গুচ্ছ সময়
শিল্পকর্ম :: মনিরুল ইসলাম
হাইকেল হাশমী
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
কর্তৃপক্ষ তাদের বিভিন্ন শাখার সেবাদান ও সেবার মান নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমে নিয়মিতই সাধারণ মানুষের ভোগান্তির খবর প্রকাশিত হচ্ছে– প্রয়োজনীয় সেবা পেতে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তার বিবরণে ভরে উঠছে শিরোনাম। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগকারী ও দেশীয় উদ্যোক্তারাও প্রতিটি দপ্তরের জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন। এক জরুরি বৈঠকে বিষয়গুলো খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করা হলো। দেখা গেল, মানসম্মত সেবা প্রদানের পথে প্রধান বাধা হচ্ছে অসংখ্য বিধি-নিয়ম ও আইন। উপরন্তু, একজন আবেদনকারীকে বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনুমতি ও অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। এসব শর্ত পুরো ব্যবস্থাকে ভীষণভাবে মন্থর করে তুলেছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে কাজের প্রক্রিয়াকে সংক্ষিপ্ত করতে হবে। এই জটিলতা দূর করার উপায় খুঁজতে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হলো। কিন্তু সেই “জরুরি” নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই বিভিন্ন দপ্তরের কাগজপত্র আর অনাপত্তিপত্র জোগাড় করতে করতে এক বছরের বেশি সময় লেগে গেল। অবশেষে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হলো। তাদের কাজ– এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার পথ খুঁজে বের করা। কয়েক মাস পর তারা তাদের প্রতিবেদন জমা দিল– মাত্র একটি বাক্যে:
“চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র সরকারের কাছে ন্যস্ত।”
দোষারোপ মন্ত্রণালয়
লাতিন আমেরিকার একটি দেশ, যেখানে খুব ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হয়, ওখানে একটি নতুন সরকার বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় এসেছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দুর্বল শাসন ও আর্থিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিয়েছে। “পরিষ্কার” একটি প্রশাসন শপথ নেওয়ায় মানুষের ভিতরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি হলো– একটি নতুন মন্ত্রণালয়ের গঠন– দোষারোপ মন্ত্রণালয়।
এই নতুন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব খুব স্পষ্ট– প্রতিদিন বিগত সরকারের ব্যর্থতাগুলো তালিকাভুক্ত করা এবং সেগুলো জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা। বিবৃতিগুলো খুব যত্নসহকারে লেখা হয়, গাম্ভীর্যের সাথে উপস্থাপন করা হয়, এবং ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। জনগণ সন্তুষ্ট, অবশেষে জবাবদিহিতার একটি কণ্ঠস্বর পাওয়া গেছে।
সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর। ধীরে ধীরে এক নীরব অস্বস্তি জন্ম নিতে লাগল। দোষারোপের তালিকা আরও দীর্ঘ, আরও সাবলীল হয়ে উঠল– কিন্তু কিছুই যেন বদলাচ্ছে না। রাস্তা ভাঙাই রয়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বলই থেকে যাচ্ছে। নতুন মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু মানুষের সমস্যা ওই আগের মতোই রয়ে গেছে।
এক সকালে, প্রায় অদৃশ্যভাবে, দোষারোপের সুর বদলে গেল। দোষারোপের তালিকা এখন আর শুধু অতীতের কথা বলছে না। বর্তমানও তাতে ঢুকে পড়েছে। আর ভবিষ্যৎ, অজান্তেই, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে– আগামীর দোষারোপের তালিকায় যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়।
জনসাধারণের মতামত
কোনো এক দেশের সংসদে জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে তুমুল বিতর্ক ও হট্টগোল চলছে। মূল প্রশ্ন হলো– জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে না। বিরোধী দলের এক সদস্য এই আপত্তিটি তুললেন। জবাবে সরকারি দলের এক সদস্য বললেন, “আমরা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আমরাই জনগণের কণ্ঠস্বর।” তবুও বিরোধী দল সন্তুষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হলো।
প্রথম বৈঠকেই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন– গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জনগণের প্রকৃত মতামত জানার জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করতে হবে। এই দায়িত্ব দেওয়া হলো তথ্য মন্ত্রণালয়কে– জনমত সংগ্রহ করে কমিটির কাছে প্রতিবেদন আকারে পেশ করার জন্য। এই বিশাল কাজ সম্পন্ন করতে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া হলো। তাদের কাজ– অভিযোগ, মতামত ও প্রস্তাব সংগ্রহ করে একটি সংক্ষিপ্তসার তৈরি করা। বিপুল পরিমাণের তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্য ওই প্রতিষ্ঠান একটি বিশেষায়িত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করল। কোটি কোটি অভিযোগ ও প্রস্তাব জমা পড়ল। এআই ওই অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই আর পর্যালোচনা করে একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্তসার উপস্থাপন করল–
“জনগণ সরকারের সব কর্মকাণ্ডের সাথে একমত।”
ক্ষুধা
আমি একজন ডাক্তার এবং একটি এনজিওতে কাজ করি। এই এনজিও যৌনকর্মী আর তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে। যদিও লোকজন তাদের ঘৃণা করে আর সামাজিক জীবনে তাদের কোনো স্থান নেই। কিন্তু ওই ভদ্রসমাজই তাদের খরিদ্দার। দিনের বেলা ঘৃণা করে আর রাতের বেলা মুখ ঢেকে যৌনপল্লিতে যায়। আমাকে কাজের সুবাদে ওদের কাছে যেতে হয়। তারা বেশির ভাগই নিজ ইচ্ছায় এই পেশায় আসেনি। হয়তো প্রতারণা করে এনে বিক্রি করে দিয়েছে অথবা প্রেমিক সেজে এই কাজে যুক্ত করেছে, আমার জানা মতে কেউই স্বেচ্ছায় এই কাজে আসেনি। যা হোক একদিন আমি এমনই একটি পল্লিতে গেছি। সরু লম্বাটে জায়গায় দুইদিকে সারি সারি ছোট ছোট রুম। ভিতরে মাত্র একটি খাট রাখার মতো জায়গা। ওই কক্ষগুলোতেই তারা তাদের খরিদ্দারের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে সময় কাটায়। যেদিন আমি গেছি তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। বারান্দার অন্য প্রান্তে একটি ছোট বাচ্চার কান্না শুনতে পেলাম। সে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “মা খুদা লাগসে খাইতে দে”। মায়ের গলা ভেসে এল, “ট্যাকা নাই, পয়সা নাই, কোনো খরিদ্দার নাই। তোরে কেমনে খাওয়া দিমু”। আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওই শিশু আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “মা, মা তোর নতুন কাস্টমার আইসে। এবার খাবার পামু!”
- বিষয় :
- গল্প
