ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উদার মানবতাবাদী মনীষী

উদার মানবতাবাদী মনীষী
×

আনিসুজ্জামান [১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭–১৪ মে ২০২০]

খন্দকার সাখাওয়াত আলী

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২০) বাংলার অধ্যাপক ও বরেণ্য শিক্ষাবিদ। ঢাকায় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন জীবনের দীর্ঘতম সময়। একজন প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক। আনিসুজ্জামান বলতে তিনটি পরিচয়ে তিনি চোখের সামনে এসে হাজির হন। প্রথমত, একজন অভিনিবিষ্ট গবেষক, দ্বিতীয়ত, তাঁর কর্মিসত্তা ও জনবুদ্ধিজীবিতা, তৃতীয়ত, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের এক প্রাণপুরুষ। তাঁর চিন্তা ও কর্মধারায় তিনি একজন সমাজমনস্ক ও রাজনীতি সচেতন মানুষ। সামগ্রিক বিচারে আমার কাছে, তিনি উদার মানবতাবাদী এক বিদ্বজ্জন। আনিসুজ্জামান ও তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরা ভাষা-আন্দোলনের আলোকপ্রাপ্ত শক্তিশালী সৃষ্টিশীল এক উজ্জ্বল প্রজন্ম। 
ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে তারা দেশব্রতী (দেশপ্রেমিক) চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত মজবুত করেছিলেন। দেশের মূলধারার শিক্ষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির তাঁরা প্রভাবশালী প্রতিনিধি। মানুষ হিসেবে তিনি তাঁর ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী কিংবা বন্ধুবান্ধবদের ব্যাপারে ছিলেন প্রবল সংবেদনশীল। মানুষকে গভীরভাবে কাছে টানতে পারতেন। তাঁর মানসচরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিতটি গড়ে দিয়েছিল ভাষা-আন্দোলন ও কমিউনিষ্ট পার্টি। এ ব্যাপারে তাঁর আশিতম জন্মদিনে এক প্রবন্ধে লেখেন, ‘ভাষা-আন্দোলনের অল্পকাল পরে আমি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসি। সে সংযোগ বছর পাঁচেকের বেশি স্থায়ী হয়নি। তবে ওই সময়ের বামপন্থার যে শিক্ষা লাভ করেছিলাম, তা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি চিরকালের জন্য গঠন করে দিয়েছিল। ওই শিক্ষা না পেলে আমি আজকের আমি হতে পরতাম না।’ 
আনিসুজ্জামান বাংলাদেশের বিগত সাত দশকের প্রত্যক্ষদর্শী। জ্ঞানচক্ষু হবার পর থেকে সমাজপরিবর্তন আর ইতিহাসের নানা বাঁকের তিনি কুশীলব ও সাক্ষী। সেই বায়ান্ন-এর ভাষা আন্দোলন থেকে যুদ্ধাপরাধীর বিচার পর্যন্ত। জাতীয় সকল জনদাবির তিনি পাশে থেকেছেন। ঋজুভাবে কলম ধরেছেন। মানুষের দাবির পক্ষে রাস্তায় নেমেছেন। 
একুশের সংকলন [হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত] সম্পর্কে তাঁর কাল নিরবধি বইতে, তিনি লিখেছেন : ‘… হাসানের মাথায় ঘুরতে থাকলো, পরের একুশে ফেব্রুয়ারির [১৯৫৩] আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি সাহিত্য-সংকলন প্রকাশ করতে হবে। … এমন সময়ে জেলখানার ভেতর থেকে কমিউনিস্ট নেতা খোকা রায়ের চোরা-পথে পাঠানো প্রবন্ধ ‘সকল ভাষার সমান মর্যাদা’ আবদুল্লাহ আল-মুতীর কাছে পৌঁছোলো। অতি ক্ষুদ্রাক্ষরে লেখা প্রবন্ধটি আমি হাতে কপি করি। স্থির হয়, হাসানের পরিকল্পিত সংকলনে এটাই যাবে একমাত্র প্রবন্ধ হিসেবে–লেখকের নাম দেওয়া হয় আলী আশরাফ। … শামসুর রাহমানের … কলকাতার পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সদ্যপ্রকাশিত একটি কবিতা সংকলনের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন হাসান। আর সংকলিত হলো আবদুল গনি হাজারী, ফজলে লোহানী, আতাউর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ শামসুল হক ও জামালউদ্দীনের কবিতা– হাসানেরটা তো আছেই; শওকত ওসমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আতোয়ার রহমান, সিরাজুল ইসলামের গল্প এবং আমারটাও; মুর্তজা বশীর ও সালেহ আহমদের নকশা; আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, ও তোফাজ্জল হোসেনের গান এবং কবিরউদ্দিন আহমদের লেখা ঘটনাপঞ্জি। আমিনুল ইসলাম প্রচ্ছদ আঁকলেন; মুর্তজা বশীরের একটা লিনোকাট গেল মুখপাতে; পাতাপূরণের জন্যে বিজন চৌধুরী ও বশীরের কয়েকটি স্কেচ গেল – তবে বইতে বিজনের নাম যায়নি। হাসানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে আমরা দু-একজন প্রুফ দেখলাম। কিন্তু সম্পাদকীয় গোছের কিছু একটা যাওয়া দরকার। হাসান হঠাৎ ঘোষণা করলেন, তিনি আর লিখতে পারবেন না। শেষে ওই দায়িত্ব পড়লো আল-মুতীর ঘাড়ে–তিনি পরদিনই সেটা এনে দিলেন। মুখবন্ধ হিসেবে ওটাই ছাপা হলো স্বাক্ষরবিহীনভাবে।’ 
এদের বাইরে সাদেক খান (১৯৩৩-২০১৬), নিতুন কুন্ডু (১৯৩৫-২০০৬), দেবদাস চক্রবর্তী (১৯৩৩-২০০৬) সহ আরও অনেকেই, পঞ্চাশ দশকের তরুণরা আনিসুজ্জামানের ব্যক্তিগত বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। 


যদিও বয়সে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে ছোট। কিন্তু জ্ঞান, প্রজ্ঞায় আর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি সব সময় বন্ধুদের মধ্যমণি ছিলেন। 
প্রফেসর আনিসুজ্জামানের জ্ঞান আর প্রজ্ঞার ভিত্তিটা গড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে, প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের ভূমিকা রয়েছে। তিনি আনিসুজ্জামানসহ কয়েক প্রজন্মের জন্য, একজন ‘মেন্টর’-এর ভূমিকা পালন করেছেন। প্রফেসর রাজ্জাক আনিসুজ্জামানকে দেখতে চেয়েছিলেন গভীর জ্ঞানচর্চায় নিবিষ্ট একজন গবেষকের ভূমিকায়। আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের অনানুষ্ঠানিক সেই গ্রুপের সদস্যরা পরবর্তী সময়ে তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দিকপাল হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের উন্মেষে ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই গ্রুপে যেমন ছিলেন ডক্টর কামাল হোসেন (জন্ম ১৯৩৭), প্রফেসর রেহমান সোবহান (জন্ম ১৯৩৫), ডক্টর রওনক জাহান (জন্ম ১৯৪৪), ডক্টর হামিদা হোসেন (জন্ম ১৯৩৬), প্রফেসর আনিসুজ্জামান ও সিদ্দিকা জামান বেবি (বিশিষ্ট সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহাবের কন্যা ও আনিসুজ্জামানের স্ত্রী)। তেমনি ছিলেন সরদার ফজলুল করিম (১৯২৫-২০১৪) ও বদরুদ্দীন উমর (১৯৩১-২০২৫) প্রমুখ। আর আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১), পরের প্রজন্মের। ভিন্ন মতাদর্শের সবার জন্য, তাঁর ঘরের দরজা সব সময় খোলা ছিল। 
প্রফেসর আনিসুজ্জামানের তিরাশিতম বছরের জীবনকে চার কালপর্বে মেলে ধরা যাক। যা তাঁর জীবনের বিকাশধারার একটি সংক্ষিপ্ত রেখাচিত্র। যা তাঁর যাপিত জীবনের আনন্দধারাকে তুলে ধরে। সারাংশ করলে তাঁর ভাষায় দাঁড়ায় ‘জীবনে আমার কোনো খেদ নেই।’
প্রথম পর্ব (১৯৩৭-১৯৭১): যা ছিল নিজেকে গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতি ও আত্মপরিচয় খোঁজার পর্ব। ১৯৪৯ সালে তারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় আসেন। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশনের পর আইএ পড়েন জগন্নাথ কলেজে। শুধু বাংলায় পড়বেন বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে ১৯৫৬ সালে বি.এ. (অনার্স) এবং ১৯৫৭ সালে এম.এ. করেন। শিক্ষকরা তাঁর জ্ঞানচর্চার সড়কটি তৈরি করে দেন। শিক্ষকদের কাছে ঋণস্বীকার করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘জগন্নাথ কলেজে অজিতকুমার গুহ ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর কাছ থেকে প্রথম পেয়েছিলাম রবীন্দ্র-সাহিত্যের শৃঙ্খলাবদ্ধ পাঠ। নারায়ণচন্দ্র সাহা জাগিয়েছিলেন ইতিহাসে আগ্রহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর স্নেহ ও উৎসাহ পেয়েছি। মুহাম্মদ আবদুল হাই দিয়েছিলেন গবেষণা প্রবর্তনা। মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যরুচি ও জীবনবোধ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যাঁর শ্রেণিকক্ষের ছাত্র না হয়েও তাঁর অফুরন্ত জ্ঞানভান্ডারের অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ হয়েছি, তিনি আব্দুর রাজ্জাক।’ ছাত্রাবস্থায় যুবলীগ দিয়ে শুরু করে, পরবর্তীকালে তিনি সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, কখনও কর্মী ও কখনও সংগঠক হিসেবে। 
১৯৫৮ সালে গবেষক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। গবেষণার শিরোনাম ছিল– Thoughts of the Bengali Muslims as reflected in Bengali literature during the British period (1757-1918), অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই ছিলেন তাঁর তত্ত্বাবধায়ক। ১৯৫৯ সালে অ্যাডহক ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার জন্য যান ১৯৬৪ সালে। একই বছর তাঁর পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ভ মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। যা ছিল তাঁর প্রথম বই এবং সাড়া-জাগানো গবেষণাকর্ম। সামাজিক ইতিহাসের পটভূমিকায়, বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্যকর্মের (১৭৭৫-১৯১৮) আলোচনা হয়েছে। সাহিত্যকে পটভূমি হিসেবে রেখে, ইতিহাসের অজ্ঞাত নানা তথ্য তুলে আনার পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্ম, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক তাঁর ভাবনা গভীর পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর এই গবেষণায়। তিনি বাংলা সাহিত্যে মুসলিম-মানসের বহুমুখী বিবর্তন ধারার উদ্ঘাটন করেছেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে, বিশেষত আখ্যানকাব্যে (যার বড় অংশজুড়ে রয়েছে সেক্যুলার বা ইহজাগতিক প্রেমভিত্তিক অ্যাখ্যান), যা বাংলা সাহিত্য মুসলমান কবিদের অবদানকে বড় করে তুলে ধরে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের জীবনব্যাপী সাধনা ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নেপাল থেকে বৌদ্ধচর্যা ও দোঁহাপদ আবিষ্কার, এসব বাস্তব উদাহরণ ও সত্যকে তুলে ধরে যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ সব সম্প্রদায়ের সৃষ্টি; কারও একক অবদানে এই ভাষা ও সাহিত্য সমৃদ্ধ নয়। আনিসুজ্জামানের তাঁর অভিসন্দর্ভে এই সত্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়, ঋদ্ধ করে তাঁর যুক্তিকে তুলে ধরেন তথ্য-প্রমাণসহ।
প্রায় একই সময় (১৯৬৪) বাংলা একাডেমি তাঁর, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র: ১৮৩১-১৯৩০ প্রকাশ করে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার বিষয় ছিল–‘উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস: ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল’; ১৯৬৫ সালে শিকাগো থেকে দেশে ফেরার পথে তিনি লন্ডন হয়ে ফেরেন। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে পড়াশোনার সুযোগ নেন। বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আহমদ [শহীদ বুদ্ধিজীবী গিয়াসউদ্দিন আহমদ (১৯৩৩-১৯৭১)] তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস হাউসে। ১৯৬৭ সালে আনিসুজ্জামান পূর্ব পাকিস্তানি লেখকদের লেখা প্রবন্ধ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটি সংকলনগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। ১৯৬৯ সালে আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে রিডার হিসেবে যোগদান করেন। 
১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ, শহরের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ক্যাম্পাস ও ক্যান্টনমেন্টের পথ ছিল একই। ২৪ মার্চ চট্টগ্রামে মিটিং শেষে তিনি ক্যাম্পাসে ফিরে যান। আগরতলা হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। 
দ্বিতীয় পর্ব (১৯৭১-১৯৯০): বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ও পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও গণতন্ত্র পুনরুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। যাকে আমি আনিসুজ্জামানের দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করি। প্রবাসী সরকারের প্রথম কমিশনের সদস্য ছিলেন পাঁচজন। কমিশনের দায়িত্ব ধার্য ছিল। আনিসুজ্জামান তাঁর ‘আমার একাত্তুর’ বইতে লিখছেন, ‘বিন্যাসটা হলো মোটামুটি এরকম: মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও লোকপ্রশাসন সম্পর্কে কাজগপত্র তৈরি করবেন, খান সারওয়ার মুরশিদ করবেন সামাজিক দিকটা নিয়ে; বিশেষ করে, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নির্যাতিত মহিলাদের পুনর্বাসন- সম্পর্কিত পরিকল্পনা করা হবে তাঁর দায়িত্ব। মুশাররফ হোসেন দেখবেন অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকটা; স্বদেশরঞ্জন বসু অভ্যন্তরীণ ব্যবসা ও বহির্বাণিজ্য নিয়ে কাজ করবেন, আর শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করব আমি।’ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নিদের্শনা নিয়ে বক্তৃতার বাংলা খসড়া তৈরির দায়িত্ব ছিল আনিসুজ্জামানের ওপর আর সেই চূড়ান্ত বক্তৃতা ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন খান সারওয়ার মুরশিদ। 
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ চেয়েছিলেন আনিসুজ্জামান নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকুন। কিন্তু শিক্ষকতাকেই তিনি প্রথমে রেখেছেন। স্বাধীনতার পর সরকারের তরফ থেকে আনিসুজ্জামানকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমত, বাংলাদেশের সংবিধানের ইংরেজি সংস্কারের বাংলা অনুবাদের সম্পাদকীয় দায়িত্ব, দ্বিতীয়ত, ১৯৭২ সালে গঠিত ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্যের দায়িত্ব। ১৯৭৪ সালে ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন বঙ্গবন্ধুকে জমা দেওয়ার পর, বঙ্গবন্ধু তাঁকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি ১৯৭৪-৭৫ সালে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে কমনওয়েলথ ফেলো হিসেবে, ১৭৮৫ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণার সুযোগ পান। দ্বিতীয় দফায় ব্রিটিশ লাইব্রেরির আমন্ত্রণে ইংরেজিতে কোম্পানির বাংলা কাগজপত্রের সার-সংকলন করতে লন্ডনে যান ১৯৭৭ ও ১৯৭৯ সালে। 
ইংল্যান্ডের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির নথিপত্র গবেষণার ভিত্তিতে, আনিসুজ্জামান সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করেন যে, বাংলা গদ্যের উনিশ শতকে বা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হাত ধরে আমাদের গদ্য শুরু হয়নি। বরং তারও আগে বাংলা গদ্য প্রচলন ছিল। যার প্রমাণ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সতেরো শতক থেকে বাংলা থেকে বস্ত্র (মসলিন) ও বিভিন্ন ধরনের মসলা ও অন্যান্য পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করতে, তারা যেসব ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সে সব ফ্যাক্টরির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পণ্যসংগ্রহ ও অন্যান্য প্রয়োজনে বাংলা গদ্যেই নিজেদের মধ্যে বার্তা বিনিময় করতেন। সে সব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ১৯৮১ সালে আনিসুজ্জামানের Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India office Library and Records গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। বাংলা গদ্যের বিকাশ যে ষোলো-সতেরো শতক থেকেই শুরু হয়েছিল সে-বিষয়ে তাঁর আরো একটি মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে; যা বাংলা একাডেমি (১৯৮৪) থেকে ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’ নামে প্রকাশিত হয়। এই পর্বে তাঁর আর একটি উল্লেখযোগ্য বই স্বরূপের সন্ধানে। 
তৃতীয় পর্ব (১৯৯১-২০০০): জীবনের তৃতীয় অধ্যায়ে সাহিত্য-গবেষণা চর্চা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক সংমিশ্রণে কর্মতৎপরতার ছিলেন আনিসুজ্জামান। নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন। বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ (১৯৯২) প্রণয়ন কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন তিনি। এই বানান নিয়মটি ১৯৯৮-এ পরিমার্জিত এবং ২০০০-এ সংশোধিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনাকালে তিনি শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। বহু গবেষণাধর্মী গ্রন্থ সম্পাদনা ও মৌলিক সাহিত্য রচনা করেন। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলা একাডেমির সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের একজন অভিভাবক হিসেবে কাজ করেছেন, নারী-প্রগতি ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদী (Cultural Pluralism) সমাজ গঠনের কথা বার বার জোর দিয়ে বলেছেন। ১৯৯৭ সালে তাঁর ‘আমার একাত্তুর’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। 
চতুর্থ পর্ব (২০০১-২০২০): এই দুই দশকে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জাতীয় মনন গঠনে পরিণত বয়সেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা রখেছেন। এই সময়কালে তাঁর সাফল্য ও স্বীকৃতিগুলো ঘটেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক পদে ভূষিত করে। বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে ২০১২ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি এবং বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা বোর্ডের সম্মানিত সদস্য ছিলেন। ব্যক্তি খাতে গড়ে ওঠা এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগ, সমাজের জন্য ইতিবাচক প্রচেষ্টা। এ প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন ‘মেন্টর’ ও অভিভাবক। তিনি উচ্চমানের সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’ এবং শিল্পকলাবিষয়ক দ্বিমাসিক পত্রিকা ‘যামিনী’র সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন। ছিলেন প্রথম আলোর একটি উদ্যোগ, প্রতিচিন্তার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। 
২০১৫ সালে তাঁর বিখ্যাত স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘বিপুলা পৃথিবী’ প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের জন্য ২০১৭ সালে তিনি কলকাতার আনন্দ পুরস্কার পান। এছাড়া তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ, ‘কাল নিরবধি’ (২০০৩) এবং মৃত্যুর পর ‘আমার অভিধান’ (২০২১), ‘মহামানবের সাগরতীরে’ (২০২১) ও ‘স্মৃতির মানুষ’ (২০২১) অন্যতম। ‘বিপুলা পৃথিবী’, ‘কাল নিরবধি’ ও ‘স্মৃতির মানুষ’ ও ‘চেনা মানুষের মুখ’ এসব আত্মজৈবনিক ও স্মৃতিচারণমূলক রচনায় নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে নানা ঘটনা কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এসব বইয়ের পাতায় পাতায়। দেশের ইতিহাসের পাঁচ দশকের পটভূমি জড়িয়ে রয়েছে এসব বইয়ে। তিনি নিজে ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী। নানা ঘটনা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। সংস্পর্শে এসেছেন এ সময়ের ইতিহাস ও নায়কদের। ইতিহাস কুশীলবদের অনেকের পেয়েছেন নিবিড় সান্নিধ্য। তাই তাঁর এই আত্মস্মৃতি একজন সমতাত্ত্বিক হিসেবে, আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের জন্য যা হয়ে উঠবে ইতিহাসের উপকরণ। ইতিহাসের দলিল।
বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ও প্রমিত বাংলা অভিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নেতৃত্ব দেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন বহুকাল। 
শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার ২০১৪ সালে তাঁকে দেশটির তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ প্রদান করে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পদক প্রদান করে। জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (২০১৭) এবং সার্ক সাহিত্য পুরস্কার তিনি লাভ করেন। প্রফেসর আনিসুজ্জামান করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১৪ মে ২০২০ তারিখে ৮৩ বছর বয়সে ঢাকায় এক বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
আনিস স্যার তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের মূল্যায়ন করছেন, তাঁর ভাষায় ‘‘…আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও যে আমি কিছু শিখিনি, তা নয়। তবে তাদের নিরন্তর ভালোবাসা এবং আমার অধিকাংশ সহকর্মীর সমর্থন আমার শিক্ষকজীবনের চলার পথ সুগম করেছে। আমার সন্তানরা কখনো আমার সাধ্যতীত কিছুর দাবি জানিয়ে আমাকে বিব্রত করেনি। পারিবারিক জীবনের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে আমার স্ত্রী আমাকে নিজের মতো চলার ও কাজ করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। তারপরও আমার যতটা করার ছিল আমি তা করতে পারিনি। জীবনের শেষ দিকে এসে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আফসোস করতেন, ‘আপনি তো আর লেখাপড়া করলেন না!’ তাঁর মতো মানুষের প্রত্যাশা যে আমি পূরণ করতে পারিনি তা আমার জন্য দুঃখের বিষয়। ভেবে দেখেছি অনুরূপ কিছু করতে না পারার তিনটি কারণ আছে আমার। সামাজিক অঙ্গীকারপূরণের চেষ্টা, আমার স্বাভাবিক আলস্য এবং অস্বাভাবিক আড্ডাপ্রিয়তা। সামাজিক কর্তব্যবোধ আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেজন্য সময় দেওয়াটা আমি কখনো সময়ের অপচয় বলে মনে করিনি। নিজের আলস্য অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য। আমার বন্ধুচক্র বিশাল, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো আমার জীবনের প্রশান্তির একটা বড়ো উৎস। তাই যদি বলি, কোনো খেদ নেই, তাহলে মিথ্যে বলা হবে না।’’ 

আরও পড়ুন

×