ভেরোনিকা এক শ্বেতপদ্ম
অলংকরণ :: তন্ময় শেখ
জাকিয়া শিমু
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভেরোনিকা আমার পড়শি। লিলি নামে ওর একটি চমৎকার মেয়ে আছে। আমরা দেয়াল ঘেঁষে বাস করলেও আমাদের মাঝে তেমন কোনো আলাপ হয় না।
আমি অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ। প্রতিবেশী কারও সাথে পারতপক্ষে দেখা হয়ে গেলে খুব দ্বিধায় পড়ে যাই। মুখে আলগা হাসি এঁটে অভিবাদনের কাজটি শেষে বাড়তি আলাপের সুযোগ রাখি না। দিনের ব্যস্ততা সেরে অবসর সময়টা একা কাটাতে পছন্দ করি। আমার এক কামরার বাসা-লাগোয়া পশ্চিমমুখী বাদুড়ঝোলা একটি ব্যালকনি আছে। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সম্মুখে একটি পরিষ্কার জলের হ্রদ চোখে পড়ে। হ্রদের ওপর নানা পদের পাখি ভেসে বেড়ায়। হ্রদের ওপারে ক্ষিতিজছোঁয়া ধু-ধু প্রান্তর। বিকেলবেলায় আমি কফি হাতে ব্যালকনিতে বসে ওসব দৃশ্যে চোখ রেখে সারাদিনের অবসাদ দূর করি।
এ সময় লিলি ওদের ব্যালকনির দোলনায় বসে একমনে বই পড়ে। মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবে মেয়েটি। এ যুগের বাচ্চাদের হাতে সাধারণত বই দেখা যায় না। কিন্তু লিলি যুগবিচ্ছিন্ন মেয়ে, ব্যতিক্রম। আমাকে ব্যালকনিতে দেখলে সে প্রায়ই হাসিমুখে এগিয়ে আসে। আমরা প্রায়ই টুকটাক গল্প করি। মেয়েটি বড় নিঃসঙ্গ। স্কুল শেষে হেঁটে বাসায় ফেরে। মা কাজ শেষে রাত করে বাড়ি আসে। এ বয়সী বাচ্চাদের এ দেশে একা ঘরে রাখার নিয়ম নেই। তারপরও মেয়েটি একা থাকছে। বুঝতে পারি বাবাহীন সংসারে মায়ের অবিরাম সংগ্রাম চলছে। আমাকে ব্যালকনিতে দেখলে ওর চোখমুখ উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সারাদিনের জমে থাকা কথার ঝুড়ি এ সুযোগে খুলে বসে। পাশাপাশি বাসা হওয়ায় দু’বাসার ব্যালকনি গ্রিলের দেয়াল দিয়ে পৃথক করা। লিলি গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আমার সাথে গল্প করে। ওর যত রাজ্যের গল্প তা ওই আকাশে ভেসে বেড়ানো গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে। আমি গ্রিলের এপাশে বসে মুগ্ধ হয়ে ওর কথা শুনি।
একদিন ব্যালকনিতে বসে আছি। ভেরোনিকা আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে। আমিও এর জবাব দিয়ে প্রায় ডুবে যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকি। অনেকক্ষণ পর টের পাই সে গ্রিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ঘুরে তাকাতে সে আমার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলে। লিলি তার মায়ের কাছে আমাকে নিয়ে গল্প করেছে।
মায়ের কৌতূহল তাই আমাকে নিয়ে। এরপর থেকে আমাদের সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক হয় এবং আমরা বেশ স্বচ্ছন্দে কথা বলতে শুরু করি। নিদেনপক্ষে কথা যা বলার ভেরোনিকা বলে। মেয়েটি অল্পবয়সী। এ বয়সে তার দায়িত্ব অন্যের নেওয়ার কথা ছিল। অথচ সংসার চালাতে তাকে টানা আট ঘণ্টা প্রতিদিন কাজ শেষে আরও চার ঘণ্টা বাড়তি কাজ করতে যেতে হয়। তাতেও কুলানো মুশকিল। বর্তমান আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থায় মধ্যমশ্রেণির টিকে থাকা বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিন লিলির খোঁজে ভেরোনিকার ফোনে মেসেজ পাঠাই। তাকে নিয়ে প্রায়ই ছুটির বিকেলে বের হই। মেয়েকে ঘুরিয়ে আনতে ভেরোনিকা আমাকে অনুরোধ করে বলেই লিলিকে নিয়ে বের হই। আজও তাই খোঁজ করা। লিলির অপেক্ষায় ব্যালকনিতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। একসময় ভেরোনিকা ধীরপায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। তার চেহারা অসিত মলিন। তার দিকে তাকিয়ে মনে হলো রেসে হেরে যাওয়া ষাঁড় ঘাড় নিচু করে অপমানের গ্লানি লুকাচ্ছে। লেতিয়ে পড়া আকুশি গাছের মতো কোনোমতে দেহটাকে টেনে গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। তার হাত-পা কাঁপছে। চোখ দুটো ঈষৎ লাল। বুকের ভেতর থেকে জ্বলন্ত লাভার মতো বেরিয়ে আসা বেদনার পাহাড়টাকে কোনোমতে জেতেজুতে ভেতরে ঠেলে ক্লান্ত গলায় জানায়, লিলি তার বন্ধুর জন্মদিনে গেছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে গ্রিল ঘেঁষে ওর মুখোমুখি দাঁড়াই। ওর চোখ ছলছলিয়ে ওঠে। আমার দেশে ফেলে আসা ওর বয়সী বোনটির কথা মনে পড়ে। আমি হাত বাড়িয়ে ওর মাথায় হাত রাখি। ভেরোনিকা উচ্চ স্বরে কাঁদে। যেন বুকের কাছে ঠেকে থাকা কষ্টবাঁধটি আমার হাতের স্পর্শে খুলে গেছে। আমি ব্যালকনির সমুখে হ্রদ পেরিয়ে খোলা প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে থাকি। যাতে ভেরোনিকা বুকের ওপর জেঁকে বসা কষ্টপাহাড়টাকে সামলে উঠতে পারে। আমরা ব্যালকনির গ্রিলে পৃথক হয়ে আছি ঠিক কিন্তু ওর বিষণ্ণতা আমার মনকে আচ্ছন্ন করে আছে পুরোপুরি। একসময় সে নিজের মধ্যে ফেরে। তার কান্নার হেতু এখনও জানি না। আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাই। ভেরোনিকা তার জীবনের ফেলে আসা অতীতের কথা বলে...
বাবা-মা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলে খালার সংসারে আমি আশ্রয় পাই। খালা বিয়ে করেননি। আমি খালার একার সংসারে তার যত্নে বড় হতে থাকি।
আমার উঠতি বয়সে খালার সাথে অবৈধ পথে টেক্সাস হয়ে আমেরিকা আসি। খালা অবশ্য কাস্টমে ধরা পড়লে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। আমি কোনোমতে পালিয়ে এপারে ওঠে আসি। আমেরিকায় আমার আপনজন কেউ নেই। খালার দূরসম্পর্কের এক বোনের বাসায় মাস ছয়েকের জন্য পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকি। তার সাহায্যে এক মুদি দোকানে দিনের বেলায় কাজ পাই।
এর প্রায় এক বছর পর হোজের সাথে আমার পরিচয় হয়। ওর সুপারিশে একটি রেস্টুরেন্টে মোটামুটি ভালো বেতনে কাজ পেয়ে যাই। হোজে চোখে পড়ার মতো কেউ না কিন্তু ওর মনটা খুব ভালো। শুরুতে আমার দোকানে টুকটাক বাজার করতে আসত। একদিন সে নিজ গরজে আমার সাথে পরিচিত হয়। সেও আমার দেশের মানুষ। আমরা নানা বিষয়ে আলাপ করি। বিশেষ করে অভিবাসী বিভিন্ন সমস্যা, যা নিয়ে আমি তখন খুব সমস্যায় ছিলাম। অবৈধ পথে এ দেশে ঢুকেছি, বৈধ কাগজপত্র করার পথঘাট জানা নেই। এদিকে সরকার জালে ছেঁকে অবৈধদের ধরার কাজে নেমেছে। হোজের সাথে কথা বলে জানতে পারি সেও একই পথে এ দেশে ঢুকেছে এবং উকিল ধরে বৈধ কাগজপত্র করেছে। সে আমাকে এ বিষয়ে সহায়তা করার আশ্বাস দেয়। একসময় আমরা খুব কাছের বন্ধু হয়ে যাই।
হোজের ওপর নির্ভরতা এবং বন্ধুত্ব ক্রমে ভালোবাসায় এসে ভেড়ে। এরপর আমরা দুজন এক কামরার এক বাসা নিয়ে একসাথে থাকতে শুরু করি। আমাদের জীবন ক্রমেই ছায়াছবির মতো সুখময় হয়ে ওঠে। বছর না ঘুরতে আমাদের মেয়ে লিলির জন্ম হয়। আমাদের তিনজনের সংসারে প্রাচুর্য না থাকলেও সুখের কমতি থাকে না।
কিন্তু সুখ বড্ড অস্থির। আমাদের জীবনে তা বেশিদিন থাকে না। হোজে সুস্থ সবল মানুষ। রাতে ভালো মানুষ ঘুমাতে গেল। মাঝরাতে তলপেটে তীব্র ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। ডাক্তার-কবিরাজ ঘেঁটে জানা গেল ওর শরীরে মোটের ওপর একটি কিডনি এবং সেটাও পুরোপুরি বিকল হয়ে আছে। হাসপাতালে ভর্তি হলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার অবস্থা হয়ে উঠল ভয়ংকর, বেগতিক। সপ্তাহে দুদিন ডায়ালাইসিস করতে হয়। ব্যয়বহুল চিকিৎসা।
এ দেশে নিম্নবিত্তদের বিনা ব্যয়ে সরকার চিকিৎসা দিয়ে থাকে– এমন আপ্তবাক্য মার্কিন মুল্লুক সম্বন্ধে তাবৎ দুনিয়ার লোক জানে। কিন্তু হোজের চিকিৎসার সময় টের পাই আসল রহস্য। ধাপে ধাপে অন্যায় অনিয়মের ফাঁদ পাতা। ধনী-গরিব সাদাকালোর চুলচেরা হিসেবনিকেশ করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। কিডনি প্রতিস্থাপনেও অন্যান্য বিষয়ের মতো এ দেশে কড়া নিয়মনীতি রয়েছে। বয়স এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে একটি তালিকা করা হয়। সে তালিকায় হোজের নাম প্রথমদিকে থাকার কথা হলেও আমাদের মতো দৈন্যদশাগ্রস্তদের ক্ষেত্রে নিয়মের নড়চড় হয়ে যায় অলিখিত নিয়মে।
লিলির বয়স চারে গড়াল সেদিন। এমন খুশির দিনে জানা গেল হোজের দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যতীত বাঁচার বিকল্প নাই। তালিকার বিচারে কিডনি কবে পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে খুব কাছের আপনজন স্বেচ্ছায় কিডনি দিতে পারবে– এমন নিয়ম এ দেশে রয়েছে। হোজের মা-বাবা এবং ভাইবোন সবাই আছে। তারা কেউ কিডনি দিতে রাজি হয় না। এদিকে হাসপাতাল থেকে জানানো হয় দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন না হলে যে কোনো দিন তাকে হারাতে হবে। আমি পাগলের মতো চারদিকে ছোটাছুটি করি কিডনি জোগাড় করতে। আমি জানি, হোজে ছাড়া এ দুনিয়ায় আমার এবং লিলির কেউ নেই। আমি তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। ভালোবাসা হারিয়ে গেলে বেঁচে থাকা যায় না। কিন্তু হোজের আপনজন কেউ কিডনি দেওয়া দূরে থাক, ওর চিকিৎসা বিষয়ে খোঁজখবর পর্যন্ত নেয় না।
একসময় আমি সমস্ত দুশ্চিন্তা পেছনে ঠেলে নিজে কিডনি দিতে মনস্থির করি। ডাক্তারের সাথে কথা বলে আমার সমস্ত পরীক্ষা দ্রুত করিয়ে নিই। রিপোর্টে জানা যায় আমি কিডনি দিতে পারব। হোজে তখন প্রায় মরণদশায়। আমাকে দ্রুত অপারেশন টেবিলে নেওয়া হয় এবং আমার কিডনির দৌলতে হোজে ফের জীবন পায়। আমরা দুজন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসি। হোজে মৃত্যুকে জয় করে ফিরে এসেছে। এতদিনের সমস্ত ঝঞ্ঝাট ওর সুস্থতার কাছে আমার নস্যি মনে হয়। আমরা আমাদের সংসার নামক স্বর্গরাজ্যে আগের মতো অভ্যস্ত হতে শুরু করি। হোজেকে ডাক্তার মাস ছয়েক পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে বলেছে। বলেছে আমাকেও। কিন্তু সংসারের প্রয়োজনে আমি মাস শেষে কাজে যোগ দিই।
হোজে বাসায় ফিরতে ওর পরিবার এবং বন্ধুরা পালা করে ওকে দেখতে আসে। ওর এক মেয়ে বন্ধু ওর সাথে বেশ অন্তরঙ্গ অথচ যার সাথে আমার পরিচয় নেই। ওর হাসপাতালে থাকার দিনগুলোতে পরিবারের লোক এবং বন্ধুরা হাওয়া হয়ে ছিল। অবশ্য হোজের কিংবা আমার কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। লিলি স্কুলে। আমি কাজে। কাজ শেষে তিন-চার ঘণ্টা বাড়তি কাজ করি যাতে বকেয়া বিলের ভারী বোঝা মিটিয়ে দিতে পারি। হোজে মরণদশা থেকে ফিরে এসেছে এবং পরিবার বন্ধুদের সান্নিধ্যে নির্ভারে সময় কাটাচ্ছে, তাতে বরং আমি ভীষণ খুশি হই।
একদিন কাজে আমার শরীর খারাপ হয়। হোজের শরীর খারাপ হতে তাকে নিয়ে ছোটাছুটি এবং নিজের একটি কিডনি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এতসব ধকল কাটিয়ে উঠতে শরীর এক নিমেষের নিবৃত্তি পায়নি। সেদিন কুলাতে না পেরে ছুটি নিয়ে বাসায় ফিরে আসি। হোজের পিৎজা খুব পছন্দ। বাসায় ফেরার পথে তার পছন্দের টপিকে একটি পিৎজা তুলে বাসায় ফিরি। বাসায় ঢুকে আমি পাথর হয়ে যাই। বেডরুমটা খোলা ছিল। হোজে এবং তার সেই মেয়ে বন্ধুর এমন বিবস্ত্রলীলা– আমার কল্পনাতে ছিল না। আমি ওদের এমন সম্পর্ক নিতে পারি না। অচেতন হয়ে পড়ি। কতক্ষণ বেহুঁশ ছিলাম মনে নাই। চোখ খুলে নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পাই।
আমি হাসপাতাল থেকে ফিরতে হোজে আমাদের ছেড়ে তার প্রেমিকার বাসায় চলে যায়। আমাদের সাথে তার আর কোনো যোগাযোগ নেই। আমি লিলিকে নিয়ে সেই এলাকা ছেড়ে এই শহরে বাসা নিয়ে উঠি। হোজে আমাদের একা করে চলে গেছে আফসোস নেই। কিন্তু আমার কিডনিটা তার দেহে রয়ে গেছে। আমি তাকে ভালোবেসে আমার কিডনি দিয়েছি। হোজের মতো একজন প্রবঞ্চক এই উপহারটি নেবার যোগ্যতা রাখে না।
আমি সেটা ফেরত চেয়ে কোর্টে মামলা করি। কিন্তু এমন ব্যতিক্রমী মামলায় কোর্ট-কাচারিও দ্বিধায় পড়ে যায়। মামলা দীর্ঘ সময় ঝুলতে থাকে। উকিলের পেছনে আমার প্রচুর খরচা যায় যে আমার কাজের পরিমাণ দ্বিগুণ করেও কুলাতে পারি না। এতসব সত্ত্বেও আমার ভালোবাসার অপমানের কাছে তা নস্যি মনে হয়। আমি নিজেকে নিঃস্ব করে মামলা রায়ের অপেক্ষায় থাকি। আজ মামলার রায় হয়। রায়ে বলা হয়েছে–
‘স্বেচ্ছায় দান করা কিডনি ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো বিধান আইনে নেই।’
- বিষয় :
- গল্প
