ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

সৎকার

সৎকার
×

শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক

মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দিব্বি ভালো মানুষটা ধপাস করে পড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ তড়পাল। তারপর একসময় স্থির হয়ে গেল। না হাত ভাঙল, না পা ভাঙল, না মাথা ফাটল, না তার কোমর মচকাল। মাটিতে ঝিম মেরে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ। একসময় হাত ইশারা করে বিনুকে কাছে ডাকল, কিছু বলছিল খুব নিচু অস্পষ্ট স্বরে। বিনু নিচু হয়ে তার মুখের কাছে মুখ নিয়েছিল। মনে হলো মদনের কথাগুলো জিবে জড়িয়ে যেতে যেতে গলার সুড়ঙ্গ বেয়ে আবার পেটের ভিতর সেঁধিয়ে গেল। বিনু একবার আর্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, কী বলতেছ বাবা!
বাকিটা আর শোনা হলো না, মদনের স্বরটা পুরোপুরি বুজে গেল। চোখ দুটো কড়িকাঠের দিকে মেলে, মুখটা হাঁ করে একদম স্থির হয়ে গেল সে। মনে হলো হাঁ করা মুখের ভিতর একটা কোলা ব্যাঙ লাফিয়ে পড়লেও লোকটা আর সাড়া দেবে না।
মৃত্যু হলে নিমেষেই মানুষ একটা অতীত সত্তা হয়ে যায়। জীবিতরা তাকে নিয়ে কিছুদিন ঘাঁটাঘাঁটি করে, তারপর সব ভুলে যায়। মদন চোরা মরেছে সংবাদটা ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না। গ্রামের হাটে লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডারের ময়রা বুড়ো বৈদ্যনাথ থুতনিতে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলল, লোকটা গ্রামে এসেছিল চার বছরের ছাওয়ালটারে কাঁধে চড়িয়ে। মণ্ডলের খালের ধারে একটুকরো পতিত জমিতে একটা ছাপরা ঘর তুলে বসত গড়ল। মণ্ডলের আড়তে মুঠেগিরিতে নাম লেখাল। এসব তো এই সেদিনের কথা। এর মধ্যেই মদনটা চলে গেল?
দর্জি উমেদ আলী দোকানে বসে রসগোল্লা গিলছে। বৈদ্যনাথের কথা শুনে কপালের ভুরু কেঁচোর মতো আঁকাবাঁকা করে বলল, কাকা, সেই সিঁদেল চোরটার কথা বলছো নাকি? ব্যাটা মরে গেছে?
এককালে চোর ছিল বটে। তবে পাপ স্বীকার করে ভালো মানুষ হয়ে গেছিল। বৈদ্যনাথ স্বগতোক্তি করল। মদনের জন্য বৈদ্যনাথের গলা থেকে সহানুভূতির সুর ঝরে পড়ে।
সেই সময় লোক জমিয়ে গুদারাঘাটে বাঁদরের খেলা দেখাচ্ছিল কেষ্ট। সংবাদটা শোনামাত্র বাঁদরটাকে কাঁধে উঠিয়ে মদন চোরার বাড়ির দিকে দ্রুত পা চালায়।    
সব আয়োজন শেষ করে শ্মশানের দিকে যাত্রা করতে রাত হয়ে গেছে। দলটা ছোট। মদনের খাটিয়া কাঁধে বয়ে নিচ্ছে চারজন, সাথে নিতেন, পিতম্বর, বিল্টু আর কেষ্ট। দলটা শ্মশানের দিকে যাচ্ছে। মিশমিশে কালো ভালুকের মতো রাতটাও যেন ওদের পাশে পাশে হেঁটে যাচ্ছে। বিনু হাঁটছে মাথা নিচু করে। হাঁটতে হাঁটতে বারবার পিছিয়ে পড়ছে। ওকে পিছিয়ে পড়তে দেখলেই কেষ্ট চেঁচিয়ে উঠছে, ওই বিনু চালু করে হাঁট। বিনুকে শোকসন্তপ্ত দেখালেও একটা গভীর চিন্তায় খাবি খেতে খেতে হাঁটছে সে। যেন ইচ্ছার বিরুদ্ধেই হাঁটছে। নিতেনের গলায় ঝোলানো ঢোলের ধুপধাপ শব্দে তড়বড়িয়ে এগোচ্ছে দলটা। এক হাতে হারিকেন ঝুলিয়ে আর অন্য হাতে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে আগে আগে হাঁটছে কেষ্ট। সে বিনুর সবচে’ কাছের বন্ধু। তাকে সবাই বাঁদরওয়ালা কেষ্ট বলে ডাকে। 
চারপাশে অন্ধকার জমে উঠলেও গ্রামটা এখনও জেগে রয়েছে। গেরস্তবাড়ির বেড়ার ফাকঁফোকর দিয়ে আলোর রেখা উজিয়ে পড়ছে রাতের অন্ধকারে। জেগে থাকা মানুষের গালগল্প শোনা যাচ্ছে। দলটা কাজীবাড়ির সম্মুখে পৌঁছালে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ চিৎকার করে তেড়ে এলো। গোবিন্দ হাতের লাঠি উঁচিয়ে ভেংচি দিয়ে উঠলে কুকুরটা ভয় পেয়ে কেঁউ কেঁউ শব্দ করতে করতে ছুটে বাড়ির ভিতর সেঁধিয়ে পড়ল। তারপর সেখান থেকে গলাটা আরও একধাপ চড়িয়ে চিৎকার করতে থাকল। 
গ্রামের সীমা ছাড়িয়ে ওরা নদীর দিকে হাঁটছে। সরু পথটার পাশে দৈত্যের মতো আকাশের দিকে হাত-পা ছড়িয়ে রেখেছে একসারি বাঁশঝাড়। নদীর জল কচলিয়ে আসা রাতের বাতাসে দুলছে বাঁশের সরু সরু শরীর, হাড় মটকানোর মতো মটমট শব্দ করছে থেকে থেকে। বাঁশঝাড়ের নিচে কাদা কাদা অন্ধকার। অন্ধকারের কাদা মাড়িয়ে ওরা নেমে গেল নদীর ঢাল বরাবর।
বাঁশঝাড় থেকে একটা শেয়াল বের হয়ে আসে। পথের মাঝখানে থমকে দাঁড়িয়ে দলটার দিকে তাকায়। দুই চোখে ধকধক করে ভাটার আগুন জ্বলছে। গোবিন্দ উঁচু গলায় ধমকে উঠলে প্রাণীটা লাফ দিয়ে পাশের ঝোঁপে আত্মগোপন করল। 
এই নিতেন, দেখেছিস? বালিতে পা ডুবিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পিতম্বর বলে উঠল।
কী? তার কথায় চোখ কচকিয়ে তাকায় নিতেন। 
শেয়ালটা যে বাম দিক থেকে ডান দিকে গেল। এটা কোনো অমঙ্গলের লক্ষণ হলো না?
আরে দুর, নিতেন বিরক্ত গলায় বলল, শেয়াল ডানে গেল নাকি বাঁয়ে গেল, সেইটা নিয়ে এত ভাবনা কেন রে? খালি অমঙ্গলের চিন্তা! তোর নাকে সব সময় অমঙ্গলের গন্ধ লেগে থাকে নাকি রে পিতম্বর? 
ওটা হচ্ছে শ্মশানের মড়াখেকো শেয়াল। মড়ার গন্ধ পেয়েছে তাই ঘুরঘুর করছে। মদনের খাটিয়া বাহকদের একজন বলে উঠল। 
বিল্টুর বয়স কম। খুব ভীতু স্বভাবের। কথাটা কানে যেতেই বিল্টুর বুকটা শিরশির করে কেঁপে উঠল। সে দলের আরও ভিতরে ঘেঁষে আসে। একবার ডানে, একবার বাঁয়ে ভয়ের চোখ মেলে হাঁটতে থাকে।
এই সবাই চুপ কেন, একসময় কেষ্ট গজর গজর করে উঠে, বল্, হরি–
সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, হরি বোল। তাদের চিৎকারের শব্দে সহসাই ডাক থামিয়ে কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেল ঝিঁঝিগুলো। বাঁশঝাড়ের ভিতর পাতার ওপর সড়সড় শব্দ করে ছুটে গেল বেজি জাতীয় কিছু।
মেঘের কালো ধোঁয়া আকাশ ঢেকে দিচ্ছে। পিটপিট করে তাকিয়ে থাকা তারাগুলো চোখ বুজে মেঘের আড়ালে লুকোতে লাগছে একে একে। বাতাসে যেন বৃষ্টির গন্ধ পায় গোবিন্দ, চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বলে, বৃষ্টি আসবে বোধ হয়। 
ঘাড় উঁচিয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকায় সবাই। বৃষ্টির আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে সকলের চোখেমুখে। এখন বৃষ্টি এলে তো বিপদ হয়ে যাবে! 
নদীর পারে একটা জুঁতসই জায়গা বের করে তড়িঘড়ি খড়িগুলো থরে থরে সাজাতে থাকে সবাই। শুধু একটু দূরে নিমগাছটার অন্ধকারে হাঁটু মুড়ে নিশ্চুপ বসে থাকে বিনু। সবাই মনে মনে ভাবে, আহা বেচারা! বাবাকে মাত্র হারিয়েছে। ভারী কষ্ট ছেলেটার মনে।
খড়ি সাজানো শেষ হলে তোশকটা বিছিয়ে তার ওপর মদনের দেহটা রাখে। কেউ একজন আঁজলা ভরে জল এনে ছিটিয়ে দেয় শবদেহে। কেষ্ট কেরোসিনের জার কাত করে খড়ির ভাঁজে ভাঁজে কেরোসিন ছিটায়। তারপর খুঁতখুঁতে চোখ বুলাতে বুলাতে শবদেহটাকে একপাক ঘুরে আসে। সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলে সে ঘাড় উঁচু করে কালো আকাশটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বৃষ্টির হিসাব কষে। তারপর একটু চিন্তিত গলায় বিনুকে উদ্দেশ করে বলে, বৃষ্টি নামার আগেই জোরালো আগুন দিতে হবে। এই বিনু, আয় মুখাগ্নি কর। 
আমি পারব না। হাঁসফাঁস করে বলে উঠে বিনু।
পারবি না মানে? হতবাক চোখ মেলে বিনুর দিকে তাকায় কেষ্ট।
বলছি তো আমি পারব না। বিনুর গলার স্বর রাগের আমেজে ভারী শোনায়। মনে হয় একটা রাগ এতক্ষণ ছাইচাপা দিয়ে রেখেছিল বুকের ভিতর। এখন রাগটা গলায় এসে উদ্‌গিরণের অপেক্ষা করছে।
বিনুর এ রকম অদ্ভুত রাগের কারণ বুঝে উঠতে পারে না কেউ। সবাই একযোগে বিনুর মুখের দিকে তাকায়। 
আমি কেন তার মুখাগ্নি করব? আমি তো তার সন্তান না। আমি তার বংশেরও কেউ না। বেনু চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথাগুলো বলল। 
মনে হলো আচমকা একটা ঝোড়ো হাওয়া ধাক্কা দিয়ে গেল দলটাকে। সব্বাই তটস্থ হয়ে তাকিয়ে থাকল বিনুর দিকে। দলটা এমন স্তব্ধ হয়ে গেল যে কেষ্ট নড়ে উঠলে ওর পায়ের নিচে চাপা পড়া শুকনো পাতাগুলো মচমচিয়ে ওঠার শব্দ শুনতে পেল সবাই। কেষ্ট বিনুর মুখোমুখি যেয়ে দাঁড়াল।
রাম রাম। এসব কী বলছিস তুই?
এবার ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল বিনু। ফ্যাত ফ্যাত করে নাক ঝাড়তে ঝাড়তে কাঁদতে লাগল সে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, মৃত্যুর সময় বলে গেছে সে আমাকে শহর থেকে চুরি করে এনেছিল। খুব পাপ করেছে। তাকে যেন ক্ষেমা করে দি। 
নদীর উত্তর কোণ থেকে ধুলোবালির বাবরি নাচাতে নাচাতে ঝড়টা ছুটে এলো সেই সময়। শুকনো পাতা উড়তে থাকল। গাছের ডালপালা কাঁপতে কাঁপতে দুলে উঠল। মটমট শব্দ করে দুলতে থাকল বাঁশঝাড়। হারিকেনের শিখাটা ক’বার হেঁচকি তুলে দপ করে নিভে গেল। তারপরই ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘিরে ঝমঝম বৃষ্টি নামল। 
তুমুল বৃষ্টির ভিতর বিনুকে ঘিরে স্তব্ধ হয়ে থাকে তার বন্ধুরা। বৃষ্টির ফোঁটা পিঁপড়ের মতো কামড়াতে থাকে, ওদের চোখে, মুখে, হাত পায়ে। জামাকাপড় ভিজে চুপসে টস্ টস্ করে জল গড়ায় শরীর বেয়ে। তবু কেউ নড়েচড়ে না। কেউ কথা বলে না। বিনুকে ঘিরে দাঁড়িয়েই থাকে। বিনুকে এমন হাপুস হুপুস করে কাঁদতে দেখেনি কেউ কোনোদিন। বাবার মৃত্যু শোকের ওপরেও যেন বাড়তি একটা শোকের জোয়ার তার ভিতরটা ভেঙেচুরে নিয়ে যাচ্ছে।
একসময় অভিমানী গলায় বিনু বলে উঠে, আমাকে চুরি করে না নিয়ে এলে শহরেই তো থাকতাম। ভালোই থাকতাম। কেউ আমাকে মদন চোরার ব্যাটা বলে গালিগালাজ করত না।
বৃষ্টি থেমেছে। বিনুর কান্নাও থেমেছে। কেষ্ট এসে বিনুর শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়। তার দিকে ক্ষণিক তাকিয়ে থেকে বলল, তোর বাবা তো তোকে ফেলে দেয়নি। খাইয়ে পরিয়ে, আদর স্নেহ দিয়ে বড় করেছে। আপন বাবার চে’ কম করেছে কিছু?
কথার উত্তর দেয় না বিনু। ঘাড় হেঁট করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। কেষ্ট ওর কাঁধে হাত রাখে, বলে, সে পাপ স্বীকার করেছে, তাকে ক্ষেমা করে দে। ঐই দেখ, আকাশের তারাগুলো তাকিয়ে দেখ। কেমন মিটিমিটি জ্বলছে। ওগুলো স্বর্গবাসী আত্মা। তোর বাবার আত্মাও স্বর্গারোহণ করে ওখানে যাবে। তাকে স্বর্গে যেতে দে।
বিনুর গোঁ কাটে না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে লুঙ্গির খুঁটোয় ফ্যাত ফ্যাত শব্দে বারবার নাক ঝাড়ে। কেষ্ট এবার হাত দিয়ে বিনুর গলা জড়িয়ে ধরে। বলে, শহরে থাকলে তুই কি আমাদের পেতিস? এই যে বিল্টু, নিতেন, গোবিন্দ আমরা সবাই তোর পাশে রয়েচি, শহরে থাকলে কি আমাদের দেখা পেতিস? আমাদের মাঝে এই রম’ জানাশোনা, এই রম’ বন্ধুত্ব, ভালোবাসা– এসব পেতিস?
বিনুর ভিতরে যেন একটা বোধ কাজ করে। সে নড়েচড়ে ওঠে। হাতের চেটো দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ায়। ভেজা পাটশলার আঁটি মুঠোয় নিয়ে কেরোসিনে চুবোতে চুবোতে বলে, দে, আগুন দে।
ঢোল বেজে উঠে দ্রিম দ্রিম। ডুগডুগির শব্দ আছড়ে পড়ে চারদিকে। গোবিন্দ কেরোসিনের জারটা খড়ির ওপর উল্টো করে ধরে। গলগল করে কেরোসিনের স্রোত বয়ে যায় খড়ির আনাচে কানাচে। দপ করে আগুন জ্বলে। ভেজা কাঠ ধোঁয়া উগরাতে উগরাতে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। শ্মশান থেকে কালো দৈত্যের মতো ধোঁয়ার কুণ্ডলীর সাথে মদনের অনুতপ্ত বিদেহী আত্মা যেন হুড়মুড় করে উঠে যায় স্বর্গের দিকে। হাতজোড় করে অভিভূতের মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকে বিনু। প্রচণ্ড অভিমানে বাবা নামের যে লোকটিকে মন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, কখন যেন লোকটি এসে আবার তার বুক জুড়ে বসেছে। বিনুর মুখে মাথায় শরীরে আদরের হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। 

আরও পড়ুন

×