শরতের অমল মহিমা
অলংকরণ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৯
উলুঝুলু শরতের মেঘ
আবিদ আনোয়ার
কখনও লিপিষ্টমনে নোনাধরা দেয়ালে তাকালে
অথবা যখন দেখি
শকুনেরা ডানা ঝাড়ে রক্তবর্ণ শিমুলের ডালে
তোমার চিত্রের চেয়ে বেশি দামি শিল্প চোখে পড়ে;
ছাঁটো এ রবীন্দ্র-দাড়ি–
অযথা ভড়ং কেন ঝোলা আর মলিন খদ্দরে?
আসলে তোমার চেয়ে প্রকৃত বাউন্ডুলে ওই শরতের মেঘ
ভেতরে কান্নায় ভেজা, চেপে রেখে তবু তার সমূহ আবেগ
বাউল স্বভাবে ঘোরে,
এবং এই ঔদাসীন্য তাকে শোভা পায়:
নীলের ক্যানভাসে দেখি
নিজেই চিত্রিত হয়ে
কী সহজে শিল্প হয়ে যায়!
তোমার ইজেলে কত রং ধরে জানি সেও হাঁড়ির খবর:
প্রকৃত জলের ছবি জলরঙে এঁকেছে কি কোনো চিত্রকর?
দেখেছি রোদেল দিনে মাঝে মাঝে গূঢ় কার তুলি
অনায়াসে এঁকে ফেলে অস্তরাগে বেজে-ওঠা রঙিন গোধূলি।
সোহেলীর ঠোঁট দেখে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিও হারাবেন দিশা:
হাসির বিশুদ্ধ কলা ওকে দেখে শিখে নেয় ব্যর্থ মোনালিসা!
শরৎ
ফারুক মাহমুদ
(উৎস: কালিদাস)
শরৎসুন্দরী আজ পরে আছে গাঢ় সাদা শাড়ি
কাশের আঁচল ওড়ে, হাসি যেন শিউলিসকাল
পুঁটির ঝাঁকের মতো চঞ্চলতা কটি-মেঘলায়
নির্জল মেঘের আলো ঝলোমলো ছায়া ফেলে আছে
আকাশের গোমড়া মুখ ঢেকে যায় নীল চাঁদোয়ায়
যথেষ্ট রঙিন রাত্রি। চাঁদ যেন স্তনের উচ্ছ্বাস
মোমের মুখের মতো গলে পড়ে জ্যোৎস্নার ফোঁটা
তারাঠোঁটে চাপা হাসি। রমণীরা আরও রমণীয়
আনন্দ শ্রেষ্ঠত্ব চায়। নির্বাসন রতিপ্রশমনে
ভাসুক হৃদয়তরী প্রেমময় আলিঙ্গনস্রোতে
শারদ-সায়াহ্ন
হাসান হাফিজ
মেঘনীল সংবেদন
শরতে উড়াল দিই এসো
চুর হয়ে সম্মোহনে
গোপনে মিথুন হোক
রৌদ্রতেজ মিইয়ে আসে
নিঃস্ব হতে সবাই কী ভালোবাসে
এক থোকা প্রশ্ন থেকে গেল।
ও বন্ধু শরৎ
তুমি কী মহৎ
এই সন্ত ঋতুডোরে
দেখেছি যে আলো আর
পৃথিবীর দয়াবন্ত মুখ
সেই সত্য কীভাবে এড়াই?
ভুলচুক হয়েছে প্রচুর
প্রস্থানও তাহলে হোক শরতেই
আপাতত বাঞ্ছা এই
অন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা জাগর নেই
শরৎ শরৎ
তুমি লগ্ন মনোলীলা
প্রাকৃতিক এবং বৃহৎ
আকাশে আগুনের মেঘ
মিনার মনসুর
বিশাল সংসার ছিল তাঁর– যেন এক শুভ্র মেঘের খামার। সব গেছে। তবু মেটেনি খাঁই। অদূরে গর্জমান ইটভাটার পাল। ধেয়ে আসছে বুলডোজার। বিপন্ন বিধবার মতো এক বস্ত্রে দাঁড়িয়েছেন এসে তুরাগের শিয়রের কাছে। ঝোড়ো হাওয়ায় সাদা পতাকার মতো উড়ছে শতচ্ছিন্ন শাড়িখানি তাঁর।
–কোথায় তুরাগ, প্রিয় ভাইটি আমার?
বুভুক্ষু বর্গিরা ঘিরে আছে তাকে। খুবলে খাচ্ছে হাড়-মাংস তার। আকাশে আগুনের মেঘ। দিগন্তজুড়ে বিসর্জনের হাহাকার, শুধু হাহাকার! তুরাগের আর্তনাদ পৌঁছে যায় ত্রিশূলীর কাছে।
সময় বদলে গেছে। ভাগ হয়ে গেছে মানচিত্র। ‘বোনের হৃদয়ও কি ভাগ হয়ে গেছে? ছিন্ন হয়ে গেছে রাখির বন্ধন?’ –গর্জে ওঠে ত্রিশূলী। তুঙ্গনাথ মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির মতো সক্রোধে বাজতে থাকে তাঁর হাত ও পায়ের শেকল। ভেঙে যায় হিমালয়ের ঘুম।
ভাদ্রের ঝোড়ো হাওয়ায় তখনও উড়ছিল শতচ্ছিন্ন সাদা শাড়িখানি তাঁর।
অর্জন, বিসর্জন
টোকন ঠাকুর
রাজহাঁস মেঘ
ওড়ে
কাশবন নদীপাড়ে প্রভাষণা করে
শরতেই তো জন্মেছিলাম, ভোরে
পটভূমিকা ছিল এমন মোহন বেশে
যেন বা শিউলিতলা দুধে যায় ভেসে
গ্রামের পরে গ্রাম
গ্রামের যমজ, নদী
মাঠের পাশেই বন
কার ভেঙেছে মন!
যার ভেঙেছে মন
তার ভেঙেছে মন
কোত্থাও কি থাকবে লেখা
কী আমাদের অর্জন আর
কীযে বিসর্জন!
কী যে শব্দ-বাক্য কোথায়
নিয়ে যাবে বলে আমায়
লিখতে বসায়
লেখায়, নেই তো ব্যাকরণ...
এক শরৎ দুই আকাশ
সাকিরা পারভীন
দু’টো আকাশের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান
দু’জাগাতেই নীলাকাশ সাদা মেঘের শুভ্রসান্তুর
ঝকঝকে রোদ্দুর বিলাবল
শুধু একটিতে
কার যেন গন্ধ লেগে আছে!
তোমাকে জিজ্ঞেস করি হে নটরাজ
বলো দেখি কার গায়
সেই দুর্নিবার ঘনজুঁই বিপুল বিস্তারে
যার সহস্র গমক এসেছে মহামারি সবুজ কামড়ায়
রক্ত লাল রক্ত বয় যার মোহনায়
এ-নাদান কার কথা কয়?
এত অভিমানী এত ক্ষরস্রোতা গান যার স্বরে
তার কন্ঠ থামাতে পারেনা কেউ কেউ নয়
বলো দেখি কার কথা কোন আকাশের
একই সে নীলের বিছানায় যে বুনেছে গহন নহবত
নেপোলস্ কিংবা কলোসিয়াম অথবা নেরুদা’র নয়
সে আকাশ কেবল আমার
কলিজার আয়নায় রংবাজি করে
দূরতম দূরে ছুঁড়ে ফেলে এসেছি যারে সেই
নিশিদিন ধমকায় বলে তোমার চোখ
আমি কেটে দিয়েছি দূর্গার বুকে
অপু ছাড়া আর কেউ ছুঁতে পারে না যেই সাদা হাঁস
সেই তোমাকে কি করে নেবে অন্য কোনো গ্রামে
যে উঠোনে তোমার পতাকা নাই
তোমার দেশ নাই তোমার আকাশ
নাই বাংলাদেশ
কোনোদিন সে আকাশে আর যাই হোক শরৎ আসেনা যথাযথ।
বুঝেছ নটরাট এইবার
বুঝে নাও তবে ফারাকের নুন্যতম বিবরণ
খুঁজে নাও কার প্রিয় গন্ধ লেগে আছে গায়।
প্রতিপক্ষ
মাহী ফ্লোরা
গন্ধের বড়ি খেয়ে রোদ নেমেছিল আমাদের ঢোল খাওয়া বাড়ির চাতালে। একটা ঠ্যাং ভাঙা গরুর গাড়ি সেই কবে থেকে যে কোনায় পড়ে থেকে কাৎরায়। আমি আর বুলু রোজ হাতে গাদাখানেক বরইয়ের আচার নিয়ে বসে থাকি। আচারের তেল ঝরে পড়ে। আগে পা ঝুলিয়ে বসা যেত এখন ভয় করে। একদিকের চাকা ভেঙে গেছে। শরতের বিকেলে কেমন মিঠে আমতার মতো লাগে রোদের আলোকে। বুলুর নীল রঙের স্যান্ডেলে ছোপ ছোপ রোদ লেগে থাকে। রোদ্দুর ফুল হয়ে দোলে। দড়ির দোলনা হয়ে ঝুলে। ঘন জামের পাতার ভেতর দিয়ে বৌচুরি খেলে রোদ। প্রতিপক্ষ আমরা।
কই! আচারের ভাগ নিয়ে তো আমাদের মন কষাকষি হয় না।
- বিষয় :
- কবিতা