ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিল্পের ভেতর গণতন্ত্রের পাঠ

শিল্পের ভেতর গণতন্ত্রের পাঠ
×

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কাকটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হতে পারে, সে বুঝি কোনো ছবির ভেতর বসে নেই। বসে রয়েছে আমাদের শহরের কোনো এক চেনা ভাঙা দেয়ালের কার্নিশে। একটু দূরের দেয়ালে নীল-সবুজের ভেতর ভেঙে যাচ্ছে চেনা কোনো ভূদৃশ্য। 
গ্যালারির দেয়ালে পাশাপাশি থাকা এসব ছবির মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্কটি তৈরি করে দর্শকের চোখ। একটি ছবি থেকে আরেকটিতে যেতে যেতে চোখ কখনও মানুষের কাছে ফিরে আসে, কখনও প্রকৃতির কাছে, কখনও নিজেরই ভেতরে।
এই দেখার অভিজ্ঞতাই ‘আর্ট ডেমোক্র্যাটিক’-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। উত্তরার গ্যালারি কায়ায় অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত ১৪ শিল্পীর ৮১টি শিল্পকর্ম যেন ৮১টি আলাদা জানালা। প্রতিটি জানালা দিয়ে দেখা যায় পৃথিবীর ভিন্ন একটি দৃশ্য; অথচ শেষ পর্যন্ত সব দৃশ্যই এসে মেশে মানুষের অভিজ্ঞতায়। এম.এফ. হুসাইনের মানুষের ভিড়, নিতুন কুন্ডুর ভাঙা-গড়া প্রকৃতি, রফিকুন নবীর প্রাণী-পাখি কিংবা রামকিঙ্কর বেইজের তীব্র রেখা। কোথাও মানুষ সরাসরি উপস্থিত, কোথাও অনুপস্থিত থেকেও তার ছায়া রেখে গেছে। গত ৩১ আগস্ট শেষ হওয়া এই আয়োজনের দেয়াল থেকে ছবিগুলো নেমে যাওয়ার পরও প্রশ্নটি থেকে যায়। আমরা যে পৃথিবী দেখি, তা কি সত্যিই বাইরের পৃথিবী, নাকি নিজের ভেতরের পৃথিবীরই প্রতিচ্ছবি? ‘আর্ট ডেমোক্র্যাটিক’ নামটির দিকে দ্বিতীয়বার তাকালে প্রদর্শনীর ভেতরের একটি দার্শনিক সূত্র ধরা পড়ে। গণতন্ত্রের একটি মৌলিক সৌন্দর্য হলো–সেখানে একই সত্যের একাধিক পাঠ থাকতে পারে। কেউ কথা বলবেন রেখায়, কেউ রঙে। কেউ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াবেন, কেউ তাকে ভেঙে দেবেন বিমূর্ততার ভেতর। কেউ মানুষের ভিড় আঁকবেন, কেউ একটি কাক কিংবা ছাগলের শরীরে মানুষের গল্প খুঁজবেন। প্রদর্শনীতে এই ভিন্নতার জন্য কোনো একটি ভাষাকে অন্যটির ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।
শিল্পীদের তালিকায় যেমন প্রজন্মের দূরত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিল্পভাষার বিস্তর পার্থক্য। অজিত শীল, আনিসুজ্জামান, যোগেন চৌধুরী, কে.জি. সুব্রামানিয়ান, কালিদাস কর্মকার, কামরুজ্জামান সাগর, মকবুল ফিদা হুসেন, মাহমুদুল হক, নাগরবাসী বর্মণ, নিতুন কুন্ডু, রফিকুন নবী, রামকিঙ্কর বেইজ, সনৎ কর ও শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাজ এখানে একই প্রদর্শনী-পরিসরে এসে দাঁড়িয়েছে।
যেন এটি শুধু শিল্পকর্ম দেখার আয়োজন নয়, একই সঙ্গে সময়ের সঙ্গে সময়ের দেখা হওয়ার ঘটনাও। একটি কাজ হয়তো তৈরি হয়েছিল বহু বছর আগে, কিন্তু দর্শকের চোখে তার বর্তমান তৈরি হয় আজ। শিল্পকর্মের এ এক অদ্ভুত জীবন। শিল্পী যখন কাজটি শেষ করেন, তখন তার একটি জন্ম হয়; আর প্রত্যেক নতুন দর্শকের সামনে দাঁড়ালে তার আরেকটি জন্ম ঘটে।
এম. এফ. হুসাইনের ‘১০০% লিটারেসি (কেরালা)’-র সামনে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে মানুষের সমাবেশ। বই, শরীর, হাত, চলাচল–সবকিছু মিলে ছবিটি যেন স্থির হয়েও গতিশীল। শিক্ষার মতো একটি বিষয় এখানে নিছক তথ্য বা স্লোগান হয়ে থাকে না; তা মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়।
মানুষ একা বাঁচে না। তার পরিচয় তৈরি হয় অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভেতর। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ভাষা, স্মৃতি–সব মিলিয়ে সে নিজের একটি ‘আমি’ নির্মাণ করে। হুসাইনের ছবির ভিড় তাই কেবল অনেক মানুষের উপস্থিতি নয়। সেখানে একটি সমাজের স্বপ্নও পড়া যায়। আবার ‘ফিশ অ্যান্ড বানানা (কেরালা)’-তে দৈনন্দিন জীবনের মাছ, কলা, মানুষ ও নানা অবয়ব এক অদ্ভুত প্রাণময়তায় পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে। পরিচিত জিনিসগুলো এখানে পরিচিত থেকেও অপরিচিত।
অন্যদিকে, নিতুন কুন্ডুর ‘আনটাইটেলড-১’ ও ‘আনটাইটেলড-২’ কাজ দুটির সামনে এসে বাস্তব পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে বিমূর্ত হয়ে যায়। নীল, সবুজ, হলুদ ও নানা রেখার স্তর একসঙ্গে মিলে প্রকৃতির এক অজানা ইঙ্গিত তৈরি করে। বিমূর্ত শিল্পের সামনে দাঁড়ানো আসলে নিজের মনের সামনে দাঁড়ানোর মতো। একটি নির্দিষ্ট গাছ বা পাহাড় না থাকায় দর্শক নিজের স্মৃতি থেকে তা নির্মাণ করেন। সম্ভবত শিল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই যে, শিল্পী ছবি তৈরি করেন, কিন্তু তার চূড়ান্ত অর্থের মালিক একা শিল্পী থাকেন না।
রফিকুন নবীর ‘গোট অ্যান্ড দ্য বার্ডস’ ও ‘দ্য ক্রো’ ছবি দুটিতে লোকজ জীবনের পরিচিত উপাদান অন্য অর্থ তৈরি করে। স্থির ছাগল আর চঞ্চল পাখির সম্পর্কের মধ্যে ফুটে ওঠে সহাবস্থান ও নির্ভরতা। আর সাদা কাগজের ওপর কালো রেখায় আঁকা একা বসে থাকা কাকটি মনে করিয়ে দেয় শহুরে জীবনের নিঃসঙ্গতা।
আবার রামকিঙ্কর বেইজের কাঠখোদাই কাজের তীব্র রেখায় ফুটে ওঠে প্রকৃতির শক্তি, শ্রম ও মানুষের আদিম সংঘাত। রামকিঙ্করের শিল্পের দিকে তাকানোর সময় মানুষের শরীরের সঙ্গে মিশে থাকে মাটি ও জীবন-সংগ্রাম।
প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মাধ্যমের বৈচিত্র্য। কাঠ খোদাইয়ের রুক্ষ রেখা, লিথোগ্রাফের টেক্সচার আর সেরিগ্রাফের রঙিন স্তর–মুদ্রণশিল্পের এই বৈচিত্র্য দর্শকের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে। কাগজের ওপর রেখার চাপ, ফাঁকা সাদার ব্যবহার কিংবা কালোর ঘনত্ব–এসব সিদ্ধান্তের নীরব অংশগুলোও শিল্পের ভাষাকে সোচ্চার করে তোলে।
মানুষ পৃথিবীকে শুধু চোখ দিয়ে দেখে না, দেখে স্মৃতি, ভয় ও অভিজ্ঞতা দিয়ে। দর্শক তাঁর নিজের ভেতর থেকে কিছু না কিছু নিয়ে গিয়ে ছবির ওপর বসিয়ে দেন। ‘আর্ট ডেমোক্র্যাটিক’ প্রদর্শনীটি শেষ পর্যন্ত এই সহাবস্থানের ধারণাকেই উদযাপিত করেছে। বাস্তবতার সঙ্গে বিমূর্ততা, মানুষ ও প্রাণী, রুক্ষ রেখা ও কোমল রং–কেউ কাউকে সরিয়ে না দিয়ে পাশাপাশি অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
দেয়াল থেকে ছবিগুলো নেমে গেছে সত্যি, কিন্তু ৮১টি শিল্পকর্মের মাধ্যমে তৈরি হওয়া অনুভূতিগুলো দর্শকের মনে নিজস্ব স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে। হয়তো শিল্পের গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত এটুকুই যে, অন্যের দেখা পৃথিবীকে অস্বীকার না করে, তার পাশে নিজের দেখা পৃথিবীটিকেও জায়গা করে দেওয়া। 

আরও পড়ুন

×