কানাডীয় ও বাংলা কবিতার টরন্টো
সৈয়দ ইকবাল
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
টরন্টো ডাউনটাউনের মধ্যিখানে শত বছরী গম্বুজওয়ালা ইটরঙের বাড়িটি দেখলেই যেন বোঝা যায় এটি কানাডিয়ান মিউজিক সেন্টার। এখানেই গত ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় কানাডার স্বনামধন্য কবি সাবেক পার্লামেন্টারিয়ান কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক ও স্বনামধন্য লেখক, গবেষক ও কবি সুব্রত কুমার দাস আয়োজন করেছিলেন অনুষ্ঠান “ফাইভ পোয়েটস ব্রেকিং ইনটু সং-২২, অ্যাংলো-বাংলা ক্যানাডিয়ান ক্যান্টিক্যালস”।
শনিবারের বৃষ্টিভেজা দিন বাসায় গরম কফির সাথে দারুণ সিনেমা ছেড়ে বাইরে বেরুতে ইচ্ছা করছিল না। তবে সুব্রতর ডাকে যেতেই হবে। কবি রোখসানা বেগম সদ্য নতুন হোন্ডা সিআরভি কিনেছেন। কল করে বললেন– ইকবাল ভাই আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাই! আহা এমনই তো চাই। গাড়ি চালাতে ইচ্ছে করছিল না এই বৃষ্টিদিনে। দুই ভাষার কাব্যমিলন জমজমাট তো হবেই! বাড়তি ছিল ইংরেজি কবিতার বাংলা অনুবাদ পাঠ। পাঁচ কবির পঠিত একটি কবিতার করা হয়েছে গান। কবিরা ছিলেন জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, লুইস বার্নিক হল্ফ, জিওভানা রিক্কো, সুব্রত কুমার দাস ও আয়েশা চ্যাটার্জি। লুইস ছাড়া সবাই উপস্থিত ছিলেন। সুব্রত লেখক গবেষক জানতাম, এমন ভালো কবিতাও লেখেন তা এবার জানা হলো। পিতার বিয়োগ আর নিজের হার্ট অ্যাটাক নিয়ে লেখা কবিতাটি শুনলেই শুধু সুব্রতর নয়, প্রত্যেক শ্রোতার ছেড়ে চলে যাওয়া পিতার জন্য চোখ টলমল করে উঠবে।
জর্জ সাহেবের বেশ বয়স হয়েছে, তবে এনার্জিতে তিনি ভরপুর। উপস্থাপনায় তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তীব্র বলিষ্ঠ উচ্চারণ আর গমগমে হাসিতে জমিয়ে রাখলেন শ্রোতাদের। সুব্রত নিজেই তার কবিতার অনুবাদ করেছেন। বাকি তিনজনের ইংরেজি কবিতা দারুণ অনুবাদ ও পাঠ করেন তাসমিনা খান। দীর্ঘকাল থেকে কবি আয়েশা চ্যাটার্জির নাম শুনে আসছি! এই অনুষ্ঠানে সামনাসামনি তাকে দেখলাম। এই বয়সেও তিনি যেমন একজন সুন্দরী, তেমনি তার কবিতা মসৃণ স্নিগ্ধভাবে শ্রোতার অন্তরে মিশে মগজে ঢেউ খেলে যায়। ইতালি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান কবি জিওভানা রিক্কো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজেই পাঠ করলেন তার কবিতা। সেই শৈশবে ইতালি ছেড়ে নতুন দেশ কানাডায় আসা। তখনকার কারখানায় কাজ করতে মাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া। এসব কষ্টের পরতে-পরতে মাখামাখি হয়েই তাদের আজকের সুন্দর এই বর্তমান গড়ে উঠেছে। আজ আমি এই সুন্দর মানবিক দেশ কানাডায় উচ্চ শিক্ষিত হয়েছি। কবিতায় নিজের জীবনের সুখদুঃখ মেলে ধরতে পারছি। নিজের জীবনকে সম্মানিত করছি। জিওভানার কবিতাটি ইংরেজি থেকে বাংলায় তাসমিনা খান অনুবাদ ও মঞ্চে পাঠ করেন।
এরপর আচমকা উপস্থাপনা ছেড়ে সামনের সারির চেয়ারে এসে বসে পড়লেন কবি জর্জ। মঞ্চে উপস্থাপকের দায়িত্ব নিলেন সুব্রত কুমার দাস। উপস্থাপনা তাঁর সহজাত ব্যাপার, প্রায় করেন! তবে তিনি চমকে দিলেন অভিনয় করে হুবহু জর্জ এলিয়ট ক্লার্কের হাই ভলিউম কণ্ঠ আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নকল করে। মঞ্চে কবিতা পাঠ করতে ডাকলেন জর্জকে। আগামীতে সুব্রতর অভিনয় প্রতিভাও মঞ্চে দেখার অপেক্ষায় রইলাম। স্বনামধন্য জর্জ এলিয়ট ক্লার্কের কবিতার বাংলায় অনুবাদ করেছেন ফারজানা নাজ শম্পা। তাকেও দুই দণ্ডের জন্য মঞ্চে ডেকে দুই-চার শব্দে তাসমিনা খানের মতোই পরিচয় করিয়ে দিলে ভালোই হতো।
প্রত্যেক কবির পঠিত একটি করে কবিতা সুর কম্পোজ করে গানে রূপান্তর করেছেন পল্লবী বড়ুয়া ও জেমস রল্ফ। কিছুটা একঘেয়ে তবে বেশিটা শ্রুতিমধুর। কবিতা থেকে রূপান্তর গানগুলো ছিল বেশ লম্বা, শেষ হতে হতেও শেষ হয় না। গায়কের তাল-লয় ধরে রাখা এক কঠিন ব্যাপার গায়কের জন্য। অথচ পিতাপুত্রী সুমিত বড়ুয়া ও কিশোরী শ্রেয়া বড়ুয়া দারুণভাবে নিজেদের ঠিকঠাক রেখে গান করেছেন। পিতা কোনো দীর্ঘ গানের শেষদিকে কিছু এদিক-ওদিক হলেও শ্রেয়া একশতে একশ দশ! তার গায়কি উচ্চারণ ভাবশব্দের সাথে কণ্ঠের ইমোশন টেনে আনা এককথায় অপূর্ব। আমার দীর্ঘ যুগ আগে দেখা জিটিভিতে সারেগামা গানযুদ্ধে বিজয়ী কিশোরী শ্রেয়া ঘোষালের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বড়ুয়া বিশ্বে দুই জায়গায় উৎপন্ন হন চট্টগ্রাম ও আসাম। এই পিতাপুত্রী চট্টগ্রামের হলে গর্বের ব্যাপার। প্রতিটি গানের সাথে পিয়ানো ও গিটারে সংগত দিয়েছেন টমসন হন।
সুব্রত আমার প্রিয়জন। ২০১৯-এ সিডার রিজড বিশাল গ্যালারিতে আমার ১৮তম একক ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত উপস্থাপক দূর ওকভিল থেকে আসার পথে ট্রাফিকে আটকে পড়ায় সুব্রত এগিয়ে এসে কী চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। বাড়তি পেয়েছিলাম সেই উদ্বোধন অনুষ্ঠান ও পেইন্টিং এক-একটি ধরে বিশ্লেষণসহ এক ঘণ্টার ভিডিও, টরন্টোর জনপ্রিয় টিভি এনআরভিতে সুব্রতের শো ‘কানাডা জার্নালে’।
কানাডার মূল স্রোতের সঙ্গে নিজেদের বাংলা স্রোতকে মেলানো সুব্রত কুমার দাসের উদ্যোগগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগে। ধন্যবাদ সুব্রত ও শ্রদ্ধাবর কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক ইংরেজি-বাংলা মেলবন্ধনের এমন চমৎকার অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য।
- বিষয় :
- গল্প
