ম ও গ্রামবাসীদের জন্য মমত্ববোধ তখন আর নেতৃত্বের কারণ হয়ে রইল না। সেই সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির কারণে রাজ্য পরিচালন কেন্দ্রগুলো নগরকেন্দ্রে পরিণত হলো, যার ফলে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে বণিকশক্তির একটি যোগাযোগ ঘটল। তৃতীয়ত, উপরিউক্ত দুটো কারণে গ্রামের যারা ধনবান ও বিদ্বান, তারা হলেন নগরবাসী। গ্রামের উদ্বৃত্ত ধন আর গ্রামে নিযুক্ত রইল না, পুঞ্জীভূত হলো শহরে। রবীন্দ্রনাথের মতে, এইখানেই গ্রাম সমাজের দুর্দশার, অবক্ষয়ের ও অনুন্নয়নের শুরু এবং তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, এ গ্রামীণ সমাজের অবক্ষয় ও অনুন্নয়নকে রোধ করে আত্মীয় ও প্রতিবেশী সমাজভিত্তিক স্বনির্ভর পল্লীসমাজ গড়ে তোলাতেই এ দেশের উন্নতি নিহিত। এ বিশ্বাস সামনে রেখেই তিনি পল্লীতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পল্লীর প্রাঙ্গণকে এবং স্থাপন করেছিলেন শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠান। জীবনের ঠিক মধ্যবিন্দুতে এসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশ্রম ও কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেন শান্তিনিকেতন ও সুরুলের গ্রাম; শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজ সংগঠন নিয়ে বীরভূমের ঐ পল্লীপরিবেশে চলল চল্লিশ বছরব্যাপী তাঁর অক্লান্ত সাধনা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “পল্লীসঞ্জীবনই আমার জীবনের প্রধান কাজ।” এ সঞ্জীবন কাজটি করতে গিয়ে তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী পরিকল্পনার রূপরেখা গভীরভাবে ভেবেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, যে স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজ তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান তার রূপরেখা ঐতিহাসিকভাবে যে স্বনির্ভর পল্লীসমাজ এ-দেশে ছিল ঠিক তার মতোই হবে অর্থাৎ এ সমাজ মানুষে-মানুষে আত্মীয়তা ও প্রতিবেশী-সম্পর্কভিত্তিক হবে এবং সেই সঙ্গে এ সমাজের নেতার সঙ্গে অনুগামীদের সম্পর্ক আমাদের পল্লীসমাজের ঐতিহ্যবাহী সম্পদ-নিরপেক্ষ রক্ষণ-আনুগত্যভিত্তিক হবে। তাঁর এ চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায় ১৩১১ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বদেশী সমাজ’, ‘স্বদেশী সমাজের পরিশিষ্ট’, ‘সফলতার সদুপায়’ ইত্যাদি প্রবন্ধে এবং ১৩১৪ সালে পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনীতে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে প্রতিমা দেবীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “জীবনের যা লক্ষ্য ছিল শ্রীনিকেতনে শান্তিনিকেতনে তা সম্পূর্ণ সিদ্ধ না হোক, সাধনার পথ অনেকখানি প্রশস্ত করেছি।” জীবনের এ লক্ষ্যের মধ্যে তাঁর সমাজ চিন্তা-চেতনাও প্রাধান্য পেয়েছে এবং এ কথা দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের সমাজ বিষয়ে ধ্যান-ধারণার ব্যবহারিক ক্ষেত্র হিসেবেই শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের জন্ম। শান্তিনিকেতনকে যারা শুধু ব্রহ্মচর্য আশ্রম কিংবা বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনস্থল বলে মনে করেন, তারা শান্তিনিকেতনের খণ্ডিত চিত্রই পান। আত্মীয়তা বা প্রতিবেশী সমাজভিত্তিক যে স্বনির্ভর পল্লীসমাজের স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, শান্তিনিকেতনকে তারই নিরীক্ষাগার বলা চলে। শ্রীনিকেতন সম্পর্কেও সে একই  কথা প্রযোজ্য। 

আরও পড়ুন

×