ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যে যাত্রা শেষ হয় না

যে যাত্রা শেষ হয় না
×

নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু বই আছে, যেগুলো পড়া শেষ হয়; আর কিছু বই আছে, যেগুলো শেষ হওয়ার পরও ভেতরে চলতে থাকে। এগারসিন্ধুর তেমনই এক উপন্যাস—যা কেবল গল্প বলে না, বরং পাঠককে নিজের ভেতরের এক দীর্ঘ যাত্রায় নামিয়ে দেয়।
লেখক সাহিদ রেজা— যাকে আমরা মূলত একজন সফল শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবেই চিনি, এই বইয়ে যেন একেবারে ভিন্ন মানুষ। তার লেখার ভেতর কোথাও কর্পোরেটের কড়া গন্ধ নেই; বরং আছে এক পুরোনো দিনের গল্পকারের মৃদু, ধীর, অথচ গভীর স্পর্শ।
‘এগারসিন্ধুর’ কোনো প্রচলিত প্লটের উপন্যাস নয়। এখানে গল্প নদীর মতো—কখনো সরল, কখনো ভাঙা, কখনো বিস্তৃত। একটি ট্রেনযাত্রা দিয়ে শুরু হলেও, সেই যাত্রা দ্রুতই হয়ে ওঠে আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি। ডেমু ট্রেনের ব্যর্থতা, উন্নয়নের আড়ালের শূন্যতা, কিংবা প্রযুক্তির অদ্ভুত বৈপরীত্য—সবকিছুই লেখকের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে এমনভাবে, যেন আমরা নিজেরাই সেই জানালার পাশে বসে আছি।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভাষা। শব্দগুলো কেবল বাক্য গঠন করে না—দৃশ্য তৈরি করে। ট্রেন কখনো তেড়ে আসা ষাঁড়, কখনো নিঃশব্দ অজগর; আর হাওর, সে তো কেবল জল নয়, এক কূলহীন অনুভূতি। প্রকৃতি এখানে নিছক পটভূমি নয়, বরং এক জীবন্ত সঙ্গী, যার সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর ক্ষতও।
কিন্তু ‘এগারসিন্ধুর’-এর আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর ছোট ছোট মানবিক মুহূর্তে। একটি আংটির গল্প, সম্পর্কের নীরব টানাপোড়েন, বন্ধুত্বের অনাবিল উচ্ছ্বাস, এসব মিলেই উপন্যাসটিকে রক্তমাংসের করে তোলে। মনে হয়, এই গল্পগুলো কোথাও না কোথাও আমাদের নিজেদেরই।
সমাজও এখানে অনুপস্থিত নয়। টঙ্গীর বস্তি, শিল্পাঞ্চলের বৈষম্য, হাওরের দারিদ্র্য কিংবা পরিবেশের অবক্ষয়, লেখক এগুলোকে নাটকীয় করে তোলেননি; বরং এক ধরনের নীরব সহানুভূতিতে দেখিয়েছেন। সেই নীরবতাই কখনো কখনো সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ হয়ে ওঠে।
ইতিহাসের সঙ্গেও এই উপন্যাসের এক গভীর সম্পর্ক আছে। ঈসা খাঁ-র সময়, মোগল আমলের ছায়া, প্রাচীন বাণিজ্যপথ, এসব কেবল তথ্য হিসেবে আসে না; বরং বর্তমানের সঙ্গে এক অদৃশ্য সেতু তৈরি করে। ফলে পাঠক একই সঙ্গে সময়ের ভেতর ভ্রমণ করে– অতীত, বর্তমান আর অনাগত ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
তবে সবকিছুর মাঝেও কিছু জায়গায় বর্ণনার বিস্তার একটু থেমে যেতে বাধ্য করে। তথ্যের ভারে গল্পের গতি কিছুটা মন্থর হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই মন্থরতাও শেষ পর্যন্ত বিরক্তি তৈরি করে না, বরং মনে হয়, এই থামাগুলোই যেন ভাবনার জায়গা।
সবশেষে, ‘এগারসিন্ধুর’ কোনো একক গল্প নয়, এটা এক দেশ, এক সময়, আর এক জীবনের বহুস্বরিক প্রতিধ্বনি। এই বই পড়া মানে শুধু একটি কাহিনি জানা নয়; বরং নিজের ভেতরের অজানা পথগুলোকে নতুন করে চিনে নেওয়া।
বইটি শেষ করে মনে হয়, আমরা হয়তো একটি ট্রেনযাত্রা শেষ করেছি, কিন্তু আমাদের ভেতরের যাত্রা তখনও চলছে।

আরও পড়ুন

×