ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মাতৃত্ব ও পরিচয়ের পুনর্লিখন

মাতৃত্ব ও পরিচয়ের পুনর্লিখন
×

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যালারির ভেতরে প্রথমেই মনে হয়, এখানে যেন কারও ব্যক্তিগত ডায়েরির এমন কিছু পৃষ্ঠা খুলে বসেছি, যা কখনও ভাষায় লেখা হয়নি। লেখা হয়েছে সুই-সুতোয়, কাপড়ের ভাঁজে, তুলোর নরম স্তরে, অসম্পূর্ণ শরীরের অবয়বে। সাদা স্বচ্ছ কাপড়গুলো বাতাসে দুলছে। তাদের ছায়া মেঝেতে এসে আরেকটি ছবির জন্ম দিচ্ছে। কোথাও কোনো উচ্চারণ নেই, অথচ প্রদর্শনীজুড়ে যেন একটি বাক্য বারবার ফিরে আসে– একজন নারী কি কখনও নিজের শরীরের একক মালিক থাকেন?
লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে চলমান শিল্পী বুবলী বর্ণার একক প্রদর্শনী ‘বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বে, বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা-২ সেই প্রশ্নেরই শিল্পভাষ্য। গত ৪ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিল্পী নিসার হোসেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। 
প্রদর্শনীতে প্রবেশ করতেই চোখ আটকে যায় ‘হু ইজ গোয়িং টু কুক ইন হ্যাভেন’ (‘Who is Going to Cook in Heaven?’) শিরোনামে বিশালাকৃতির একটি ইনস্টলেশনের দিকে। চারটি স্বচ্ছ কাপড়ে হাতে সেলাই করা মানুষের অবয়ব ঝুলছে ছাদের কাছ থেকে। এগুলো স্থির নয়। দর্শকের চলাফেরা কিংবা বাতাসের হালকা স্পর্শে দুলে ওঠে। কিন্তু তা দর্শককে সেভাবে ভাবায় না, তারা শিল্পকর্মটি দেখতেই ব্যস্ত। ফলে শিল্পকর্মটির হঠাৎ দুলে ওঠাতেই যেন শিল্পী প্রশ্ন করছেন– নারীর শ্রমও কি এমনই নয়? ঘরটিকে টিকিয়ে রাখে, অথচ চোখে পড়ে না।
কাজটির নামই দর্শককে থমকে দেয় ‘স্বর্গে রান্না করবে কে?’ প্রশ্নটি শুনতে প্রায় রসিকতার মতো। কিন্তু এর অন্তরালে রয়েছে বহু শতকের সামাজিক বাস্তবতা। একজন নারী কি কেবল সংসারের কাজের মধ্যেই সংজ্ঞায়িত? মৃত্যুর পরও কি তাঁর পরিচয় সেই রান্নাঘরেই আটকে থাকে? শিল্পী বুবলী বর্ণা কোনো উত্তর দেন না। প্রশ্নটিকেই তিনি শিল্পে পরিণত করেছেন।
এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এখানে কোনো শরীর সম্পূর্ণ নয়। কোথাও একটি হাত, কোথাও হাঁটু, কোথাও মোচড়ানো পা, কোথাও ভাঙা ধড়। ‘দ্য বডি বিটুইন আস’ (‘The Body Between Us’) সিরিজে নরম কাপড়ে তৈরি বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেয়ালের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে। প্রথম দেখায় এগুলো যেন দুর্ঘটনার পর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরীর। কিন্তু কিছুক্ষণ পর উপলব্ধি হয়, এগুলো ধ্বংসের চিহ্ন নয়, বরং রূপান্তরের।
মাতৃত্বের পর একজন নারীর শরীর আগের মতো থাকে না। কেবল বাহ্যিকভাবে নয়, ভেতরেও বদলে যায় তার অনুভূতি, পরিচয়, আত্মপরিচয়ের ভাষা। শিল্পী সেই পরিবর্তিত শরীরকে অখণ্ডভাবে দেখাতে চাননি। বরং ভাঙা অংশগুলোর মধ্যেই তিনি খুঁজেছেন নতুন এক সত্তা।
গ্যালারির একপাশে সাদা কুইল্টের ওপর ফুলেল কাপড়ে সেলাই করা একটি নারীদেহ। কাজটির শিরোনাম ‘আই হ্যাভেন্ট স্লিপ্ট ফর অ্যা থাউস্যান্ড নাইটস’ (‘I Haven’t Slept for a Thousand Nights’)। শিরোনামটি যতটা কাব্যিক, কাজটি ততটাই নির্মম বাস্তব। শরীরটি কুঁকড়ে আছে, যেন বহুদিনের ক্লান্তি তার হাড়ে জমে আছে। এই দৃশ্য দেখলে মনে পড়ে যায় সেইসব মায়ের কথা, যাদের রাতের ঘুম সন্তানের কান্নায় ভেঙে যায়, অথচ সেই জেগে থাকার কোনো সামাজিক ইতিহাস লেখা হয় না।
আরেকটি কুইল্টে কয়েকটি শরীর একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে কে কোথায় শেষ হয়েছে, কে কোথায় শুরু– তা বোঝা যায় না। মাতৃত্বকে শিল্পী এখানে রক্তের সম্পর্ক হিসেবে নয়, অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব হিসেবে দেখিয়েছেন। নাভিরজ্জু কেটে যাওয়ার পরও মা ও সন্তানের অদৃশ্য সংযোগ যে শেষ হয় না, তারই রূপক যেন এই কাজ।
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ‘ফোর্থ ট্রাইমেসটার (‘Fourth Trimester’) দর্শকদের সামনে তুলে ধরে সন্তান জন্মের পরের সময়টিকে। যে সময় নিয়ে শিল্পকলায় খুব কমই কাজ হয়েছে। গোলাপি রং, ভ্রূণের অবয়ব, গৃহস্থালির প্রতীক, শরীরের ক্লান্তি– সব মিলিয়ে এখানে মাতৃত্বের কোনো অলৌকিক মাহাত্ম্যের গল্প নেই; আছে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পুনর্জন্মের জটিল দলিল।
প্রদর্শনী ঘুরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বুবলী বর্ণার কাছে কাপড় কখনোই শুধু মাধ্যম নয়। কাপড় এখানে স্মৃতির ধারক। পুরোনো কাঁথা, ব্যবহৃত বালিশ, সেলাইয়ের দাগ, ফুলেল নকশা সবকিছুই বহন করে মানুষের শরীরের স্পর্শ, ঘুম, কান্না, অপেক্ষা আর সময়ের স্তর।
শিল্পীর বয়ানে তাঁর শিল্পচর্চার কেন্দ্রবিন্দু মাতৃত্ব হলেও সেটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আটকে নেই। নিজের সন্তান জন্মের পর তিনি উপলব্ধি করেন, মা ও সন্তানের সংযোগ কেবল নাভিরজ্জুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অদৃশ্য এক শরীরী সম্পর্ক, যা আজীবন বহমান থাকে। সেই অদৃশ্য সংযোগই তাঁর শিল্পের মূল ভাষা হয়ে উঠেছে।
তাঁর মতে, মাতৃত্ব তাঁকে নতুন করে বুঝিয়েছে পরিচয়ের পরিবর্তন, গৃহস্থালির অদৃশ্য শ্রম, ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নারীর অবস্থান এবং শরীরের রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাই তাঁর শিল্পে হাতের সেলাই কেবল নন্দনতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি এক ধরনের অব্যক্ত শ্রম। যে শ্রম যুগের পর যুগ নারীর কাজ বলে অবহেলিত হয়েছে, সেই শ্রমকেই তিনি শিল্পের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেছেন। 

আরও পড়ুন

×