রশীদ করীমের উপন্যাসে মধ্যবিত্ত জগৎ
রশীদ করীম [১৪ আগস্ট ১৯২৫—২৬ নভেম্বর ২০১১]
মাসুদুল হক
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে রশীদ করীম (১৯২৫-২০১১) সাহিত্যচর্চার পটভূমি ছিল এমন এক সময়, যখন বাঙালি মুসলমান সমাজ ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, পাশ্চাত্য শিক্ষা, দেশভাগ, নগরায়ণ এবং নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের ফলে দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছিল। এই রূপান্তর যেমন নতুন নাগরিক চেতনার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি সৃষ্টি করেছিল সাংস্কৃতিক দ্বিধা, মূল্যবোধের সংকট এবং আত্মপরিচয়ের অনিশ্চয়তা। রশীদ করীম এই পরিবর্তনকে কেবল সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের অন্তর্জীবনের সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করেছেন। ফলে তাঁর উপন্যাসগুলো একদিকে সামাজিক ইতিহাসের দলিল, অন্যদিকে আধুনিক মানুষের মানসিক বিচ্ছিন্নতার শিল্পরূপ। তাঁর ‘উত্তম পুরুষ’, ‘প্রসন্ন পাষাণ’, ‘আমার যত গ্লানি’, ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ এবং ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’– এই উপন্যাসগুলোয় মুসলিম মধ্যবিত্ত জীবনের বহুমাত্রিক সংকট ও উত্থান গভীর শিল্পসচেতনতার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে। এসব উপন্যাসে নাটকীয় সামাজিক সংঘাতের তুলনায় মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রেমের অনিশ্চয়তা, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এবং নৈতিক সংকট অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর সাহিত্য আমাদের জানায় যে সমাজ কেবল বাহ্যিক রাজনৈতিক কাঠামোর সমষ্টি নয়, মানুষের চেতনা ও মানসিক অভিজ্ঞতাও সামাজিক বাস্তবতারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
‘উত্তম পুরুষ’ রশীদ করীমের মনস্তাত্ত্বিক আধুনিকতার এক অনন্য উদাহরণ। উপন্যাসটির প্রথম পুরুষ বয়ান পাঠককে সরাসরি চরিত্রের চেতনার অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ দেয়। উপন্যাসের কথক নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্বীকার করে– ‘আমি লোকটি মোটের ওপর নিরিবিলি একাকী থাকতে ভালোবাসি… পূর্ব সন্ধ্যায় যে-লোকটি আমার অতি প্রিয় ছিল, হয়তো পরদিন সকালে তারই সঙ্গ আমাকে পীড়া দেয়।’ এই সংক্ষিপ্ত স্বীকারোক্তির মধ্যেই আধুনিক মানুষের মানসিক অস্থিরতা, আত্মবিভাজন এবং সম্পর্কের অনিশ্চয়তা প্রকাশিত হয়েছে। চরিত্রটি যেমন সামাজিক, তেমনি নিঃসঙ্গ; যেমন সম্পর্ক চায়, তেমনি সম্পর্ক থেকে পালাতেও চায়। এই দ্বৈততাই আধুনিক মধ্যবিত্ত সত্তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
‘উত্তম পুরুষ’-এ মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের সাংস্কৃতিক সংকটও অত্যন্ত তাৎপর্যের সঙ্গে উঠে এসেছে। ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও আধুনিক নাগরিক সংস্কৃতির প্রভাবে গড়ে ওঠা মুসলিম মধ্যবিত্ত একদিকে আধুনিক মূল্যবোধে আকৃষ্ট, অন্যদিকে ঐতিহ্যগত পরিচয়ের সঙ্গেও আবদ্ধ। ফলে তাদের চেতনায় জন্ম নেয় গভীর দ্বন্দ্ব। উপন্যাসের রাজনৈতিক বিতর্কভিত্তিক সংলাপগুলোয় মুসলমান জাতিসত্তা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এখানে রশীদ করীম কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং পরিচয়-সন্ধানী এক সমাজের মানসিক অবস্থাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন। এই ধারার আরও গভীর বিকাশ দেখা যায় ‘প্রসন্ন পাষাণ’-এ। তিশনা, কামিল ও আলিমকে কেন্দ্র করে নির্মিত সম্পর্কের জটিলতা কেবল প্রেমের গল্প নয়; বরং আত্মপরিচয়, মানসিক আশ্রয় এবং অস্তিত্বগত নিঃসঙ্গতার অনুসন্ধান। উপন্যাসটির চরিত্ররা সামাজিকভাবে সক্রিয় হলেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। তাদের জীবনে এমন এক শূন্যতা কাজ করে, যা তারা নিজেরাও সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। রশীদ করীমের সংলাপ নির্মাণশৈলী এই উপন্যাসে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘প্রসন্ন পাষাণ’-এর চরিত্ররা সাধারণ মানুষের মতোই কথা বলে, কিন্তু সেই সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই সম্পর্কের টানাপোড়েন ও মানসিক দূরত্ব প্রকাশিত হয়। ‘হুজুর, দেশের মাটি দেখলেন না’– হুকুম আলীর এই সরল উচ্চারণের মধ্যে যেমন গ্রামীণ স্মৃতি ও শেকড়ের আকর্ষণ আছে, তেমনি শহরমুখী মুসলিম মধ্যবিত্তের বিচ্ছিন্নতার বেদনাও নিহিত। রশীদ করীম উপলব্ধি করেছিলেন যে মানুষের গভীরতম সংকট অনেক সময় উচ্চারণে নয়, বরং অনুচ্চারণে প্রকাশিত হয়। তাই তাঁর উপন্যাসে নীরবতারও একটি ভাষা রয়েছে।
‘আমার যত গ্লানি’ রশীদ করীমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি, যেখানে দেশভাগ-উত্তর সমাজবাস্তবতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যবিত্ত মানুষের নৈতিক সংকট অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় রূপ পেয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এরফান চৌধুরী শিক্ষিত, নাগরিক, সফল; কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে গভীর শূন্যতা এবং আত্মগ্লানি। সে নিজের সম্পর্কে নির্মমভাবে বলে– ‘আমি লোকটা আসলে একটা খচ্চর।’ এই আত্মসমালোচনামূলক স্বীকারোক্তি চরিত্রটির নৈতিক দ্বিধা ও আত্মবিভাজনের প্রতীক। রশীদ করীম এখানে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও মুক্তিযুদ্ধকালীন মধ্যবিত্ত সমাজের সত্য উন্মোচন করেছেন। দেখিয়েছেন, ইতিহাসের সংকটময় মুহূর্তেও মানুষ প্রায়ই ব্যক্তিস্বার্থ, ভোগ ও নিরাপত্তার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এরফান কোনো বীর নয়; সে একজন দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ। কিন্তু এ দ্বিধাই তাকে বাস্তব করে তুলেছে। তার মাধ্যমে লেখক একটি শ্রেণির আত্মগ্লানিকে প্রকাশ করেছেন, যারা ইতিহাসের পরিবর্তনের মুহূর্তে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চিত ছিল। ‘আমার যত গ্লানি’ শুধু একটি ব্যক্তির গল্প নয়; এটি এক সময়ের নৈতিক সংকটের দলিল।
‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’-এ রশীদ করীম প্রেমকে নতুন অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে প্রেম কোনো রোমান্টিক উচ্ছ্বাস নয়; বরং অস্তিত্বগত নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। উপন্যাসের চরিত্ররা ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসা তাদের স্থিতি দেয় না; বরং আরও গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। উমর, রানু, সুফি এবং হারুনর রশীদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে লেখক আধুনিক নাগরিক জীবনের কৃত্রিমতা, ভোগবাদ এবং মানবিক বিচ্ছিন্নতাকে উন্মোচন করেছেন। রানুর চরিত্র বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। উপন্যাসের শেষাংশে উমর ও রানুর নীরব পুনর্মিলন দেখায় যে মানুষ শেষ পর্যন্ত এমন সম্পর্কেই আশ্রয় খোঁজে, যেখানে তাকে ব্যবহার করা নয়, বোঝার চেষ্টা করা হয়। রশীদ করীম এখানে দাম্পত্যকে কোনো আদর্শিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং জটিল মানবিক সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে মধ্যবিত্ত মানুষের মানসিক রূপান্তর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। উপন্যাসের এরফান চৌধুরী প্রথমদিকে সুবিধাবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক হলেও সময়ের অভিঘাতে তার চেতনায় পরিবর্তন আসে। ‘মা’ কেবল জন্মদাত্রী নন; তিনি মাতৃভূমি, শেকড়, জাতীয় চেতনার প্রতীক। ‘মায়ের কাছে যাওয়া’ তাই আত্মপরিচয়ে ফিরে যাওয়ারও প্রতীকী যাত্রা। রশীদ করীম দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল মানুষের বিবেক ও চেতনারও মুক্তি। রশীদ করীমের উপন্যাসগুলোয় কলকাতা এবং পরবর্তীকালে ঢাকা কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়; এগুলো নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের সাংস্কৃতিক ও মানসিক ভূগোল। শহর তাঁর চরিত্রদের আধুনিক করে, কিন্তু একই সঙ্গে নিঃসঙ্গও করে তোলে। নগরের ভিড়ের মধ্যেও তারা বিচ্ছিন্ন। নাগরিক জীবন তাদের আত্মসচেতনতা বাড়ায়, আবার সম্পর্কের ভঙ্গুরতাও বাড়িয়ে দেয়। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতাই তাঁর আখ্যানের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
তাঁর ভাষাশৈলী বাংলা গদ্যের আধুনিকতার এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তিনি অলংকারময় আবেগপ্রবণতার পরিবর্তে সংযত, বিশ্লেষণধর্মী ও মেদহীন গদ্য ব্যবহার করেছেন। তাঁর সংলাপ স্বাভাবিক, কিন্তু অর্থবহ; তাঁর নীরবতা বাক্যের চেয়েও শক্তিশালী। চরিত্ররা নিজেদের বিচার করে, প্রশ্ন করে, আত্মসমালোচনা করে। এই আত্মসচেতনতা আধুনিক মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং রশীদ করীম সেটিকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন।
সবশেষে বলা যায়, রশীদ করীমের উপন্যাসগুলো বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলিম মধ্যবিত্ত জীবনের এক অনন্য শিল্পরূপ নির্মাণ করেছে। তিনি সামাজিক পরিবর্তনকে কেবল বাহ্যিক বাস্তবতায় দেখেননি; বরং মানুষের চেতনা, স্মৃতি, সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয়ের সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর উপন্যাসে মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক আধুনিকতা, নাগরিক চেতনা এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানকে তিনি যে শিল্পগভীরতায় রূপ দিয়েছেন, তা বাংলা উপন্যাসকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এ কারণেই রশীদ করীম কেবল মুসলিম মধ্যবিত্ত জীবনের কথক নন; তিনি আধুনিক মানুষের অন্তর্জীবনেরও এক অসাধারণ শিল্পী।
- বিষয় :
- গল্প
