ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পুলিৎজারে মানবতার জয়

পুলিৎজারে মানবতার জয়
×

ভাষান্তর তারেক মিনহাজ 

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

৪ মে অপরাহ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, নাটক ও সংগীতকলার মোট তেইশটি ক্যাটেগরিতে, সম্মানজনক পুলিৎজার পুরস্কারে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। কবিতা ও কথাসাহিত্যে বিজয়ী হন যথাক্রমে জুলিয়ানা স্পার ও ড্যানিয়েল ক্রাউন। তাঁদের দুটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার পত্রস্থ হলো। ভাষান্তর তারেক মিনহাজ 

ড্যানিয়েল ক্রাউস
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লেখক ও সাংবাদিক মেগ ওয়াকার। ২৯ জুলাই ২০২৫ সাহিত্যবিষয়ক অন্তর্জালিক মাধ্যম সাবস্ট্যাকে প্রকাশিত।
মেগ ওয়াকার: ‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’ বইটি কী নিয়ে লেখা ? বইটি কোন গভীর সত্যের কথা বলে?
ড্যানিয়েল ক্রাউস: এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পাঁচজন আমেরিকান সৈন্যের গল্প, যারা গোলন্দাজ বাহিনীর গোলার আঘাতে ভূপাতিত একটি দেবদূতের দেখা পায়। দেবদূত তাদের সবাইকে বাঁচাতে পারত, এমনকি বাঁচাতে পারত গোটা পৃথিবীও। কিন্তু দেবদূতকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার ব্যক্তিগত লালসা সৈন্যদের ভেতর বিভেদ সৃষ্টি করে। বইটি যা নিয়ে, তা হলো– কীভাবে আমরা এই পৃথিবীতে শৈল্পিক সহিংসতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, এবং এখন আমরা তা বন্ধ করতে অপারগ ও অনিচ্ছুক যতক্ষণ না সবাই ধ্বংস হচ্ছি।
lএই উপন্যাসটি মাত্র একটি নিরবচ্ছিন্ন বাক্যে লেখা। গল্পের কাঠামো তৈরিতে এমন অস্বাভাবিক পথ বেছে নিতে আপনি কেন অনুপ্রাণিত হলেন? এটি বর্ণনাভঙ্গিকে কীভাবে সাহায্য করেছে?
ll বাক্যটি আসলে একটি লুপ বা চক্রের মতো, যা আপনাকে চিরকালের জন্য বইটির ভেতরে বন্দি করে ফেলে। এই ফরম্যাটটি মূলত শিল্পায়িত যুদ্ধের সেই অপ্রতিরোধ্য চাকাটিকে অনুকরণ করে যে চাকা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘুরতে শুরু করেছিল। বাড়তি সুবিধা হলো, এটি গদ্যের গতিকে গল্পের চরিত্রগুলোর মতো রুদ্ধশ্বাস করে তোলে। যাদের থামার বা চিন্তা করার কোনো সময় নেই। একমাত্র লক্ষ্য আরও এক সেকেন্ড বেঁচে থাকা।
lএই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল আপনাকে কেন আকর্ষণ করল?
ll অন্য যুদ্ধের কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধই ছিল সেই সময় যখন যুদ্ধের প্রযুক্তি মানুষের মানবিক সত্তাকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করে। আমরা প্রথমবারের মতো মানুষকে না দেখেই তাকে হত্যা করার ক্ষমতা অর্জন করি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে পারমাণবিক যুদ্ধ, ড্রোন হামলা এবং ভবিষ্যতের এআই প্রযুক্তি আমাদের সবাইকে শেষ করে দেবে– এসবের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
l‘পাবলিশার্স উইকলি’ বলেছে যে, ‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’-এর মাধ্যমে ‘ক্রাউস যুদ্ধ-উপন্যাসে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছেন।’ এর অর্থ কী? আপনি কি সচেতনভাবেই যুদ্ধভিত্তিক কথাসাহিত্য সম্পর্কে পাঠকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন?
ll যুদ্ধ-উপন্যাসের প্যান্থিয়ন বা শ্রেষ্ঠ সংকলনের কথা মাথায় রেখে ‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’ লিখিনি। তবে আমেরিকার ইতিহাসে চমৎকার সব যুদ্ধ-উপন্যাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, তাই এই প্রশংসায় আমি আনন্দিত। কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ নিয়ে লেখার চেয়ে যুদ্ধের ‘ধারণা’ নিয়ে বেশি লিখতে চেয়েছি। যদিও শেষ পর্যন্ত দুটোই করা হয়েছে।

l‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’ পর্দায় আসার ব্যাপারে কি এখন পর্যন্ত কোনো প্রাথমিক সাড়া বা খবর আছে?
ll না, এখনও নেই!
lআপনি অবিশ্বাস্য সৃজনশীল বহুপ্রজ। প্রাপ্তবয়স্কদের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যের পাশাপাশি আপনি পুরস্কারজয়ী তরুণদের উপন্যাস লিখেছেন, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জন্য লিখেছেন। গুইলারমো ডেল তোরোর মতো মাস্টারদের সাথে কাজ করেছেন, কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ এ. রোমেরোর শুরু করা দুটি কাজ সম্পন্ন করেছেন। বৈচিত্র্য আপনার সৃজনশীল সত্তাকে কীভাবে পুষ্ট করে? 
ll বৈচিত্র্যই আমার সব কাজের জ্বালানি। আমি প্রচুর পড়ি, প্রচুর দেখি, শুনি এবং লিখি। কোনো ঘরানা বা লেখার শৈলীকেই অধরা রাখতে চাই না। আমি একই সময়ে যেসব প্রজেক্ট করি, সেগুলো একটি অন্যটি থেকে এতটাই আলাদা যে সেগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, মানসিক ক্লান্তি দূর করে। আসে একের পর এক অনুপ্রেরণা।

জুলিয়ানা স্পার
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাহিত্যিক ও সংগঠক সেডি হ্যাগল্যান্ড। ৫ অক্টোবর ২০২২ অন্তর্জালিক মাধ্যম ইউটিউবের ইউটাহ হিউম্যানিটিজি চ্যানেলে সম্প্রচারিত। 
সেডি হ্যাগল্যান্ড: কৃতজ্ঞতা। হ্যালো, আমি আজ আছি জুলিয়ানা স্পারের সাথে। তিনি ‘ইউটাহ হিউম্যানিটিজ বুক ফেস্ট’ ও ‘হিউম্যানিটিজ ইন দ্য ওয়াইল্ড’ সিরিজে যোগ দিতে আমাদের এখানে আসছেন। তিনি আমার সাথে কথা বলতে এবং কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হয়েছেন, যাতে তাঁর সফর নিয়ে আমরা আরও বেশি উৎসাহিত হতে পারি। হ্যালো, জুলিয়ানা।
জুলিয়ানা স্পার : হ্যালো।
lআমাদের শ্রোতাদের মধ্যে যারা আপনার কাজের সাথে খুব একটা পরিচিত নন, তাদের জন্য আপনার কবিতা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? 
ll হুম, নিশ্চয়ই। আমি যখন নিজের কাজকে বর্ণনা করি, তখন মজা করে প্রায়ই বলি যে– আমি হলাম মার্কিন এক্সপেরিমেন্টালিজম বা পরীক্ষামূলক ধারা এবং অ্যান্টি-কলোনিয়ালিজম উপনিবেশবাদ-বিরোধী সাহিত্যের এক অদ্ভুত সন্তান। আমি আসলে গার্ট্রুড স্টেইন এবং থেরেসা [হাক কিয়ং চা]-এর ধারা। একই সাথে কা-আলোমোকুর মতো কবিদের কথা বোঝাতে চাই। তিনি ছিলেন আঠারো শতকের শুরুর দিকের হাওয়াইয়ান কবি।
এর মাধ্যমে আমি আসলে এটাই বোঝাতে চাই যে, আমি প্রমিত ইংরেজির চেয়ে ভাষার ব্যতিক্রমী ব্যবহারকে বেশি গুরুত্ব দিই; একক সুরের চেয়ে বহুস্বরের সম্মিলনকে প্রাধান্য দিই। বলতে পারেন, আমি ‘কনফেশনালিজম’ বা স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার চেয়ে আধুনিকতাবাদের প্রতি বেশি আগ্রহী।
 lআপনার সাথে কথা বলার প্রস্তুতি হিসেবে আমি আপনার ‘রেসপন্ডিং’ কবিতাটি পড়ছিলাম। এর একটি লাইন আমাকে খুব নাড়া দিয়েছে: “কোনো বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা বলা অসম্ভব; কেবল তার সমান্তরালে বা পাশ ঘেঁষে কথা বলা সম্ভব।” আপনার কবিতাকে ‘রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়’ ও বৃহত্তর সংস্কৃতির সমসাময়িক আলাপগুলোর সাথে সরাসরি যুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। কবিতা এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার মধ্যকার সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন?
llহ্যাঁ, ওটা অনেক পুরোনো একটি লাইন। দেখে আমার বেশ মজা লাগছিল, হয়ত আমি এখন আর ওভাবে লিখতে পারব না। 
আসলে আমার মনে হয়, রাজনৈতিক সক্রিয়তার সাথে কবিতার সম্পর্কটা বেশ অদ্ভুত এবং স্ববিরোধী; এই সম্পর্ক সবসময় খুব ঘনিষ্ঠ বা পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত হয় না।
একদিকে কবিতা নিঃসন্দেহে সাহিত্যের এমন একটি মাধ্যম, যা কোনো প্রতিবাদ সমাবেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, কিংবা মানুষের হাতে ধরা কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে কবিতার লাইন লেখা থাকে। আপনি নিশ্চয়ই প্রতিবাদ মিছিলে এমিলি ডিকিনসনের লাইন বা এমন অসংখ্য উদাহরণ দেখেছেন। লোকজন সমাবেশে কবিতা পড়েও থাকে। এগুলো দেখে প্রায়ই মনে হয় যে, এই সম্পর্কটা হয়তো অনেক বেশি গভীর– আসলে বাস্তবে যা তার চেয়েও বেশি। কিন্তু একই সাথে কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে অভিজাত শিল্পমাধ্যমগুলোর একটি– যা দৈনন্দিন জীবন থেকে বেশ বিচ্ছিন্ন এবং যার পাঠকসংখ্যা সাহিত্যের অন্য যে কোনো মাধ্যমের তুলনায় সবচেয়ে কম। সত্যিই খুব কম। তাই এই স্ববিরোধিতাটা আমার কাছে সবসময়ই কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়। যখন কেউ বলে যে তাদের কবিতাই তাদের অ্যাক্টিভিজম বা সক্রিয়তা, আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারি না। আমি সাধারণত এ ব্যাপারে কিছুটা সন্দিহান। পাশাপাশি আমি এটাও মনে করি যে, জীবনসংক্রান্ত বিষয়গুলো– যেগুলোকে প্রায়ই ‘রাজনৈতিক’ তকমা দেওয়া হয়– সেগুলো কবিতায় প্রায়ই উঠে আসে। আমি সেগুলো পড়তে পছন্দ করি এবং বেশ অনুপ্রেরণাদায়কও মনে হয়।
lএবং আপনি নিজেও একজন রাজনৈতিক কর্মী। আমি আপনার ‘এনক্যাম্পমেন্ট’ বা ক্যাম্পগুলোতে কাজ করার কথা পড়ছিলাম। আপনি কেবল কবিতা লিখছিলেন না, আপনি ২০১১ সালের ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর ক্যাম্পগুলোতে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। তার মানে আপনি একই সাথে দুটি কাজই করছিলেন।
llহ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু আমার মনে হয় না যে আমি সেখানে একজন ‘কবি’ হিসেবে উপস্থিত হই। আমি আসলে সেখানে একজন সাধারণ মানুষ বা কেবল একটি ‘শরীর’ হিসেবে থাকার চেষ্টা করি। 

আরও পড়ুন

×