এক অদম্যের স্মৃতিগাথা
সাঈদ নিশান
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আত্মজীবনী বলতে যা বোঝায়, ‘জয়নগরের আলো: এক নারীর জীবন ও সংগ্রাম’ গ্রন্থটি তা থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। উম্মে সালমা আলো নিজের জীবনী লিখতে গিয়ে শুধু মানবিক সুখ-দুঃখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; এর গণ্ডি পেরিয়ে জীবনযাত্রার ঘাত-প্রতিঘাত, সংগ্রাম এবং নারীর ক্ষমতায়নের গল্প তুলে ধরেছেন। সেইসঙ্গে সামাজিক বাধা, প্রতিকূল পরিবেশ এবং নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে কীভাবে তিনি আলোর দিশা পেয়েছেন, তা এখানে ফুটে উঠেছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে যখন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন তাঁর পেছনে ফেলে আসা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা লিখে রাখার প্রয়োজন অনুভব করেন। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁর মৃত্যুর পর আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থের প্রকাশন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, এই বইটি পূর্ব বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীর সংগ্রাম তুলে ধরায় ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও গণ্য হতে পারে। তিনি এ গ্রন্থের ভূমিকাতে উল্লেখ করেন, “আমার সহধর্মিণী উম্মে সালমা আলো ‘জয়নগরের আলো : এক নারীর জীবন ও সংগ্রাম’ গ্রন্থে তাঁর জীবনের গল্প ও জীবনসংগ্রামের কাহিনি লিখে গেছেন। তিনি স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। একদিকে রোগ নির্ণয়ের ধকল, অন্যদিকে চিকিৎসার নিদারুণ কষ্ট তাঁকে ভোগ করতে হয়েছে। কেমোথেরাপির সময় তিনি ছিলেন কখনও চেতন, আবার কখনও অচেতন। এ সময় মনস্থির করেছিলেন, তাঁর জীবনকাহিনির অনুপুঙ্খ লিখে যাবেন। তিনি আমার কাছ থেকে পুরোনো একটি অব্যবহৃত ডায়েরি চেয়ে নেন। সেই ডায়েরিতেই খুব স্পষ্ট অক্ষরে লিখে রেখে যান তাঁর জীবনকাহিনি।” উম্মে সালমা আলোর জীবন ছিল একদিকে কষ্ট ও দুঃখের। অন্যদিকে সে জীবন ছিল সাফল্য ও অর্জনে সমুজ্জ্বল। চলার পথে তিনি অনেক কিছু দেখেছেন। দেখেছেন জল্লাদ বাহিনীর হাতে আপনজনদের মৃত্যু। বিয়ের অল্প ক’দিনের মধ্যে দেখেছেন স্বামীর কারাবরণ। এ ছাড়া ছিল মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর অনিশ্চিত অবস্থা। স্বামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাঁকে জীবনের অনেক সাধ-আহ্লাদ থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়েছে। স্বামী যখন অধ্যাপনায় যোগ দেন, তখন থেকে জীবনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসে। শ্বশুর-শাশুড়ি ও পিতামাতার অপত্য স্নেহ তাঁর জীবনে ভিন্ন ধরনের আনন্দ নিয়ে এসেছিল। এ ছাড়া অনেক অনাত্মীয় মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা উম্মে সালমার জীবন সুখময় করে তোলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী বেশ কিছু রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাইয়ের ঘটনার সাক্ষী এই লেখক। সেসব ঘটনাও তাঁর লেখনীতে ধরা পড়ে। উম্মে সালমা আলো আত্মজীবনীমূলক লেখাটি শুরু করেছিলেন ক্যান্সারের মৌলিক চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর। পুস্তক আকারে প্রকাশের কথা চিন্তা করে তিনি তা লেখেননি। তাঁর মৃত্যুর পর ড. মাহবুব উল্লাহ এটি প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন।
বইটি মূলত একটি নারীর জীবনযুদ্ধের বাস্তব চিত্র। এটি শুধু নিজের গল্প নয়, বরং এক নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণামূলক আখ্যান। আমাদের সমাজের প্রান্তিক বা সাধারণ পরিবার থেকে ওঠে আসা একজন নারী কীভাবে নানা সামাজিক ও পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হন এবং সেই বাধা জয় করে নিজের লক্ষ্য স্থির রাখেন, সেটিই এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। বইটিতে নারীর আত্মনির্ভরশীলতা এবং ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার জীবনযাত্রা, সেখানকার কুসংস্কার এবং নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এটি কেবল একটি জীবনী নয়, বরং যারা জীবনের কঠিন সময়ে হাল ছেড়ে দিতে চান, তাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার উৎস। উম্মে সালমা আলো তাঁর লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে যে কোনো অন্ধকার পরিস্থিতি থেকেও আলোর সন্ধান পাওয়া সম্ভব। v
- বিষয় :
- স্মৃতি
