ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হইয়াছে

হেথায় নূতন খেলা  আরম্ভ হইয়াছে
×

উম্মে ফারহানা

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাসায় ফিরে ফ্যানি ব্যাগ খুলে দেখি এটিএম কার্ডটা নেই। ব্যাগের দুই পকেটেই খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না। সকালে গিয়েছিলাম হাঁটতে। ফোন বের করতে গিয়ে পড়ে গেছে কিনা কে জানে। এখন কার্ড হারালে মহামুশকিলে পড়তে হবে। কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কার্ড ডিঅ্যাক্টিভেট করো রে, তারপর চেকবুক দিয়ে টাকা তোলার জন্য লাইনে দাঁড়াও রে, ম্যালা ঝক্কি।  আজকে শুক্রবার, রোববারের আগে ব্যাংক খুলবেও না। আমি ঠিক করলাম যে যে রাস্তায় হেঁটেছি আর ছবি তুলেছি সবগুলোতেই যাব। আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে কিন্তু আমার হাতে তেমন কোনো কাজ নেই। সকালে রোদ ছিল না বলে সানগ্লাস নিইনি। এবারে সানগ্লাস পরে মাথায় একটা ওড়না পেঁচিয়ে নিলাম। বাসায় কিছুই বললাম না। দেখি চেষ্টা করে, কখনও কখনও হারানো জিনিস ফিরে পাওয়াও তো যায়! 
শহরের রাস্তাগুলো এখন আর চেনা লাগে না আমার। সেই এইচএসসি পরীক্ষার পর বাড়ি থেকে যে বের হয়েছিলাম, বসবাস করবার জন্য আর ফেরা হয়নি। ঈদ-পরবে কিংবা খালাতো-চাচাতো ভাইবোনদের বিয়েশাদি উপলক্ষে এলেও শহরের রাস্তায় হাঁটা হয়নি। এক ব্রহ্মপুত্রের পারে দু-একবার গিয়েই মন খারাপ হয়ে গেছে। কী বিচ্ছিরি সব স্ট্রাকচার। একটা অতিকায় ব্যাটের পেছনে বিসদৃশ তিনখানা স্টাম্প বানিয়ে রেখেছে, নাম দিয়েছে ব্যাটবল মোড়, কাচারি মোড়ে ‘হিমু আড্ডা’ নামে কুৎসিত দেখতে হলুদ রঙের একটা রেস্টুরেন্ট। ব্রহ্মপুত্রে জল শুকিয়ে চর পড়ে যেতে দেখে যত কষ্ট হয়, তার চেয়ে বেশি হয় প্রাকৃতিক একটা নদীর ধারকে উদ্ভটভাবে বাঁধিয়ে রাখা দেখে।  মুমিনুন্নিসা কলেজে পড়বার সময় কখনও কখনও নদীর পারে যেতাম, জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার সামনে কী চমৎকার ঢালু হয়ে নদীর বুকে নেমে যাওয়া পার ছিল, সাহেব কোয়ার্টারের রাস্তাগুলো কত চওড়া মনে হতো। এখন সেগুলোর মধ্যে দিয়েছে ডিভাইডার। 
শহরের অবস্থাও তথৈবচ। পুরাতন বাড়িগুলো ভেঙে ১০-১২ তলা বাক্স বানানো হয়েছে, থাইগ্লাসের জানালাগুলোতে কোনো সানশেড নেই। যে এলাকায় চার থেকে ছয় মাস বৃষ্টি হয়, সেখানে মানুষ কোন বুদ্ধিতে সানশেড ছাড়া জানালা বানায়, সেটা আমার মাথায় ধরে না। আম্মার এক বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলাম গতবার। জিলা স্কুল রোডের পুরাতন পৈতৃক বাড়ি ভেঙে অতিকায় একটি আবাসিক ভবন বানানো হয়েছে। আমরা বসে থাকতে থাকতেই বৃষ্টি নামল, বাসার সবাই ছোটাছুটি করে সব জানালা আটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নইলে ঘরে বৃষ্টির ঝাপ্টা এসে সব ভিজে যায়। একটু আগেই খালাম্মা আবার তিনখানা করে ফ্ল্যাট পেয়ে তাদের কত উপকার হয়েছে সেই গল্প করছিলেন। সত্যিই তো, বাপ-দাদার স্মৃতি ধুয়ে তো পানি খাওয়া যায় না। এর চেয়ে দুটো ফ্ল্যাট বিক্রি করে কিংবা ভাড়া দিয়ে বাকিটাতে থাকলে সংসারে সুসার হয়… সেই জন্য শহরে ডেভেলপারদের রমরমা ব্যবসা। বুঝলাম, পাকিস্তান আমলে বানানো বাড়িগুলো এমনিতেও ভেঙে ভেঙে পড়ত, এর চেয়ে ডেভেলপ করাটাই লাভজনক। তাই বলে এমন কদাকার দালান তুলতে হবে? রুচি বলে কিছুই কি অবশিষ্ট নেই আর মানুষের?  
বাসা থেকে বের হয়ে আমি প্রথমে গেলাম এটিএম বুথের কাছে। নতুন বাজার মোড়ের যে বুথ থেকে টাকা তুলেছিলাম, সেই বুথের আশেপাশে খানিকক্ষণ ফুটপাতে চোখ রেখে হাঁটলাম। তারপর আড়ংয়ের সামনে দিয়ে গিয়ে শশী লজের পেছনের রাস্তা ধরে আঠারো বাড়ির দিকে এগোতে থাকলাম। গোলপুকুরপাড় আর আমলাপাড়াতেও পুরাতন বাড়িগুলো ভেঙে ফেলেছে। তসলিমা নাসরিনের পৈতৃক বাড়ি ছিল, নাম ‘অবকাশ’, সেটাও এখন কনস্ট্রাকশন সাইট। এমন কিছু আহামরি সুন্দর ছিল না যদিও, টিপিক্যাল মফস্বলি বাড়িগুলো যেমন হতো, পাকিস্তান আমলে বানানো সাধারণ ডিজাইনের একতলা। কিন্তু সামনে লন আর ছাদে ওভাল শেপের ফাঁকাসহ রেলিংওয়ালা ওই বাড়িটাই একটা দর্শনীয় জিনিস হয়ে গিয়েছিল, পরে বানানো আর সব বাসাবাড়ির ছিরিছাঁদহীন চেহারার তুলনায় সেটাকেই মনে হতো খানদানি একটা দালান। সকালে আমি এই পথ ধরে গেছিলাম সংগীত বিদ্যালয়ের ভাঙাচোরা বাড়িটার সামনে। এই রাস্তা ধরে নদীর পারের কংগ্রেস জুবিলি রোডে উঠে গেলেই আরেকটা সুন্দর প্রাসাদের মতন স্ট্রাকচার আছে, এখন সোনালি ব্যাংকের অফিস, আগে সম্ভবত সূর্যকান্ত জমিদারদের সম্পত্তি ছিল। ওটা একটা দেখবার মতন বাড়ি, নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়ানো বাড়িটার সিংহদরজার পাশে দারোয়ানদের বসার জায়গায় এখন এটিএম বুথ। ছোটবেলা থেকে যতবার আমি সেই রাস্তা দিয়ে সোনালি ব্যাংকের করপোরেট শাখার সামনে দিয়ে গেছি, ততবার মনে মনে কল্পনা করেছি, যখন এই নদীর ধারটাতে ময়লার ঢিবি ছিল না, পৌর কাঁচাবাজার ছিল না, এই বাড়ির বারান্দা থেকে ব্রহ্মপুত্রকে দেখতে কেমন লাগত? মহাদেবের জটা থেকে বয়ে আসা এই পৌরাণিক জলধারা এখন একটা নর্দমার চেয়ে বেশি কিছু নয় যদিও, আমার কল্পনায় ব্রহ্মপুত্রকে আমি দেখতে চেয়েছি পরাক্রমশালী পুরুষ হিসেবে। এই ব্যাপারটা অদ্ভুত বাংলা ভাষার, জড় বস্তুতে সাধারণত লিঙ্গ বিভাজন নেই, যেমন– হিন্দি, উর্দুতে ‘মেরা ঘর’ কিন্তু ‘মেরি গাড়ি’, ঘরের জেন্ডার ম্যাসকুলিন, গাড়ির ফেমিনিন, বাংলায় তেমন নয়– কিন্তু নদীর মধ্যে নারী-পুরুষ আছে। দামোদর, কপোতাক্ষ, আড়িয়াল খাঁ নদ, কিন্তু পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদী। 
নিজের অজান্তেই নীল নদ ছাড়া আর কোন কোন নদের নাম শুনেছি তা মনে করার চেষ্টা করতে থাকি আমি। আমার এই বদঅভ্যাসটা নিয়ে আমি নিজেই খুব বিরক্ত। একটা জিনিস মাথায় ঢুকলে সেটা সরাতে বেশ বেগ পেতে হয়। সকালে যখন হাঁটা থামিয়ে থামিয়ে ছবি তুলছিলাম, তখনও এটাই ঘটেছে, কখন যে কার্ডটা পড়ে গেছে লক্ষ্যই করিনি। আঠারোবাড়িতে সমাজতান্ত্রিক দলের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আমি ফোন বের করে দেখি আর কোন কোন বাড়ির ছবি তুলেছিলাম… ডিমেনশিয়া হচ্ছে নাকি আমার, এই একটু আগের কথা অথচ মনে করতে পারছি না তখন কোন দিক দিয়ে কোন দিকে গেছিলাম। আশ্চর্য ব্যাপার তো। রাধাসুন্দরী স্কুল আর মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের ছবি দেখে নিশ্চিত হলাম, সকালে গোলপুকুরপাড়ের দিকে গেছিলাম।  গ্যালারি প্রায় ভরে গেছে গত কয়েকদিনে তোলা পুরাতন বাড়ির ছবি দিয়ে। সানকিপাড়া রেলক্রসিংয়ের কাছে রায় হাউসের ছবিটা দুই দিন আগে তোলা। 
রাধাসুন্দরী স্কুলে শুক্রবারে একটা গানের স্কুল চলে। বাচ্চাদের সঙ্গে মায়েদেরও দেখা যাচ্ছে স্কুলের আঙিনায়। আমি সেদিকে না গিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ের আঙিনায় ঢুকলাম। এইখানে সিঁড়ির ছবি তুলতে গিয়ে কার্ডটা হারিয়ে ফেলে থাকতে পারি। নিজের সুবিধাবাদী আচরণ দেখে নিজেরই হাসি পেয়ে গেল। নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মতন যেখানে খুঁজতে সুবিধা সেখানেই খুঁজতে যাচ্ছি আমিও…

কিছুক্ষণ স্কুলের বারান্দাগুলোতে হাঁটলাম আবার, কে জানে কবে এই দালান ভেঙে নতুন করে তুলবে… আবার যখন শহরে আসব, হয়তো দেখব ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় টাউন হলের মনোরম লাল ইটের দালানটা ভেঙে যেমন বদখত একটা ইমারত গড়েছে, তেমন করে মৃত্যুঞ্জয়-রাধাসুন্দরী আর বিদ্যাময়ীর প্রাচীন নির্মাণগুলোর জায়গা দখল করে নিয়েছে থাই গ্লাসে ঢাকা কদাকার কিছু বাক্স। 
কিছুক্ষণ মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের বারান্দায় বসে আমি ভাবি, একটা আস্ত শহর কীভাবে মরে ভূত হয়ে যায়… সব কিছু পাল্টে ফেলতে ফেলতে, সকল পুরাতনকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে করতে কেমন জম্বির মতন হয়ে যেতে পারে একটা গোটা জনপদ। স্কুলে পড়ার সময় গাঙ্গিনারপাড় মোড়ে যে লাল রঙের জলের ট্যাঙ্কটার সামনে দিয়ে যেতে হতো, সেটার গায়ে সেদিন দেখলাম বিরাট এক স্ক্রিন লাগানো, উন্নয়নের জোয়ারে ডুবে গেছে সকল নান্দনিকতা আর রুচিবোধ। বিপিন পার্কের চকচকে স্টিলের রেলিং আর দোলনাগুলো দেখলে রীতিমতো বিবমিষা হয়। আলেক্সান্ডার ক্যাসেলের বারান্দার ঘোরানো সিঁড়িগুলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে আর শশী লজের সামনের ভেনাসটা তো ভেঙেই ফেলল উন্মত্ত অশিক্ষিত কিছু লোক। প্রাইভেট প্রপার্টি ভেঙে ডেভেলপ করবার লাভজনক প্রক্রিয়া বন্ধ করবার উপায় নেই কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণগুলোকে তো রক্ষা করার চেষ্টা করাই যেত। 
কেউ এসে, ‘আমনে কেডা? কইত্থে আইছুইন? কারে বিছরাইন?’ বলে মাথা খারাপ করবার আগেই উঠে যাই আমি। বুড়ি শহরের অলিগলিতে হারিয়ে যাওয়া এটিএম কার্ড খোঁজার ছুতোয় আরও কিছুক্ষণ নিজের শৈশব-কৈশোর খুঁজে ফিরি। কোন বাসায় যেন আচার দিচ্ছে, পাঁচফোড়ন আর শুকনো মরিচ ভাজার গন্ধে ম-ম করছে রাস্তাটা… রাধাসুন্দরীর আঙিনায় ঢুকে শুনতে পেলাম হারমোনিয়াম বাজিয়ে শিশুরা গলা সাধছে– নি ধা পা মা পা গা মা পা, পা মা গা মা গা রে সা রে পা মা গা মা পা মা গা মা গা রে সা, নি রে গা মা পা ধা নি সা রে সা গা মা পা মা গা মা। ছোটবেলায় আমিও যেতাম প্রতি শুক্রবার নজরুল একাডেমিতে গান শিখতে। 
সেসব দিন কোথায় গেল… আম্মা বলতেন, ‘আগের দিন বাঘে খাইছে’। আসলেই সেই সময়টাকে গতজন্মের মতন মনে হয়। সি কে ঘোষ রোডের ক্যাসেটের দোকানগুলো এখন সব মোবাইল ফোনের দোকান হয়ে গেছে। কোথা থেকে গজিয়েছে বিরিয়ানি আর বার্গার বেচা রেস্টুরেন্ট। ঝলমলে আলোয় ভরা কেএফসি পৌঁছে গেছে একদা শান্ত ছিমছাম মফস্বলেও। উন্নয়ন, গ্লোবালাইজেশন, নিও ইম্পেরিয়ালিজম– কোনোটাই তো আর ঠেকানো সম্ভব না। পুরাতন দালানকোঠাগুলো রাখা না গেলেও শবেবরাতে প্রতিবেশীর বাড়িতে হালুয়া-রুটি পাঠানো কিংবা কেউ মারা গেলে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য হাঁড়ি ভরে ভাত-ডাল রেঁধে পাঠানোর সংস্কৃতিটুকু হয়তো রক্ষা করা যেত। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হলো, সে নিয়েও কেউ আর ভাবে না এখন। 
হাঁটতে হাঁটতে আমি বড় কালীবাড়ির দিকে এগিয়ে যাই। সেখানে ‘পূর্বাশা’ নামে একটা বাড়ির ছবি তুলেছিলাম। ক্লান্ত লাগছে বলে রিকশা ডাকি একটা। ইদানীং শহরে পায়ে চালানো রিকশা দুর্লভ হয়ে গেছে, সব মোটর বসানো। ঝড়ের গতিতে চলে, রিকশা চড়ার মজাটাই আর পাওয়া যায় না। ভাড়া দেওয়ার মতন খুচরা আছে কিনা চেক করতে গিয়ে আমি পকেটে হাত দিয়ে টের পাই শক্ত একটা কিছু। ফ্যানি ব্যাগ থেকে বের করে কখন ট্রাউজারের পকেটে রেখেছিলাম মনেই নেই। আসলেই ডিমেনশিয়া হচ্ছে বোধ হয়। নইলে পকেট চেক করবার কথাই বা ভুলে গেলাম কী করে? ডিমেনশিয়া মনে হয় অত খারাপ কিছুও না। পুরোনো স্মৃতি ভুলে গেলে অন্তত স্মৃতিকাতর হতে হবে না। পুরোনো আর হারিয়ে যাওয়া সব কিছুর জন্য এমন ভীষণ হাহাকার সৃষ্টি হবে না বুকের মধ্যে… পূর্বাশার আরেকটু পরে সূর্যকান্ত হাসপাতালটা এখনও আছে, আরেকবার দেখে আসব নাকি?  শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পাল্টাই। থাকগে, রিকশা নিয়ে বাসার দিকে এগোই বরং। এই শহরে পুরাতন খুঁজে ফেরাটাও হতাশার। এই লোকালয় যেন সদর্পে সারাক্ষণ বলছে, ‘হেথা হতে যাও পুরাতন, হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হইয়াছে।’ 

আরও পড়ুন

×