রঙে রেখায় কালের পদচিহ্ন
শিল্পকর্ম :: জামাল আহমেদ
নিসর্গ সনাতন
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্যালারি কায়ার ২২ বছর পূর্তি উপলক্ষে গ্যালারিটি বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের একপ্রকার গোটা যাত্রাটিকেই চিহ্নিত করার মতো একটি প্রদর্শনী আয়োজন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। দলীয় এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে প্রয়াত, প্রবীণ ও নবীন মিলিয়ে ৪৫ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম। সন্দেহ নেই আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, হামিদুজ্জামান খানের মতো প্রয়াত ও হাশেম খান, রফিকুন নবীর মতো জীবন্ত দেশীয় কিংবদন্তির পাশাপাশি ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ চিত্রকরদের অন্যতম রামকিঙ্কর বেইজ, মকবুল ফিদা হুসেন, কে. জি. সুব্রমন্যনের চিত্রকর্ম প্রদর্শনের মাধ্যমে ‘টোয়েন্টি সেকেন্ড অ্যানিভার্সারি এক্সিবিশন’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি দেশ ছাপিয়ে আন্তর্জাতিকতা স্পর্শ করেছে। ১২ জুন শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীর আজই (২৬ জুন) শেষ দিন।
গ্যালারি কায়ার কর্ণধার নিজেও একজন গুরু চিত্রকর। বলছি শিল্পী গৌতম চক্রবর্তীর কথা। চিত্রকলার উদ্দেশ্য ও বিধেয় নির্ধারক তাঁর প্রতিটি আয়োজন নৈয়ায়িকের মতো সুচারু। ২০০৪ সালের মে মাসে কায়া যখন উত্তরার সেক্টর ৪, রোড ১৬, হাউস ২০-এ যাত্রা শুরু করে, শহুরে অবস্থানগত কারণেই মূলত, এই গ্যালারি নিয়ে তেমন উচ্চ প্রত্যাশা ছিল না। তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। তাই ফি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দলীয় ও একক প্রদর্শনীর আয়োজনের পাশাপাশি অসংখ্য আর্ট ট্রিপ ও ওয়ার্কশপের আয়োজন করে গেছে গ্যালারি কায়া, নিরলস। শিল্পসেবা প্রকৃতিসেবা। এবং প্রকৃতিসেবা হলো সেবার মূলধারা। মানবসেবা থেকে শুরু করে বিপুলা প্রাণপ্রকৃতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্প সরস্বতী এবং বাণিজ্যলক্ষ্মীর সেবা এই সেবার আওতায়। মূলধারা যে রক্ষা করে, প্রকৃতি তাকে রক্ষা করে।
আবার প্রদর্শনীর আলাপে ফেরা যাক। যে শিল্পীদের কাজ এখানে স্থান পেয়েছে, জ্যেষ্ঠক্রম অনুসারে তাদের নাম উল্লেখ করছি। রামকিঙ্কর বেইজ (১৯০৬-১৯৮০), এম. এফ. হুসেন (১৯১৫-২০১১), কে. জি. সুব্রমন্যন (১৯২৪-২০১৬), আমিনুল ইসলাম (১৯৩১-২০১১), মুর্তজা বশীর (১৯৩২-২০২০), দেবদাস চক্রবর্তী (১৯৩৩-২০০৮), নিতুন কুণ্ডু (১৯৩৫-২০০৬), আবু তাহের (১৯৩৬-২০২০), সমরজিৎ রায় চৌধুরী (১৯৩৭-২০২২)। যেহেতু প্রয়াতদের নাম উল্লেখ করছি, সেহেতু এখানে আমাদের সর্বশেষ রক্তক্ষরণ, শ্রদ্ধেয় হামিদুজ্জামান খান (১৯৪৬-২০২৫)-এর নামটিও উল্লেখ করা যেতে পারে।
জীবিত প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে যাদের কাজ স্থান পেয়েছে তারা হলেন যোগেন চৌধুরী (১৯৩৯), হাশেম খান (১৯৪১), মনিরুল ইসলাম (১৯৪৩), রফিকুন নবী (১৯৪৩), আবদুস শাকুর শাহ (১৯৪৭), শহীদ কবির (১৯৪৭), আবুল বারক আলভী (১৯৪৯), শাহাবুদ্দিন আহমেদ (১৯৫০), চন্দ্রশেখর দে (১৯৫১), ফরিদা জামান (১৯৫৩), মোহাম্মদ ইউনুস (১৯৫৪), রতন মজুমদার (১৯৫৪), জামাল আহমেদ (১৯৫৫), কাজী রকিব (১৯৫৫), রণজিৎ দাস (১৯৫৬), আহমেদ শামসুদ্দোহা (১৯৫৮), আইভি জামান (১৯৫৮), মাসুদা কাজী (১৯৫৮), অজিত শীল (১৯৫৯), শেখ আফজাল হোসেন (১৯৬০), শিশির ভট্টাচার্য (১৯৬০), চন্দ্র ভট্টাচার্য (১৯৬১), কনকচাঁপা চাকমা (১৯৬৩), গৌতম চক্রবর্তী (১৯৬৫), আলপ্তগীন তুষার (১৯৬৮)।
তরুণদের মধ্যে স্থান পেয়েছে নগরবাসী বর্মণ (১৯৭৩), আশরাফুল হাসান (১৯৭৭), কামালউদ্দিন (১৯৭৭), কামরুজ্জামান সাগর (১৯৭৭), আবদুস সাত্তার তৌফিক (১৯৭৯), শহীদ কাজী (১৯৮০), বিশ্বজিৎ গোস্বামী (১৯৮১), সোহাগ পারভেজ (১৯৮১), শাহানূর মামুন (১৯৮৬) ও নবরাজ রায়ের (১৯৮৯) শিল্পকর্ম।
শুরুতেই একটি প্রসঙ্গ স্পর্শ করেছি। এখানে আরও খানিকটা বাগবিস্তার করা যেতে পারে। বলেছি বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের গোটা যাত্রাপথটি ধরা পড়ে এই প্রদর্শনীতে। এ কথায় খানিক সীমাবদ্ধতা আছে। যে কোনো শিল্পকর্মই ইতিহাসের ধারা, ক্রম, শর্ত, সত্য ও উপকরণের ওপর নির্ভর করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। দেশটির গুরু-চিত্রকররা প্রাক-বাংলাদেশ সময় থেকেই নিজেদের নির্মাণ করছেন। এখানে যে শিল্পকর্মগুলো স্থান পেয়েছে সেগুলো ১৯৫৭ থেকে ২০২৬– এই সময়রেখার ভেতর চিত্রিত ও নির্মিত। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতবর্ষের চিত্রকলার যাত্রাপথটিও এখানে আংশিক ধরা আছে।
আমাদের শিল্পীদের স্বকীয়তা ও ঐতিহাসিকতা বৈশ্বিক। বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার স্থানটি এখনও নীতিনির্ধারকের নয়। তাই আমাদের চিত্রধারায় যেভাবে বাংলার ইতিহাস, লৌকিকতা, দর্শন, চরিত্রাবলি, প্রাণপ্রকৃতি ধরা পড়েছে– তা নিয়ে বিশ্বে খুব বেশি আলোচনা নেই। তবে গ্যালারি কায়ার এই প্রদর্শনী এক অমূল্য সুভেনিয়রের মতো, কালের পদচিহ্নকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি সিন্ধুসম তথ্য ও অনুভূতিকে বিন্দুতে ধারণ করছে। প্রদর্শনীটি দর্শকদের হৃদয়ে স্থান পাবে এমন প্রত্যাশা করা যায়। সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হয়ে এটি রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে।
- বিষয় :
- গল্প
