ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লিফট

লিফট
×

শিল্পকর্ম :: সৈয়দ ইকবাল

নাহিদা নাহিদ

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিদিন সকাল আটটা চল্লিশ মিনিটে, ধানমন্ডির এক সুউচ্চ কংক্রিটের ভবনের নয়তলার করিডোরে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি দরজা থেকে দুজন মানুষ প্রায় একই সময়ে বেরিয়ে আসে এবং আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এত কাছে থেকেও তাদের মধ্যকার দূরত্বটুকু কোনো মাপযন্ত্রে ধরা যায় না। ভদ্রমহিলা ভারী সেগুন কাঠের দরজায় চাবি ঘুরিয়ে একবার পেছনে তাকিয়ে তার নিজস্ব ব্যাগটি বুকের কাছে এমন করে চেপে রাখেন যেন এই সুরক্ষা বর্ম ভেদ করে তার নিকটবর্তী হওয়ার সাধ্য স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই। অন্যদিকের পুরুষটির ঠোঁটে থাকে চটুল গান। কদাচিৎ শিস। কাওসারদের পরিবার এখানে এসেছে মাস ছয়েকও হয়নি, মারুফারা পুরোনো। অজস্র চোখাচোখি কিংবা সাক্ষাতের ঘটনা তাদের মধ্যে ঘটলেও কোনোদিন তা কথোপকথনে না পৌঁছার কারণ, একটি অসমাপ্ত বাক্য ‘আমরা খুব বেশি ঘনিষ্ঠ নই’ অদৃশ্য, অপ্রীতিকর, অসহনীয় হয়ে ঝুলে থাকে দুজনের মাঝে। 
আলাপে কাওসারের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও লিফটে পাশাপাশি দাঁড়ালে খুব খেয়াল করলে বোঝা যায়, তাকে দেখামাত্রই ভদ্রমহিলা বিব্রত হন। একটু-বা কেঁপেও ওঠেন। হয়তো তার মনে হয় বিপরীতে দাঁড়ানো লোকটি কোনো এক অদৃশ্য বিপদ কিংবা কোনো অকল্যাণ ঠেসে আনা বাকসো, যার ডালা একটু খুলে দিলেই ছুটে আসবে কালো, কুৎসিত, অন্ধকারের ছুটন্ত হলকা। এমনটাই লেখা থাকে মারুফার মুখে। অথচ স্বচ্ছ পারদের দেয়ালে কাওসারের আত্ম অবয়বটি নিজের কাছে কখনও নির্দয় কিংবা অপবিত্র বলে মনে হয় না তার। অস্বস্তি কাটাতে একদিন সাহস করে কাওসার বলেই বসে, ‘ভালো আছেন?’ কিন্তু সেই আন্তরিক জিজ্ঞাসাটি লিফটের ধাতব দেয়াল বেয়ে প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনি তুলে আবার ফিরে এসেছে কাওসারের কাছেই। মারুফার নিষ্প্রভ প্রতিক্রিয়ায় কাওসারের চওড়া চিবুক, কোটরাগত চোখ, তামাটে চামড়া, এমনকি ঠোঁটের কাছের হাসিটুকু এমন এক স্থায়ী কঠোরতায় পৌঁছায়, যেখান থেকে আর কোনো সখ্য গড়ে ওঠার কথা ভাবনায় আসার কথা নয়।
দিনটি ছিল মঙ্গলবার এবং অফিসে যেতে কয়েক মিনিট দেরি হয়ে যাওয়ায় মারুফা প্রায় দৌড়ে লিফটে ঢুকে দেখে কাওসার আগে থেকেই ভেতরে দাঁড়িয়ে। তাকে দেখামাত্রই তার মনে প্রথম যে চিন্তাটি উদয় হয়, সেটি এত দ্রুত এবং এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নিয়েছিল যে সে নিজেই বুঝতে পারেনি, চিন্তাটি তার, নাকি তার ভেতরে বহু বছর ধরে বসবাস করা এক ভয়বহ আতঙ্কের। মারুফার মনে হয়েছে লোকটা তাকে অনুসরণ করছে। না হলে একই সময়ে প্রতিদিন বের হওয়া কিংবা একই দিনের এই যৌথ-বিলম্ব কতটা কাকতালীয়? নাকি কাকতালীয় বলে যেগুলোকে সে এড়িয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর আড়ালে রয়েছে গভীর কোনো ষড়যন্ত্রের নিখুঁত প্রস্তুতি। মারুফা নিশ্চিত, এমনটাই হবে।
তার এই সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য সমস্ত ভাবনার মাঝে কাওসার সামান্য কিছুও করণীয় না পেয়ে অপ্রস্তুত হাসে, আর সেই হাসির সঙ্গে সঙ্গে মারুফা আরও নিশ্চিত হয় যে এই প্রচণ্ড স্বাভাবিকতা, আত্মপ্রত্যয় পূর্বপরিকল্পিত অবশ্যই। অপরাধ করার আগে মানুষকে এমনই বিশ্বাসযোগ্য হাসতে হয়; এমন অসম্ভব স্বাভাবিকই থাকতে হয়, শিকারের আগে যেমনটা সব শিকারিই থাকে। মারুফা বুকের কাছে ব্যাগটা চেপে ধরে আরও সজোরে। সে জানে, দুটো পেন্সিলের সঙ্গে একটা তীক্ষ্ণ-চোখা কম্পাস আছে সেখানে। আছে উৎকট ঝাঁজালো পারফিউম; নিশ্চয় এর মধ্যে অ্যাসিড থাকবে; যা অনায়াসে পুড়িয়ে কিংবা গেলে দেবে বিপরীতে দাঁড়ানো মানুষটির কপালের নিচের সকৌতুক দুটি চোখ।
আরও কিছু বিকল্প প্রতিরোধ ভাবার আগে হঠাৎ এক মৃদু ঝাঁকুনিতে মারুফার হাইভোল্টেজ সন্দেহ কিছু সময়ের জন্য বিরতি পায়। চার আর পাঁচতলার মাঝামাঝি এসে চলন্ত লিফটটি থেমে আছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জেনারেটর ব্যাকআপ ফেল করার মতো বিরল যান্ত্রিক গোলযোগ নিশ্চয়ই একসঙ্গে ঘটতে পারে না। মারুফার প্যারানয়েড মন সিগন্যাল দেয়, ওপাশের দানবের মতো লোকটাই করেছে এসব। তাকে একা পাওয়ার পরিকল্পনা সফল হলো, খুব বিশ্রী কোনো ঘটনা ঘটাবেই আজ।
মারুফা ভাবতে থাকে, এক্ষুনি লোকটা ঝাঁপিয়ে পড়বে তার শরীরের ওপর। তার স্তন দলিত করবে, ঊরুতে বসাবে হিংস্র কামড়। অন্তর্বাস খুলে পড়ে থাকবে এক কোণে। জুতোর দু-পাটি একই স্থানে থাকবে না। মারুফা জানে, তার পানির তৃষ্ণা হবে খুব। শরীরের প্রতিটি পেশিতে থাকবে তীব্র ব্যথা। এরপর সময় নিয়ে লোকটা তাকে টোস্ট খাওয়াবে, কফি খাওয়াবে। সূক্ষ্ম কারুকাজের রুমাল দিয়ে যত্ন করে মুছে দেবে ঠোঁটে লেগে থাকা তার দুর্গন্ধযুক্ত আঠালো লালা। মারুফা চিৎকার করে ওঠে আতঙ্কে, ‘সরুন, কাছে আসবেন না! একদম না।’
কাওসার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। এমন করছেন কেন ভদ্রমহিলা? কী করেছে সে? কোনো অসতর্ক অশোভন কিছু তো ঘটেনি, তবে? পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের আলো জ্বেলে ভদ্রমহিলার স্পষ্ট মুখ দেখার চেষ্টা করে। দেখতে পায়, প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। অনবরত কাঁপছেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়েও দাঁড়াতে পারছেন না। কাওসার অভয় দেওয়ার জন্য নরম গলায় বলে, ‘ভয় পাবেন না, আমি দেখছি। পানি খাবেন একটু? আমার ব্যাগে ওয়াটার বটল আছে। দেব? আমি সিকিউরিটি ম্যানকে ফোনে ধরার ট্রাই করছি।’
কাওসারের এই নরম আশ্বাসে মারুফা আরও ভীত হয়ে ওঠে। তার কাছে মনে হয়, আবছা আলো-অন্ধকারে লোকটি এখন সুযোগ খুঁজছে কাছে আসার। সে নিজেকে আরও দেয়ালে লেপ্টে দিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে শুরু করে, ‘পানিতে কী মিশিয়ে এনেছেন আপনি? ব্যাগে আর কী আছে, ছুরি, কাঁচি, ক্লোরোফর্ম? ফেলুন এক্ষুনি, বার করুন বলছি। আর এক পা এগোলে সোজা খুন করে ফেলব।’
কাওসার ভয় পেয়ে সরে আসে। কী আবোলতাবোল বকছে। পাগল নাকি? তার দুশ্চিন্তা হয়, এটা মৃগীরোগ? নাকি স্কিৎজোফ্রেনিয়া? যদি ফেইন্ট হয়ে যায়। হায়, এই গোলযোগ সারতে কতক্ষণ লাগবে! এসব রোগ সম্বন্ধে তো কোনো ধারণাও নেই তার। সে ভদ্রমহিলাকে অভয় দিতে আর কী বলবে ভেবে না পেয়ে বলে বসে ‘নিশ্চয়ই গরম লাগছে আপনার? আমি বাতাস...’
পুরো বাক্য শেষ হওয়ার আগেই মারুফা ঝাঁপিয়ে পড়ে কাওসারের ওপর। তীক্ষ্ণ ধারালো নখের আঁচড়ে গালের মাংস কেটে দেয়। তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া হতভম্ব কাওসার প্রথমাবস্থায় আত্মরক্ষার শক্তিটুকুও খুঁজে পায় না। তার শিরদাঁড়া বেয়ে নামে তীব্র শীতল ভয়ের স্রোত। ছোটবেলায় কুমির দেখে শেষ এমন শিহরিত হয়েছিল। ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত দেখে তার নিজেরও প্যানিকড লাগে। কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কানে তালা লেগে যাওয়া চিৎকার থামাতে প্রথমে ভদ্রমহিলাকে চেপে ধরা ছাড়া আর কোনো বিকল্প উপায় খুঁজে না পেয়ে শেষাবধি তাই করে কাওসার।
ব্যস! ঠিক সেই মুহূর্তেই এক ঝটকায় লিফট সচল হয় এবং সোজা নিচতলায় গিয়ে ঠেকে। দরজা খুলতেই নিচের লাউঞ্জে দারোয়ানসহ বেশ কিছু মানুষের ভিড়। তারা মারুফার চিৎকারে এক হয়েছে। বাস্তবিক দৃশ্যটা তখন এমন, অগোছালো পোশাকের এক নারী কাঁপছে, আর ভয়ংকর চেহারার এক পুরুষ তার মুখ চেপে ধরে আছে। পুরুষটির শার্টের বোতাম ছেঁড়া, গালে টাটকা নখের আঁচড়। হাতের কবজিতে কামড়ের দাগ। উত্তেজিত সকলে কাওসারকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে আনে।
কেউ জানতে চাইল না কাওসার কী করেছে।
কেউ জানতে চাইল না, মারুফা কেন এইটুকু সময়ের মধ্যে এমন বিকট চিৎকার জুড়েছে।
সবাই জানতে চাইল অসভ্যতা কতটুকু ঘটেছে।
জগতের কেউ কিছু না জানলেও মারুফা জানে কেন সে এই লোকটাকে ভয় পেয়েছে, কেন তার চোখ এত ভীতিকর ঠেকেছে, কেন মনে হয়েছে ঠিক এই লোকটার হাতেই তার মৃত্যু। যে নিবিড় সত্যটুকু মারুফা প্রতিনিয়ত গোপন করেছে নিজের কাছ থেকে, নিজের পরিবার থেকে, এমনকি সমস্ত পৃথিবী থেকে, তা গোপনই থাক। ধাতস্থ হওয়ার পর লোকটার দুর্দশায় হঠাৎ এক পৈশাচিক তৃপ্তি হয় মারুফার। প্রতিশোধের আত্মতৃপ্তিতে নিজেকে বাহবাও দেয়। কিন্তু তার অবচেতন মন এক ফাঁকে শাসিয়ে যায়– ‘মারুফা, তুমি কি ঠিক করলে? এই কি সেই লোক? এত নির্দয় তুমি।’ মারুফা শুনতে চায় না নীতিবাক্য, না হোক এই লোক। তখন কি সে হুঁশে ছিল? কিন্তু এও তো সত্য, এমন চোখের কিংবা এমন কুচুটে হাসির একটা লোকই তো তাকে গান শেখাত, চোখে চোখে হাসতে থাকা এমন একটি মুখই তো একদিন তার শরীরের ওপর অতর্কিত চেপে বসেছিল। লোকটা তো অচেনা ছিল না।
লোকটি যদি তাকে চাইত প্রেমের পথে, মারুফা কি তার দাসখত লিখে দিত না মানুষটার চরণতলে? কিন্তু চায়নি সেই বিশ্রী লোকটা। অপমান করেছে তাকে। আজ শোধ তুলেছে তার। বেশ হয়েছে।
শ্বাস নেয় মারুফা জোরে। দুপুরের রোদ এসে লাগে চোখে। বাইরের তীব্র গরম হলকা ঝাপটা দিয়ে গেলেও মারুফা আর পোড়ে না। হ্যাঁ, সেই লোকটাই মারুফাকে এমন এক অন্ধকার ঘরে রেখে গিয়েছিল, যার কোনো দরজা ছিল না, ছিল না কোনো জানালা। কতদিন বন্দি ছিল, কত যুগ, তার হিসেব কেউ রাখেনি। কেউ তো জানলই না এরপর কেন সে কখনও ভোর দেখেনি, ঘাস দেখেনি, দেখেনি ফুল; আশ্চর্যের বিষয়, সেই মানুষটা তার সঙ্গে ঘটা পাশবিক ঘটনার পর তাকে টোস্ট বানিয়ে দিয়েছিল, কফি করে দিয়েছিল, খুব আলতো করে চুমুও খেয়েছিল। যেন একটা শরীরকে দলিত করা আর তার হাতে এক কাপ গরম কফি তুলে দেওয়া কিংবা ঠোঁটে আদুরে একটা চুমু খাওয়া একই নৈতিক জগতের দুটি স্বাভাবিক কাজ। আর সেই দিন থেকে মারুফার কাছে আতঙ্কের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি মৃত্যু নয়, পুরুষ।
তাই সময়ে-অসময়ে মারুফা যখন কাওসারকে কোমল-মানবিক রূপে দেখেছে, তার ভয় আরও বেড়েছে; কারণ তার কাছে কোমলতা কোনো নিরাপদ অঞ্চল নয়, কারণ কোমলতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে গভীর আদিম ছদ্মবেশ। এবং সে এও বুঝতে পারে যে পুরুষটি বারান্দায় গোলাপ ফোটাতে পারে, কাঠবিড়ালির ছানা হাতের তালুতে ঘুম পাড়াতে পারে, ব্যাংকের হিসাব শেষে যে পুরুষ ক্লান্ত শরীর নিয়ে বৃষ্টির গান শোনে, সুযোগ পেলে সেই পুরুষও ঐ পুরুষটার মতোই নির্দয় হবে– নিশ্চিত হবে, কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
এর পরের ঘটনা খুব দ্রুত এবং নির্মমভাবে ঘটে।
সেই মঙ্গলবার মোবাইলের স্ক্রিনে এক অচেনা তরুণ যুবকের প্রতি অপরিমেয় ঘৃণা ছড়িয়ে পড়েছিল বাতাসের বেগে। কিছু চোখে দেখা বাস্তবিক ভ্রান্তি অজস্র মানুষের দ্বারে পৌঁছেছিল অসীম দ্রুততায়। কিছু ভিডিও ক্লিপ, কিছু স্থিরচিত্র আর শিরোনামে যুক্ত কিছু যাচাইহীন শব্দ রাতারাতি দুটি জীবনের গল্পকে চিত্ররূপ দিয়েছিল পরস্পরের বিপ্রতীপ কোণে।  
জনতার আদালত কাউকে জানতেই দিল না, মারুফার আতঙ্কে যে মানুষটি ছিল, বাস্তবে সে মানুষটি আদৌ এই মানুষটি কি না।
কাওসারের ছবি ইন্টারনেটে ‘পটেনশিয়াল রেপিস্ট’ ট্যাগে চিরদিনের জন্য তালিকাভুক্ত হয়। ইতোমধ্যে তার ছোট বোনের বিয়ে ভেঙেছে। যে ফ্ল্যাটটি শখ করে কিনেছিল কাওসারের বাবা, প্রতিবেশী আর মালিক সমিতির চাপে বাধ্য হন সেটিও বাজারদরের চেয়ে অনেক কম মূল্যে বিক্রি করে দিতে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ‘নৈতিক স্খলন’-এর অভিযোগে কাওসারকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী; কারও সহানুভূতি থাকে না তার প্রতি। মিডিয়া ট্রায়ালের হেনস্তা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মধ্যরাতে তাকে ছুটে যেতে হয় চলন্ত ট্রেনে মাথা দেবে বলে। কিন্তু তাকে বাঁচতে হয়; আবার কোনো এক ধাতব কামরায় একা মারুফার মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাওসারকে বাঁচিয়ে রাখে। 
কয়েক মাস পরে, একই লিফটে আবার দাঁড়ায় তারা দুজন। কোনো অভ্যস্ততা বা আকস্মিক দুর্ঘটনায় নয়। মারুফা ডেকেছে। এই প্রথম তার কোনো পুরুষকে আমন্ত্রণ। স্রোত যেমন বিপুল তরঙ্গবেগে বয়, তেমনি ভাটাও আসে। এ কারণেই মামলা চলাকালীন কোর্টে শ্লীলতাহানির কোনো স্পষ্ট বয়ান বা প্রমাণ দিতে উপস্থিত হয়নি বলেই মামলা উইথড্র হয়ে কাওসার এখন মারুফার সামনে।
কাওসার কতবার ভেবেছে, একবার মারুফাকে একান্তে পেলে সত্যি সত্যিই ছিন্নভিন্ন করবে এই উদ্‌ভ্রান্ত মহিলার শরীর। তার মতোই ক্ষতবিক্ষত করবে মুখ। চোখ গেলে দেবে, কামড়াবে হাতের কবজি। জনসমক্ষে বিবস্ত্র করে গালাগাল দেবে। যে অভিযোগ তার গায়ে লেগেছে আজীবনের জন্য, সে অভিযোগের বাস্তবিক প্রমাণই হবে তার প্রতিশোধ। 
কিন্তু মারুফা সামনে আসার পর পাল্টে যায় সব। বিহ্বল লাগে তার ক্লান্ত চোখ দেখে, ভাবে, আহা! কত রাত ঘুমায় না এই উন্মাদ মহিলা? গালের হনু বসে গেছে। কাওসার আজও লিফটের স্বচ্ছ দেয়ালে নিজেকে দেখে। এখনও নিষ্পাপ, পবিত্রই আছে; অথচ বিপরীতে দাঁড়ানো মানুষটা আগের চেয়েও ভয়ংকর আর করুণ।
কাওসার তার গালের ম্লান আঁচড়টি স্পর্শ করে বলে, ‘আমার অপরাধ হয়তো এই যে, আমার মুখটা আপনার কাছে পার্ভার্ট ঠেকে। আমার অপরাধ হয়তো আপনার পাশের বাসাটাতেই থাকি আমি। আমার অপরাধ হয়তো আপনার প্রতি অসীম কৌতূহল এবং যা এখনও অবশিষ্ট আছে। কী করলে এমনটা হতো না, বলতে পারবেন? আমি বহুবার দেখেছি আপনিও আমাকে লুকিয়ে দেখেন, ঠান্ডা চোখে, কখনও বারান্দা থেকে, কখনও সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে। প্রথমটায় ভাবতাম, এটা হয়তো সম্ভাব্য প্রণয়ের প্রাকপ্রস্তুতি। খুব বেশি দিন তো হয়নি দুজনের দুজনকে দেখা। নিশ্চয়ই কৌতূহল। কিন্তু না, আমি ভুল ছিলাম। যে চোখকে ভেবেছি অপরিচয়, সে চোখ আসলে ঘৃণার। কিন্তু কেন? বলবেন আমায়?’
মারুফা কোনো উত্তর দিতে পারে না। তার গোপন ব্যথার জায়গাটা বলতে চাইছে খুব। যেন কাওসারকেই বলা দরকার, যেন তারই জানা অনিবার্য কেন তার অস্থি-চামড়ায়, হৃদয়ের প্রতিটি প্রকোষ্ঠে, ঘরের প্রতিটি দেয়ালে, বাইরের ইট-কাঠ-রাস্তায় ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গায় শুধু বিকৃত পুরুষের বাস। অফিসের যে ড্রাইভার তাকে অফিসে পৌঁছায়, মনে হয় সে বিকৃত; যে দারোয়ান তাদের ঘর পাহারা দেয়, তাকেও কামুক লাগে। লন্ড্রি থেকে কাপড় এনে দেওয়া লোকটাকে তো আরও কুৎসিত মনে হয়। তার কাছে ক্রিমিনাল তার অফিস কলিগ, পাড়া-প্রতিবেশী, এমনকি পথচারীও। ছায়ার আড়াল থেকে যেন সব ষড়যন্ত্রকারী পুরুষ তাকে অনুসরণ করে যায় ভোগের আয়োজনে; যে লোকটা অমন করেছিল, সে মানুষটা তো আপনই ছিল, কী চমৎকার গান গাইত। হৃদয়ভাঙা হাহাকার তৈরি হতো তার এক-একটি মুখনিঃসৃত বেদবাক্যে। লোকটার নাকি প্রিয় কবি ছিল জীবনানন্দ দাশ! অথচ তার কাছ পাওয়া উপহারে এখন তার এই বিকৃত-ভয়ংকর প্রতিশোধের জীবন। এ জীবনে প্রেম নেই, মমতা নেই, নেই ক্ষমা। মারুফা যেন জেনেই বসে আছে, তার জন্য কোনো স্বাভাবিক মৃত্যুও নেই। হয় নির্জনে শত্রুপক্ষীয় কোনো অতর্কিত আক্রমণে খুন, না হয় সুইসাইড; এই দুটোকেই ভবিতব্য করে দিয়ে যাওয়া লোকটা আশ্চর্য হলেও সত্যি, হুবহু কাওসারের মতোই ছিল। তার চোখও ছিল এমন দয়ার্দ্র, মানবিক। মারুফা দেখেছে, লোকটা কুকুরের জন্য কেঁদেছে, বন্যার্তদের জন্য একবার ডুবে মরতে বসেছিল, পথশিশুদের একটা স্কুলেও পড়াত নিয়মিত, অথচ সেই মানুষটি একটুও অনুতপ্ত হয়নি মারুফার সঙ্গে জবরদস্তির পর। এই নারীত্বের লজ্জা কাকে দেখাবে সে? 
মারুফার স্বগতোক্তি শুনতে না পেলেও কাওসারের ভেতর কিছু একটা হয়। ভদ্রমহিলার করুণ চোখের অতল সমুদ্রের অদৃশ্য ঢেউ তাকে স্পর্শ করে, ভাঙে কিছু একটা। কাওসারের কান্না পায়। হুহু করে ওঠে বুক। সে কি একবার জড়িয়ে ধরবে এই নিঃসঙ্গ মানুষটাকে? যদি ভুল বুঝে আবার চেঁচায়? নাহ, থাক। সংযত হয়ে হ্যান্ডরেলের ওপর একটি চাবির রিং রেখে বলে, ‘আমার বারান্দায় কয়েকটা গোলাপ গাছ রেখে এসেছি; দুটো কাঠবিড়ালির ছানাও। যদি কখনও মনে হয় ফুলকে বিশ্বাস করা যায়, যদি কখনও প্রাণকে আদর লাগে, নিয়ে যাবেন।
আরেকটা কথা– সব মানুষ এক হয় না, না মমতায়, না নিষ্ঠুরতায়। প্রতিটি মানুষই মৌলিক ও পৃথক; আপনার বা আমার মতোই।
লিফট এবার ওপরে উঠছিল।
মারুফার ছায়া পড়ে আয়নায়। সঙ্গে কাওসারের।
তাদের মাঝে মারুফা খোঁজে সেই পুরোনো বিষাক্ত মুখ। পায় না। মানুষের জন্য সবচেয়ে গভীর কারাগার হয়তো সেই জায়গা নয়, যেখানে তাকে বন্দি করে রাখা হয়, বরং সেই জায়গা, যেখানে একবার ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা তার স্মৃতির ভেতর এমনভাবে বাসা বাঁধে যে ভবিষ্যতের প্রতিটি মানুষকে সে অতীতের অপরাধী বলে চিনতে শুরু করে।
কাওসার লিফট থেকে নেমে যায়।
মারুফা থাকে।
দরজা বন্ধ হয়ে নিচে নামে লিফট। আবার ওপরে ওঠে।
এই ওঠানামায় মারুফা ক্লান্ত হয় না।
সে কোনো বোতাম চাপে না।
লিফটটা এরপর বহু সময় ধরে চলতেই থাকে এমন সিদ্ধান্তহীন, গন্তব্যহীন ও একা। কখন থামবে সময় জানা নাই কারও। 

আরও পড়ুন

×