পদাবলি
অলংকরণ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
অবিনশ্বর
মারুফুল ইসলাম
কখনও কখনও চোখের জল জমিয়ে রাখতে হয়
ভবিষ্যতের প্রথম প্রহরের জন্য
কখনও কখনও বুকের আগুন
হাতে রাখতে হয়
অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়া অন্ধকারে
আলো জ্বালবার জন্য
পাথরে পাথর ঠুকে আগুন জ্বেলে জ্বেলে শিখেছি
কী করে জীবনে জীবন ঠুকে যূথবদ্ধ জ্বেলে রাখতে হয় আলো
আর সে আলোয় পাড়ি দিতে হয় পথ
পথ চেনাই হোক কি অচেনা
পথ মসৃণই হোক কি বন্ধুর
পথ বৃষ্টিভেজাই হোক কি রোদজ্বলা
এই পথচলা নিরন্তর
আর মানুষ যখন চলে মানুষের ভালোবাসার চিরায়ত পথে
তখন গাছেরা তার ওপর সুরভিত ফুলের পাপড়ি ছড়ায়
কুর্নিশ করে পর্বতমালা
ঢেউয়ের চুড়োয় চড়ে অভিবাদন জানায় অথই মহাসাগর
কেননা প্রকৃতি জানে প্রকৃত মানুষ অবিনশ্বর
তবুও অন্ধকার
শাহাবুদ্দীন নাগরী
তোমার শাড়ির জমিনে আমি লিখে রাখি প্রেমের লিরিক,
আকাশভাঙা বৃষ্টি এসে ছুঁয়ে দেয় তোমার দুঠোঁট,
সফেদ ঊরুর মাস্তুলে ঝড় আসে আমি দেখেছি সঠিক,
মায়াবী স্তনের নিচে দুধের ফোয়ারা বাঁধে অকিঞ্চিৎ জোট।
আমার বর্ষাগান তোমার বাদল দিনে ছুঁয়ে যায় মন
রঙিন পেখম নিয়ে কোমরে দোল খায় নাচের ময়ূর,
বজ্রের দাপট নিয়ে আমার রক্তে ছোটে নূহের প্লাবন,
গ্রীষ্মের দাবদাহে চৌচির বনভূমি আর কতদূর?
স্বপ্নভূক পাখিদের ভাষা ঠোঁটে জমে, বাসর সাজায়,
অমিয়ধারার দিকে ছোটে রোজ, খোঁজে আগুনের তাপ,
সুঠাম মাটির দেহ ফেটে যায়, বয়সের ঘণ্টি বাজায়,
কুমারী চেনে না পথ, ভুল পথে দাঁড়িয়ে থাকে পাপ।
সন্ধ্যার আকাশজুড়ে আলোমাখা তারকারাজি ফোটে,
তবুও অন্ধকার জড়ো হয় তরুণীর লাল পেটিকোটে।
অনেক খরার পরে
ফারুক ফয়সল
অনেক খরায় যখন মাটিতে চির ধরেছে,
অনেক দিনের আগুন-তপ্ত সূর্যরশ্মি পুড়িয়েছে
তোমার কপোল, চিবুক, গণ্ডদেশ; পুড়িয়েছে অকুণ্ঠে
তোমার দুধে আলতা বরণ, কান্তিময় দেহসৌষ্ঠব
আহা তুমি কাতরাচ্ছিলে তোমার ঝলসে যাওয়ার কষ্টে
তোমার দুধ সাদা ফর্সা ত্বকে ফুসকুড়িগুলো বসে যাচ্ছিল
ওষুধ আর শুশ্রূষায় উপসম না হওয়ায় তুমি লুকোচ্ছিলে
তোমার ভিতরে তখন প্রজ্বলিত দহন, দাউ দাউ জ্বলছিলে
সহসা নামলো বরিষণ শ্রাবণের ঘন বর্ষার ধারা হয়ে
মুহূর্তে তোমার রূপবদল, মুখ বদল, মুখোশ যায় সরে
মনময়ূরী তুমি পেখম দিলে মেলে, তুমি ভিজে গেলে
শ্রান্ত শরীর মৃগনাভীর মেদুরতায় কাতর মোম গলে
এরপর আসে আশ্বিনের ঢল, পাড় ভাঙে, নৌকার ভাঙে হাল
ঝড় আসে ধেয়ে, শরীরের ভিতর জলের ঘূর্ণন,
জলের তোড়ে ভেসে যায় পাক-পঙ্কিলতা, ক্লেদ-খেদ,
গভীর ঘুম নেমে আসে,
ফসল ভরা দিনের স্বপ্ন জাগে ঘোর লাগা চোখে!
হে অনন্ত অসম্ভবের চূড়া
আহমদ জামাল জাফরী
এই স্খলিত নিদ্রার অনঙ্গ অন্ধকারে
স্বপ্ন ও স্মৃতির মর্মতলে, হে অনন্ত অসম্ভবের চূড়া
আমি আকাশ ভরা ভাঙনের শব্দ শুনি!
আবছায়া মেঘের ধূসর ছায়া উড়ে বিষণ্ন পর্যটনে
মানুষের সোপান ভেঙে প্রাচীন বৃক্ষের
ঊর্ধ্বমুখী ডানার বনস্থলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
স্মৃতির জীবাশ্ম হয়ে স্তব্ধতার অন্ধকারে
পুরাতন গল্পগুলো পরমার্থ, অবসাদ।
অর্ধনগ্ন নিষ্ফল এই গ্রহে জীবনের দুঃসহ টান
এই আত্মঘাত অপ্রেমের ছায়ায় স্পর্শ করে তীব্র হলাহল,
প্রাচীন নদীর মতো ক্রন্দন-ধ্বনি নেমে আসে
বেদনার এই শূন্যহাত জল আর অশ্রুর ভাসমান রাত!
শ্মশানের মতো স্তব্ধতা বুকে নিয়ে
ঘুমহীন খোলা জানালায় মেঘভর্তি ভাঙা চাঁদ,
নীরব দাহের পথে জেগে থাকে বিনষ্ট প্রান্তর
রাত্রি নামার মতো নত হয়ে আসে পৃথিবী,
আমার বুকে জেগে থাকে আদিম এক পাহাড়!
- বিষয় :
- কবিতা