ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত

মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত
×

মূল : লাসলো ক্রাসনাহরকাই অনুবাদ : সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

পর্ব :: ৫

“টাকা আসলে বিশ্বাসেরই ব্যাপার– প্রশ্ন শুধু একটাই: কতজন মানুষ একই স্বপ্নে বিশ্বাস করে?”
                   অথবা
 “তুমি খেলছিলে না টাকা রোজগার করছিলে? দুটোই এখন এক হয়ে যাচ্ছে”
~

বন্ধু, দুটো বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে। প্রথমত, ব্যবসা আর বিশ্বাস হাত ধরাধরি করে চলে, প্রবণতাটা সে রকমই দেখা যাচ্ছে, বিজয়ী তখনই হবে, যখন দৃশ্যমান আর ভার্চুয়াল জগৎ এক হয়ে যাবে, কারণ আমি আমার ক্রিপ্টোকারেন্সি একটা স্বপ্নে বিনিয়োগ করেছি, এই ধরনের বিনিয়োগে টাকা তো লাগেই, সুতরাং সেটা ক্রিপ্টো টাকা হলেই-বা ক্ষতি কী? কী নামে তাতে কিছু যায় আসে না, টাকা বিশ্বাসের ব্যাপার, একটা সিদ্ধান্ত, আমি কি এতে বিশ্বাস রাখি? আমি কি এতে আস্থা রাখি? এই প্রশ্নটাই মূল,
এটা একেবারেই স্পষ্ট যে– আমরা আমাদের এই সময়েই ক্রিপ্টো জগতের জন্ম আর শৈশব প্রত্যক্ষ করছি; আমাদের সামনে একাধিক বিনিময় মাধ্যম– একটা আজকের পরিচিত মুদ্রা, আরেকটা ক্রিপ্টো মুদ্রা, আর তৃতীয়টা হবে কাজ নিজেই, আর এই তিনটি ধীরে ধীরে একে অপরের ভেতর মিশে যাবে– সেটাও শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে, বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সির উদাহরণেই তা সবচেয়ে পরিষ্কার, বিশেষ করে আমাদের দেশ ইউক্রেনে– যেখানে ক্রিপ্টোর জনপ্রিয়তা বিশ্বে শীর্ষ দশের মধ্যে অবস্থান করছে– আমরা যেন আরও তীব্রভাবে অনুভব করছি, ভবিষ্যতে পুঁজি আর “মূল্য” ক্রমেই কাজনির্ভর হয়ে উঠবে,  আর এই মডেলটি ক্রিপ্টো জগতেই ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে, ভাবো তো– যদি তুমি এমন একটি বিনিময় মাধ্যম তৈরি করতে পারো, যা সীমান্তের ঊর্ধ্বে, যা ভৌত আর ভার্চুয়াল জগৎকে একসূত্রে গেঁথে দেয়– তাহলে তুমিই হয়ে উঠবে এক প্রাথমিক ব্যাংক, তুমি কি এমন এক প্রাথমিক ব্যাংকের অংশীদার হতে চাও না? নিশ্চয়ই চাও, কারণ তুমিও তো সেই অবস্থানে থাকতে চাও, যেখানে তুমি নিজেই প্ল্যাটফর্ম, যদি তুমি এমন একটি মুদ্রা তৈরি করতে পারো, যেটাকে মানুষ সত্যি বলে বিশ্বাস করে– তাহলে মানুষ সেটাই ব্যবহার করবে, কারণ, শেষ পর্যন্ত টাকা আসলে বিশ্বাসেরই ব্যাপার, কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো– কতজন মানুষ এতে বিশ্বাস করে? অন‍্যভাবে বললে, যে স্বপ্নের জন্য এই মুদ্রার দরকার, সেই স্বপ্নে কতজন বিশ্বাস করে? কারণ, যদি যথেষ্ট মানুষ বিশ্বাস করে– তাহলে সেই প্রকল্প বাস্তব হয়ে উঠবেই, প্রযুক্তিগত সৃজনশীলতার যুগে এমন কোনো স্বপ্ন নেই, যা বাস্তবে রূপ নিতে পারে না– দেখছো তো– স্বপ্নই ক্রমশ বাস্তব হয়ে উঠছে, এটা আর ফাঁকা বুলি নয়, আগে এমন ছিল না, কখনোই না; কিন্তু এখন থেকে– এটাই সত্যি, আর এভাবেই চলবে– 
–আমরা মরব মনে হচ্ছে–অন্য পালেট থেকে বেঁচে থাকার শব্দ পেয়ে একরকম শুষ্ক হাসি মিশিয়ে আবার শুরু করল– চলো, একেবারে শুরুতে ফিরে যাই, আর আবার সেই প্রশ্নটা তুলি– টাকা আসলে কী?
টাকা হলো এক ধরনের বিনিময় মাধ্যম, মানুষ দীর্ঘদিন ছোট ছোট সম্প্রদায়ে বসবাস করেছে, আর কোনো এক সময়ে কোথাও মানুষ ঠিক করেছিল– একটা বড়, গোল পাথরের চাকা-সদৃশ বস্তুই হবে “টাকা” –  সত্যি বলতে কি– এই নোংরা, দুর্গন্ধময় গুহায় আমাদের দুজনের মধ্যে স্বীকার করাই যায়– ওটা আসলে অনেকটাই আজকের ক্রিপ্টোকারেন্সির মতোই ছিল, কারণ সেই পাথরটা কখনোই আসলে সরানো হতো না,  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো– আমরা সবাই মিলে একটি বিনিময় মাধ্যমে একমত হলাম, যা সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্য মেনে নিল, কোনো নতুন মুদ্রা চালু করা কঠিন নয়– যদি মানুষ সেটাকে গ্রহণ করে, আর বিশ্বাস করে, ইতিহাস জুড়ে অসংখ্য স্থানীয় মুদ্রার জন্ম হয়েছে, প্রশ্নটা সব সময়ই ছিল– এক ইউনিট টাকার মূল্য কত? একখানা ভেড়া? নাকি এক মাপ গম? এখান থেকেই আমরা সরাসরি ক্রিপ্টোতে পৌঁছে যেতে পারি– এবং বলতে পারি, এই মুদ্রার বৈধতা, তার যে-ই রূপ হোক না কেন, অনেকটাই সে নিজেই তৈরি করে, যেন সে নিজেই বলে– আমাকে টাকা হিসেবে ব্যবহার করতে পারো, কিন্তু প্রশ্ন হলো– কখন থেকে মানুষ তা ব্যবহার শুরু করে? উত্তরটা হলো– যখন এই ভার্চুয়াল মুদ্রা বাস্তব জগতে ঢুকে পড়তে শুরু করে, যখন প্রথম বিটকয়েন এটিএম দেখা দেয়– যেখানে নগদ টাকা দিয়ে ক্রিপ্টো কেনা যায়– যখন কোনো দোকান ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পেমেন্ট নিতে শুরু করে, তখনই ভার্চুয়াল জিনিসটা “বাস্তব” হয়ে ওঠে এবং সেখান থেকেই শুরু হয় এক অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়া, আমরা তখন পৌঁছে যাই দ্বিতীয় স্তরে– যেখানে বহু ক্ষেত্রে আমরা বিটকয়েন, ইথার, কিংবা আরও নিরাপদ কোনো রূপ–যেমন স্টেবলকয়েন– ব্যবহার করছি, অথচ আমরা নিজেই তা টের পাচ্ছি না,  ধরা যাক– আমি একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে গেলাম, ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে একটা ভ্রমণ কিনলাম, তারপর বাড়ি ফেরার আগে কোথাও বসে এক কাপ কফি খেলাম, অর্থাৎ, অনেক লেনদেনই ইতোমধ্যে ক্রিপ্টোর মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, প্রচলিত টাকার বদলে, ভার্চুয়াল মুদ্রা মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত হয়ে গেছে। তবে ধীরে ধীরে মানুষ তা বুঝতে শুরু করবে– খেয়াল করবে– এবং একসময় বলবে, “আরে, আমি তো এই ইথার, এই বিটকয়েন, কিংবা এই স্টেবলকয়েনের বিনিময়ে সবকিছুই পাচ্ছি!”
এখনও অবশ্য বিনিময় হার অনেক সময় রোলার-কোস্টারের মতো ওঠানামা করে– দালাল আর প্রতারকদের কারণে দাম দুলতে থাকে, কখনও কখনও তো দামের পতনের পর আবার আগের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, আমাদের হাতে এখন এই নতুন টাকা–ভার্চুয়াল টাকা, আমাদের স্মার্টফোনের অসংখ্য “ফ্রি” অ্যাপ– এসবও আসলে এক ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, আমরা বিনামূল্যে ব্যবহার করি ঠিকই, কিন্তু তার বদলে আমরা তাদের কিছু দিই–আমাদের মনোযোগ, আমাদের সময়, আমি আমার মনোযোগ বিক্রি করি, আর তার বিনিময়ে সেই পরিষেবাটা ব্যবহার করি, সোভিয়েত আমলে কমিউনিস্টরা এমন এক স্বপ্ন দেখেছিল– টাকা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, সবাই কাজ করবে, বিনিময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিস ভোগ করবে– কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল– কারণ ভিন্ন ভিন্ন কাজ বা আচরণের মধ্যে সমমান নির্ধারণ করার মতো কোনো সর্বজনীন মুদ্রা তখন ছিল না, আজ সেই সমমান নির্ধারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে– এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে, নিশ্চিতভাবেই থাকবে, এবার সংক্ষেপে বলি– সে নিজের পালেট থেকে একটু উঠে বসল, যেন নিশ্চিত হতে চায়, পাশের মানুষটা এখনও জেগে আছে কি না– বেশ কিছুক্ষণ ধরে সে কোনো শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাচ্ছিল না, 
“এখন ঘুমিও না,” সে বলল, কারণ এবার আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, খেয়াল করে শোনো–”
কিন্তু কোনো সাড়া এলো না– গুহার ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, বাইরে থেকেও শব্দ যেন কমে গেছে– মনে হচ্ছে ওপরের দিক থেকে গোলাবর্ষণ থেমেছে কিছুক্ষণের জন্য, হয়তো BM-21 গ্র‍্যাডগুলো সাময়িক বিরতি নিয়েছে, আর পোপসানার দিক থেকে নতুন একটি প্লাটুন আসছে, এখন শুধু ছিটেফোঁটা মর্টারের শব্দ– যা প্রায় নীরবতার মতোই শোনায়, সে আবার বলল– “ঘুমিও না, এখন নয়… যে কোনো মুহূর্তে তারা আমাদের নিতে আসবে… তার আগে হয়তো আমি শেষটা বলে ফেলতে পারি…” তার একমাত্র সচল চোখটা সঙ্গীর দিকে স্থির রেখে সে ফিসফিস করে বলল– “আমি কি চালিয়ে যেতে পারি? এটা কি ‘হ্যাঁ’? অন্তত মাথা নাড়ো… কিংবা চোখের পাতা ফেলো… থাক, যা-ই হোক, আমি বলেই  যাই,” সংক্ষেপে বলি– এটা একটা বন্ধ সিস্টেম, আমরা অনেক বেশি মানুষ, আর অসংখ্য প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলছে, একে অপরকে বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর সবকিছু একই দিকে এগোচ্ছে, আমাদের ক্রমশ দ্রুততর হতে হচ্ছে– আর যখন কাজ করছি, তখন একসঙ্গে অনেক মানুষকে মাথায় রাখতে হচ্ছে, এই কারণেই আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিখুঁত করার চেষ্টা করছি– যাতে একই সঙ্গে অনেকের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ করা যায়, আমাদের জীবন মৌলিকভাবে বদলে গেছে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক অচেনা, বিস্ময়কর অথচ হিসাবযোগ্য বিশ্বের দ্বারপ্রান্তে, এখন আর তুমি আট ঘণ্টা কাজ করতে যাও না– বরং মেট্রোতে বসে দুই মিনিটে একটা ইমেইলের উত্তর দিলে, সেটাও কাজ, বাড়ি ফিরে একটা গেম খেললে– সেখান থেকেও টাকা এলো, এখন বলো তো– তুমি খেলছিলে, না টাকা রোজগার করছিলে?” দুটো যেন এক হয়ে যাচ্ছে– 
[ক্রমশ]

আরও পড়ুন

×