আপনি জাগাও আনন্দ
সময়ের উজানে অতীতমুখী ইতিহাস পাঠ
বেগম আকতার কামাল
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বোলপুর শান্তিনিকেতন আশ্রমে বৈশাখ ১৩০৯ বঙ্গাব্দে এটি পঠিত হয়। দার্শনিক হেগেলের মত যদি মানতে হয় তবে ‘ভারতবর্ষ’ গ্রন্থের পাঠকে আমরা প্রথমেই প্রতিপাদ্যরূপে ধরে নেব যে, প্রতিটি যুগ বা পর্বের– হতে পারে তা আদিকালের ইতিহাস, জ্ঞানচিন্তাকে আবিষ্কার করা জরুরি। কারণ তাতে বিশেষ ধরনের প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের উৎসগুলি খুঁজে পাওয়া যাবে। সময়ের উজানে গিয়ে অতীতমুখী হওয়ার প্রয়োজন আছে সেইসব চিন্তাকে উদ্ধার করার জন্য, যা বর্তমানের (রবীন্দ্রকালের এবং বর্তমানেরও) বিশৃঙ্খলায় পাওয়া যায় না– এমনকি সভ্যতার অগ্রসর যুগেও না। ইতিহাসপাঠটি কেমন হবে? ভুল তথ্য যাচাই-বাছাই করে নির্ভুলতা খোঁজার লক্ষ্যতাড়িত হয়ে নয়, কেননা ইতিহাস হচ্ছে উত্তম ধারণার একটি গুদামঘর, তাকে আক্রমণ করতে হবে ভালো ধারণাচিন্তাগুলি খুঁজে বের করার জন্য। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ধারণাবিদ্ধ যে তপোবন, তার প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্যকে বুঝে নিতে হবে। আমাদের সময়কার বা রবীন্দ্রকালের যেসব প্রভাবশালী ধারণা (যেমন জাতীয়তাবাদ, বণিক পুঁজির শিল্পপুঁজিতে উত্তরণ, শ্রমব্যবস্থা ইত্যাদি) আর প্রতিষ্ঠানগুলিকে (রাষ্ট্র, স্কুল ইত্যাদি) আরও যোগ্যভাবে দেখার সময় সেগুলিকে প্রশ্ন করার জন্যও তাদের ইতিহাস আর বিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এখানেই আরেকটি কথা ওঠে; যা তুলেছেন ফুকো; যে এভাবেই আমরা বর্তমানকে কোন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হব, বুঝে নেব সমকালীন প্রগতিকেও। ‘নববর্ষ’ প্রবন্ধটিই শুধু নয়, ‘ভারতবর্ষ’ গ্রন্থের সকল লেখাতেই রবীন্দ্রনাথ যে প্রিমিটিভ তপোবনাদর্শকে বারংবার ডিসকোর্স করে তোলেন তা কি প্রিমিটিভ পর্যায়েই সীমাবদ্ধ বা নিঃশেষ হয়ে গেছে? নাকি একটি যুগের বিশেষ প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের উৎস হিসাবে টিকে আছে? পূর্ববাংলার আঞ্চলিক অস্তিত্বরূপ যেমন অবলোকিত হয়েছে সেই দৃষ্টিতে যা আগে কখনও হয়নি/কেউ দেখেনি– যেটা হচ্ছে gaze, তেমনি শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথের পুনরুদ্ধার প্রকল্প, যা বর্তমানে অন্যান্য সামাজিক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠনে উপেক্ষিত। অতএব, এটি একটি ইতিহাসের অন্ধবিন্দু– blind spot, এ যেন অন্ধবিন্দুটিকে পাল্টা ভারসাম্য করে তোলা। দার্শনিকের মতে, স্মৃতির মধ্যেও থাকে কিছুটা হলেও প্রজ্ঞা। ‘নববর্ষ’ প্রবন্ধটি স্মৃতি ও বর্তমানের প্রজ্ঞালালিত অভিজ্ঞানের রাবীন্দ্রিক ব্যাখ্যা।
রচনাটির শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ পুঁজিবাদী সভ্যতার কর্মব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। একজন জমিদার– সামন্ত প্রভু, কিন্তু উদার মানবতাবাদী চিন্তায় ও ঐতিহাসিকতায় তিনি একজন বুর্জোয়াও বটে– অবশ্য কলোনিয়াল বুর্জোয়া যাঁর অভিপ্রায় বিশ্বজাগতিকতায় উত্তরণ এবং উপনিবেশ-বিরোধিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিপরীতে অবস্থান নিতে সচেষ্ট। তাঁর এই ইতিহাসধারণায় বিশেষ ধরনের আত্মঅনুধাবনই মূল শক্তি, যেটি সব ইতিহাস বাস্তবতারও অনুধাবন। হেগেল-কথিত এটি কাজ করে ডায়ালেকটিক– দ্বান্দ্বিকভাবে। রবীন্দ্রনাথে এই আত্মঅনুধাবন একটি সুধীর প্রজ্ঞার জাগরণ ঘটায়। মানব ইতিহাসের এই মূল সত্যটি তিনি বুঝে নেন কীভাবে?
কেবলই সিস্টেম বা উপনিবেশ বা পুঁজিবাদ বিরোধিতায়? নাকি অন্য দৃষ্টিকোণে। শিল্পকারখানা আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান-আবদ্ধ যে শ্রমদাসত্ব ও সময়বাঁধা ঊর্ধ্বশ্বাস প্রগতিচাঞ্চল্যে আবর্তিত মানুষজন তা রবীন্দ্রমতে গৌরব নয়, নয় প্রগতিও।
রবীন্দ্রনাথ চীনে আফিম ব্যবসা, আফ্রিকার অরণ্যসমাচ্ছন্ন কৃষ্ণত্ব ও তার সভ্যতাকে বিদীর্ণ করার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন। বিপরীতে শান্তিনিকেতনের আশ্রমে নির্জন প্রকৃতির মধ্যে স্তব্ধতায় ধ্যান করে অন্তরের কানে শোনেন জগতের সেই আদর্শ, যা নির্দেশ করে– করাটাই নয়, আদর্শ হচ্ছে হওয়াটা। প্রকৃতিতে বিরামহীন কর্মক্রিয়া চলমান কিন্তু তা হওয়ার মধ্যে আপনাকে প্রকাশ করে নিভৃতে, অব্যাহতভাবে। এই নিখিল প্রকৃতি যেন সেই গৃহিণী, যিনি ঘূর্ণমান চক্রকে গোপন করে চলাকে নয়, স্থিতিকেই ধারণ করে আছেন।
এই গতি অথচ প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে যা স্থিতি– হওয়াটাই যার সার্থকতা সেটাই ভারতবর্ষের সেই বৈশিষ্ট্য যা ‘কর্মের চতুর্দিকে অবকাশ, এই চাঞ্চল্যকে ধ্রুবশক্তির দ্বারা মণ্ডিত করিয়া রাখা, প্রকৃতির চিরনবীনতার ইহাই রহস্য। কেবল নবীনতা নয়, ইহাই তাহার বল।’ এই সিদ্ধান্তকে কি বলা যাবে কৃষিজ ভূমির মালিক সামন্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা? নাকি এই ভাবনা আদর্শিকই শুধু নয়, নির্বিঘ্ন প্রকৃতি-পরিবেশ ব্যবস্থারও বাস্তব দর্শন? যার দৃষ্টান্ত আহরণ করা হচ্ছে ভারতের তপোবনের ঐতিহ্য থেকে? অথবা এই ভাবাদর্শই সেই ইকোফেমিনিজম যা রবীন্দ্রনাথের ‘পলাতকা’, ‘বনবাণী কাব্য’, ‘রক্তকরবী-মুক্তধারা’ নাটকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত? কিংবা ‘ছিন্নপত্রে’ যা ছিল প্রাকৃতিক বৈশ্বিকতা, ‘ভারতবর্ষ’-এ সেটাই কি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যিক প্রকৃতিময়তা? শুধু তপোবন বা প্রকৃতিই একমাত্র নয়, সেখানে জুড়ে আছে ধর্মাচার-প্রথা-সংস্কার, নারীর অধস্তন অবস্থা ও অবস্থান ইত্যাদি। প্রশ্ন জাগে রবীন্দ্রনাথের এই সময়কার আচার প্রথা ও নারীভাবনা নিয়েও। তিনি বলেন:
পূর্বে ভারতবর্ষের কার্যপ্রণালি অতি সহজ-সরল, অতি প্রশান্ত, অথচ অত্যন্ত দৃঢ় ছিল। তাহাতে আড়ম্বরমাত্রেরই অভাব ছিল, তাহাতে শক্তির অনাবশ্যক অপব্যয় ছিল না, সতী স্ত্রী অনায়াসেই স্বামীর চিতায় আরোহণ করিত, সৈনিক সিপাহী অকাতরেই চানা চিবাইয়া লড়াই করিতে যাইত। আচাররক্ষার জন্য সকল অসুবিধা বহন করা, সমাজরক্ষার জন্য চূড়ান্ত দুঃখভোগ করা এবং ধর্মরক্ষার জন্য প্রাণবিসর্জন করা তখন অত্যন্ত সহজ ছিল। নিস্তব্ধতার এই ভীষণ শক্তি ভারতবর্ষের মধ্যে এখনো সঞ্চিত হইয়া আছে। (তদেব, পৃ. ৩৬৮)
তিনি যাকে বলছেন সহজ, স্বাভাবিক ও নিশ্চিন্ত প্রাণবিসর্জন তা কতটা ছিল বাধ্যতা আর কতখানিইবা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, তা বলা মুশকিল। আমরা এইসব কঠোর প্রথাসংস্কারকে অমানবিকই মনে করি তা যতই ‘ভীষণ শক্তির নিস্তব্ধতা’ হোক না কেন। রবীন্দ্রনাথ যখন গদ্যে নিজের চিন্তাদর্শ প্রকাশ করেন তখন তাতে এমন যুক্তি ও নান্দনিক শব্দশক্তি ব্যবহার করেন, যা পাঠককে কিছুটা হলেও মোহগ্রস্ত করে ফেলে। এটাই ভিটগেনস্টাইনের যোগাযোগতত্ত্বের সর্বোত্তম ব্যবহার, ভাষাকে রেখাচিত্র-উপমা দিয়ে নিজের ধর্মবোধ, নৈতিকতা কিংবা ভাবাদর্শ– যেটাই বলা হোক, সেটিকে দৃশ্যছবি হিসেবে বিনির্মাণ করেন রবীন্দ্রনাথ। এবং এভাবেই তাঁর ‘চিরকালীনতা’/‘নিত্যতা’ সারসত্তা (essence) হয়ে ওঠে।
২.
উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি ও শিক্ষার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের আয়ুধ হচ্ছে অতীত ভারতবর্ষীয় শান্তি, উদার গাম্ভীর্য ও কাঠিন্য যাতে নিহিত ছিল সংযম, বিশ্বাস, ধ্যান ও মৃত্যুভয়হীন আত্মসমাহিত শক্তি, আর এসবই তিনি খুঁজে পান ব্রাহ্মণ বর্গের মধ্যে, তপোবনাশ্রয়ী মুনিঋষিদের মধ্যে:
তাহা বলিষ্ঠ-ভীষণ, তাহা দারুণ সহিষ্ণু, উপবাসব্রতধারী– তাহার কৃশপঞ্জবের অভ্যন্তরে প্রাচীন তপোবনের অমৃত অশোক অভয় হোমাগ্নি এখনো জ্বলিতেছে, আর আজিকার দিনের বহু আড়ম্বর, আস্ফালন, করতালি, মিথ্যাবাক্য, যাহা আমাদের স্বরচিত, যাহাকে সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে আমরা একমাত্র সত্য একমাত্র বৃহৎ বলিয়া মনে করিতেছি; যাহা মুখর, যাহা চঞ্চল, যাহা উদ্বেলিত পশ্চিমসমুদ্রের উদ্গীর্ণ ফেনরাশি– তাহা যদি কখনো ঝড় আসে, দশদিকে উড়িয়া অদৃশ্য হইয়া যাইবে। তখন দেখিব, ঐ অবিচলিত শক্তি সন্ন্যাসীর দীপ্তচক্ষু দুর্যোগের মধ্যে জ্বলিতেছে, তাহার পিঙ্গল জটাজুট ঝঞ্ঝার মধ্যে কম্পিত হইতেছে– যখন ঝড়ের গর্জনে অতিবিশুদ্ধ উচ্চারণের ইংরাজি বক্তৃতা আর শুনা যাইবে না তখন ঐ সন্ন্যাসীর কঠিন দক্ষিণবাহুর লৌহবলয়ের সঙ্গে তাহার লৌহদণ্ডের ঘর্ষণঝংকার সমস্ত মেঘমন্দ্রের উপরে শব্দিত হইয়া উঠিবে। এই সঙ্গহীন নিভৃতবাসী ভারতবর্ষকে আমরা জানিব... (তদেব, পৃ. ৩৬৯)
রবীন্দ্রকালের ভারতবর্ষ যে-ধারণাকে প্রত্যয় রূপে স্বীকার করতে চাইছে তা কতগুলি প্রাচীন গুণের সারবস্তু। আর এই ভারতবর্ষ অনেকটাই বৈদিক, আবার আবেষ্টনীর দিক দিয়ে অরণ্যবেষ্টিত তপোবন, কখনও কখনও বঙ্গীয় প্রাকৃতিকতা। একাকিত্ব, নিভৃত তপস্যা-কাঠিন্য– ইত্যাকার বিশেষত্ব কি রাবীন্দ্রিক ভাবুকতার সারসত্তা? নাকি তাঁর স্বভাবগুণ? নাকি উপনিবেশ ব্যবস্থাদি প্রতিরোধের ডিসকোর্স? এর সবগুলিই সম্মিলিত রূপে গুচ্ছবদ্ধ হয়ে তাঁর ভারতবর্ষের ইমেজ দাঁড় করাতে চাইছে। কাজেই বলা চলে, উপনিবেশকে প্রত্যাখ্যান করেন ঐতিহাসিকতা দিয়েই– যে ইতিহাস বেদ-পুরাণ-শিল্পসাহিত্য থেকে আহরিত। তার সঙ্গে মিশিয়ে দেন ভারতবর্ষীয় সমন্বয়ধর্মকেও। চিরস্থায়ী নির্জনতা বহন করেও যুগে যুগে আগত নানা ধর্ম-শাসকশক্তি-জাতি-মানুষদের গ্রহণ করেছে, স্থানিক করে তুলেছে। এটি হচ্ছে এদেশের গ্রহীষ্ণু শক্তিরূপ– ‘গ্রীক হউক, আরব হউক, চৈন হউক, সে জঙ্গলের ন্যায় কাহাকেও আটক করে না; বনস্পতির ন্যায় নিজের তলদেশে চারিদিকে অবাধ স্থান রাখিয়া দেয়, আশ্রয় লইলে ছায়া দেয়, চলিয়া গেলে কোনো কথা বলে না।’ (তদেব, পৃ. ৩৭০)। কাজেই বহু শতাব্দীব্যাপী বিদেশি শক্তি ভারতবর্ষকে বিদীর্ণ করলেও এর নির্জনতা ও মর্মস্থানকে লুপ্ত করতে পারেনি। কিন্তু এই যে ভারতবর্ষীয় স্বভাব-প্রকৃতি একটি ‘সহজ বেষ্টনে’র ঘের, বিরোধের মধ্যেও দুর্ভেদ্য শান্তিতে শক্তিশালী তা কি ঐতিহাসিকভাবে সত্য? সংঘাত-যুদ্ধ, রাজ্যলিপ্সা, প্রতিরোধ, যুদ্ধ আর সামন্তিক ভোগবাদ, ধর্মীয় নির্যাতন ও নৃশংসতাও কি এতে বিদ্যমান ছিল না?
রবীন্দ্রভাবাদর্শে এই তত্ত্বটি জোরদার যে, সুখভোগ একলার নয়, সকলের সঙ্গে সমানভাগে ভোগ্য, কিন্তু কর্তব্যকর্ম একা মানুষের দ্বারাই সাধ্য। এখানেই তিনি চিহ্নিত করেন ইয়োরোপের বাণিজ্যপুঁজির ক্রমান্বয়ে শিল্পপুঁজিতে রূপান্তরের দিকটি। সমর্থন করেননি ‘বাণিজ্য ব্যবসায়ে প্রকাণ্ড মূলধন এক জায়গায় মস্ত করিয়া’ তোলাকে। খুবই তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখান যে, ভারতীয় তন্তুবায় তথা কুটির শিল্পগুলি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পুঁজির পুঞ্জীভূত না হওয়ার কারণে নয়, কুটির শিল্পকে যথাযথ যান্ত্রিকভাবে উন্নত না করার কারণে।
রবীন্দ্রনাথ আরেকটি সমস্যা চিহ্নিত করেন, তা হলো শিক্ষা, হিতকর্ম অর্থাৎ পরিষেবা ইত্যাদি জটিল ও দুঃসাধ্য হয়ে যায় এগুলিকে ঘিরে সম্প্রদায় সিস্টেম গড়ে ওঠে বলে। এখানে কর্মের আয়োজনযজ্ঞ বিরাট হয়ে মানুষকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আয়োজনতন্ত্রটাই লক্ষ্য হয়– মানুষ হয় উপলক্ষ্য মাত্র। য়ুরোপে বড়ো দল ছোটো দলকে পিষিয়া ফেলে, বড়ো টাকা ছোটো টাকাকে উপবাসে ক্ষীণ করিয়া আনিয়া শেষকালে বটিকার মতো চোখ বুজিয়া গ্রাস করিয়া ফেলে।...এই সকল কৃষ্ণ ধূমশ্বসিত দানবীয় কারখানাগুলার ভিতরে বাহিরে চারিদিকে মানুষগুলাকে যেভাবে তাল পাকাইয়া থাকিতে হয়, তাহাতে তাহাদের নির্জনত্বের সহজ অধিকার, একাকিত্বের আব্রুটুকু থাকে না। না থাকে স্থানের অবকাশ, না থাকে কাজের অবকাশ, না থাকে ধ্যানের অবকাশ। এইরূপে নিজের সঙ্গ নিজের কাছে অত্যন্ত অনভ্যস্ত হইয়া পড়াতে, কাজের একটু ফাঁক হইলেই মদ খাইয়া, প্রমোদে মাতিয়া, বলপূর্বক নিজের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার চেষ্টা ঘটে। নীরব থাকিবার, স্তব্ধ থাকিবার, আনন্দে থাকিবার সাধ্য আর কাহারো থাকে না। (তদেব, পৃ. ৩৭২)
এই ডিসকোর্সের সঙ্গে মিলে যায় মার্কসের বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব তথা এলিনিয়েশন-তাৎপর্য। শ্রমজীবীর শ্রম থেকে উৎপাদিত বস্তুর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা যেমন ঘটে তেমনি নিজ মানবসত্তার সঙ্গেও ঘটে অনন্বয়, আবার ভোগী ব্যক্তিরাও যারা উন্মত্ত ভোগ-বিনোদনে প্রমোদচক্রে অতিব্যস্ত তাদেরও আত্মসাক্ষাৎকার ঘটে না, তারাও নির্জনতাহীনতায় ধ্বস্ত হতে থাকে। তাই ভারতবর্ষীয় আদর্শ হলো ভোগে-কর্মে-ধ্যানে প্রত্যেকের মনুষ্যত্ব চর্চার অবকাশ তৈরি করে রাখা। ধ্যানময়তাই হোক, আর শিল্পসাহিত্যচর্চাই হোক, মানুষকে অবকাশের মধ্যে থাকতে হয়। রবীন্দ্রমতে এটাই ব্রত হওয়া বাঞ্ছনীয় যা মানুষের আত্মবল– নিজের ভিতর থেকেই যা উৎসারিত। ফলে বাইরের আঘাত বিপর্যয় এলেও এই আত্মবলই তাকে রক্ষা করে। এই আত্মবলকে আবিষ্কারের জন্যই রবীন্দ্রনাথ ‘নববর্ষ’ রচনাটিতে মানুষের নিত্যতার সূত্র দাঁড় করান ইতিহাস-পুরাণের আলোকে। ঐতিহাসিকতা তাই হয়ে ওঠে চিরকালীনতা, নিত্যতা। তাই রবীন্দ্রনাথ একভাবে বর্ণশ্রেণিবৈষম্যকেও ইতিবাচক রূপে দেখেন– প্রাচীন ভারতবর্ষের আলোকে। নারীর গৃহকর্ম করার বাধ্যতাকে দেখেন গৌরব ও কর্মের প্রতি ভালোবাসারূপে। মনে হয়, ‘চিত্রা কাব্যে’র ‘ব্রাহ্মণ’ কবিতায় ব্যক্ত জারজপুত্র সত্যকামকে বুকে টেনে নেয়ার পুরাণ-কথাই কবিকে দৃষ্টান্ত জোগায়। সামাজিক বন্ধুতাই বর্ণবৈষম্যের প্রতিষেধক, নারীর গৃহকর্মের নিপুণতাই তাকে অসামান্য করে তোলে; তাতে বৈরতা থাকে না, থাকে শ্রীমণ্ডিত শোভা। তাই যদি হয়, তাহলে লোকস্থিতি রক্ষা করাই কি ভারতবর্ষীয় লক্ষ্য? ইয়োরোপে সব বস্তুতে, সবার সবকিছু হওয়ার স্বাধিকার আছে– এই গৌরবময় ধারণার বিপরীতে তাঁর আত্মরক্ষার বর্ম হয়ে ওঠে এই অর্থ– ‘সকলের সব হইবার অধিকার নাই।’ প্রত্যেকের নির্দিষ্ট প্রতিভা ও কর্ম আলাদা, বসবাসও পৃথক, আর তাতেই বৈচিত্র্য। প্রতিভা সমান নয়, সকলে সবকিছু হতে পারে না, এটা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বটে। কিন্তু সমাজসৃষ্ট বৈষম্য তো প্রাকৃতিক নয়, তা সভ্যতার কাঠামো, যেমনটি প্রাচীন বর্ণপ্রথাও একটা বিধিবদ্ধ কাঠামো। সমতার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ এই রচনা লেখার সময়ে অন্তত সাম্যবাদী নন, যতটা ধনতন্ত্র বিরোধী ততটাই প্রাচীন সামন্তিক ধারণাপুষ্ট। তাঁর মতে– সন্তোষ, সংযম, শান্তি, ক্ষমা, এ-সমস্তই উচ্চতর সভ্যতার অঙ্গ। ইহাতে প্রতিযোগিতা-চকমকির ঠোকাঠুকি শব্দ ও স্ফুলিঙ্গবর্ষণ নাই, কিন্তু হীরকের স্নিগ্ধ নিঃশব্দ জ্যোতি আছে। সেই শব্দ ও স্ফুলিঙ্গকে এই ধ্রুবজ্যোতির চেয়ে মূল্যবান মনে করা বর্বরতা মাত্র। য়ুরোপীয় সভ্যতার বিদ্যালয় হইতেও যদি সে বর্বরতা প্রসূত হয়, তবু তাহা বর্বরতা। (তদেব, পৃ. ৩৭৫)
ভারতবর্ষীয় এই একাকিত্ব সাথে নিয়ে অবিরত প্রতিযোগিতার নিবিড় সংকর্ষ ও ঈর্ষাকালিমা থেকে মুক্ত হয়ে অবিচলিত মর্যাদায় পরিবেষ্টিত থাকাই লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই ইয়োরোপের কর্মবাসনা, জনসংঘের জিগীষা-উত্তেজনার বিপরীতে ভারতের ব্রহ্মবাসনাই ভয়হীন শোকহীন মৃত্যুহীন পরম কামনা বলে তিনি গণ্য করেন। এই ব্রহ্ম বলতে আমরা বুঝব আত্মবলের সম্প্রসারণ, শান্ততা, স্থিরতা ও অনুধ্যান। ইয়োরোপীয় ফ্রিডম আত্মমুক্তির প্রশ্নে অসম্পূর্ণ, অযথার্থ তো বটেই। আত্মমুক্তির সাধনা প্রত্যেক ব্যক্তির চেতনায় পরিস্রুত হয়ে বৃহত্তর গোষ্ঠীর মধ্যে স্বাধীনসত্তা হয়ে উঠবে। যে ‘পুরাতনের মধ্যে’ প্রবেশ করে রবীন্দ্রনাথ আত্মমুক্তি ও সমষ্টির স্বাধীনতার এরকম ভাবাদর্শ দাঁড় করান তাতে কতটুকু আছে চিরনবীনতা? কতটুকু আছে এর কার্যকারিতা? এসব প্রশ্নও ওঠে পাঠক চেতনায়।
তবে এটুকু বলা যায়, ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে যে স্বাদেশিকতার উদ্বোধন ঘটে তার প্রেরণায়ও শক্তি সঞ্চয়ের জন্য অতীতগামিতা ও শিকড়ে প্রবেশের বাস্তবতা সক্রিয় ছিল। ইতিহাস সদা বিবর্তমান ও পরস্পরিত, শাসনশোষণের সঙ্গে জনপুঞ্জের অবিরাম সংকটে-মিলনের এক দ্বন্দ্বসমাস এবং মানুষ বস্তুপৃথিবীকে রূপান্তরের জন্য জ্ঞানমনন-বিজ্ঞানের পরিচর্যায় ক্রমাগত অগ্রসরণ। এই গতিকে রোধ করা যাবে না, কিন্তু মানুষই যেহেতু শ্রমেঘামে-চৈতন্যমনন দিয়ে ইতিহাস বিনির্মাণ করে তাই তাকে সামনের দিকে পা ফেলতে হলে একটি পা থামিয়ে রাখতে হয়, তাকাতে হয় অতীতকালে পিতামহদের প্রজ্ঞার দিকে, আহরণ করতে হয় তাদের অভিজ্ঞানগুলিকে, আত্তীকরণ করতে হয় নিহিত সদ্গুণের তাৎপর্যকে– যেসবের ব্যাখ্যা দেন দার্শনিক হেগেল তাঁর অভিব্যক্তিবাদী দ্বান্দ্বিক ইতিহাস-দর্শনে। রবীন্দ্রদর্শন তারই প্রতিধ্বনি নয়, তবে খানিকটা মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর নয়। রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিকতায় নিত্যতার সন্ধান যতই ভাববাদ হোক না কেন, হোক না তা কবিত্বময় আবেগলগ্ন, আমরা তাতে দেখি সেটি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসেরই দ্বান্দ্বিকতায়– থিসিসের কিছু ইতিবাচক অংশ যেমন অ্যান্টিসিসিসের মধ্য দিয়ে সিনথিসিসে ঘনীভূত হয়ে যায়। আমরা এরপর তাকাব তাঁর ভারতবর্ষের ইতিহাস সম্পর্কিত ধ্যানধারণার দিকে। ধ্যানধারণা বলছি এই অর্থে যে এই ইতিহাসচিন্তা তথাকথিত সন তারিখ শাসক ব্যক্তিবর্গের কীর্তিগাথা নয়। তা হবে নিত্যতার আবিষ্কারকেই তথ্যপূর্ণ করে তোলায় ঐকান্তিক– এই ধারণায়।
- বিষয় :
- গল্প
