ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমার জাদুঘর

আমার জাদুঘর
×

ওরহান পামু [জন্ম: ৭ জুন ১৯৫২]

ওরহান পামুক

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ একই সঙ্গে একটি উপন্যাস এবং আমার তৈরি করা বাস্তব জাদুঘর। উপন্যাসের গল্পটি এমন এক মানুষকে নিয়ে, যে তার এক দূরসম্পর্কের বোনের প্রেমে গভীরভাবে মগ্ন। এই প্রেমের পরিণতি সুখকর হয় না, তাই প্রেমিকার স্পর্শ পাওয়া প্রতিটি জিনিস সে সংগ্রহ করতে শুরু করে। এমন সব কিছু, যা তাকে সেই মেয়েটির কথা মনে করিয়ে দেয়, তাদের সুখের দিনগুলোর স্মৃতি বহন করে। মেয়েটি একদিন হারিয়ে যায়। প্রায় ৩৫ বছর ধরে জমানো সেইসব সংগ্রহ নিয়েই গড়ে ওঠে একটি জাদুঘর। ইস্তাম্বুলে আমার হাতে গড়া এই বাস্তব জাদুঘরটির দরজা খুলে দেওয়া হয় ২০১১ সালে। সত্যি বলতে, আমার পরিকল্পনা ছিল যেদিন উপন্যাসটি প্রকাশিত হবে, ঠিক সেদিনই জাদুঘরটিও উদ্বোধন করব। জাদুঘর আর উপন্যাসের মধ্যকার সম্পর্কটা এমন হওয়ার কথা ছিল, যেন উপন্যাসটি জাদুঘরের একটি টীকাযুক্ত ক্যাটালগ হিসেবে কাজ করে। আর এই টীকাগুলো এমনভাবে কালানুক্রমিকভাবে সাজানো থাকবে, যাতে আপনি এটি একটি উপন্যাসের মতোই উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু জীবনে যেমনটা হয় আর কী! আমি আমার স্বভাবসুলভ ধীরগতিতেই উপন্যাসটি লিখে শেষ করেছিলাম। মেয়েটির স্মৃতিবিজড়িত সব সংগ্রহই আমার কাছে ছিল, কিন্তু দেখা গেল ছুতোর মিস্ত্রি ঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে পারছে না, কিংবা রংমিস্ত্রি দেরি করছে। ফলে জাদুঘরটি পুরোপুরি প্রস্তুত করে চালু করতে আমার আরও চার বছর সময় লেগে যায়।
ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমি একটা সফল উপন্যাস লেখার পর তার ওপর ভিত্তি করে জাদুঘরটি বানিয়েছি। জাদুঘর চালুর প্রায় ২০ বছর আগেই আমি পুরো প্রকল্পটির কথা ভেবেছিলাম। এমন একটি উপন্যাস যা নিজেই একটি জাদুঘর হিসেবে কাজ করবে; যা কেবল গল্পকে দৃশ্যমান করবে না, বরং বিভিন্ন বস্তুর মধ্য দিয়ে একই গল্প বলে যাবে। জাদুঘরটি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে এর পেছনে নিজের পকেট থেকে আর কোনো টাকা ঢালতে হচ্ছে না। কোনো সরকার, প্রতিষ্ঠান বা ফাউন্ডেশন আমাদের কোনো অনুদান দেয় না। স্রেফ দর্শনার্থীদের টিকিট বিক্রির টাকায় জাদুঘরটি চলছে। সম্ভবত এই খ্যাতির কারণেই আমাকে জাদুঘরের জিনিসপত্র নিয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর আয়োজন করতে বলা হয়েছিল। জাদুঘরে ৮২টি কাচের শোকেস বা ভিট্রিয়েন রয়েছে, যার প্রতিটি উপন্যাসের একেকটি অধ্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসের চরিত্ররা যেসব জিনিস ব্যবহার করেছে বা যেসব জিনিস নিয়ে কথা বলেছে, সেগুলোই শিল্পকর্ম হিসেবে ওই শোকেসগুলোতে সাজানো আছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে যখন উপন্যাস লেখা শুরু করি, তখন আমার লক্ষ্য ছিল পুরোনো ঘরানার একজন রোমান্টিক লেখক হওয়া। রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো আমার উদ্দেশ্য ছিল না। বায়ান্ন বছর আগে আমি ভাবতাম, ল্য করবুসিয়ারের মতো একজন স্থপতি ও চিত্রশিল্পী হব। তিনিই ছিলেন আমার জীবনের আদর্শ। কিন্তু হুট করেই আমি স্থাপত্যবিদ্যা আর ছবি আঁকা ছেড়ে দিলাম। 

এরপর একজন রোমান্টিক চিত্রশিল্পীর মতোই প্রবল উৎসাহ নিয়ে আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি। শুরুতে আমি কেবল তুর্কি পাঠকদের জন্যই লিখতাম। কিন্তু উপন্যাস লেখার ২৫ বছর পর হঠাৎ করেই আমি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি পেয়ে গেলাম। তখনই তুরস্কের রূঢ় রাজনীতি আমার সেই রোমান্টিক কল্পনা আর স্বপ্নময় জীবনে ব্যাঘাত ঘটাল। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পাওয়ার পর সবাই আমার কাছে শুধু বিভিন্ন পিটিশনে সই-ই চাইতে থাকল না, তুরস্কের রাজনীতি নিয়েও আমার মন্তব্য দাবি করতে লাগল। এটাই আমাকে বিপদে ফেলে দিল, আমাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাল। আমাকে এখনও দেহরক্ষী নিয়ে চলতে হয়। ‘স্নো’ উপন্যাসটি লেখার আগে আমি নিজেকে বলেছিলাম, যেহেতু আমি এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এবং আমাকে নানা ধরনের রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে, তাহলে আমি একটি নিখাদ রাজনৈতিক উপন্যাসই কেন লিখছি না? ভেবেছিলাম, সাংবাদিকরা যত রাজনৈতিক প্রশ্ন করেন, এই স্নো হবে তার মোক্ষম জবাব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেশ কিছুদিনের জন্য সেটাই আমার সবচেয়ে বিখ্যাত বইয়ে পরিণত হলো। ফলে আমার যতটুকু প্রাপ্য, তার চেয়েও অনেক বেশি আমি একজন ‘রাজনৈতিক লেখক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেলাম।
‘স্নো’ লেখা শেষ করার পর আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর কখনোই রাজনৈতিক উপন্যাস লিখব না। সাংবাদিকরা হয়তো ভেবেছিলেন, এর জন্য আমাকে অনেক ভুগতে হয়েছিল। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। আমি মোটেও কষ্ট ভোগ করিনি। বহু মানুষ কষ্ট পেয়েছেন, তাদের জেল খাটতে হয়েছে। তুরস্কে আমার সাংবাদিক বন্ধুদের যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সে তুলনায় আমার সমস্যাগুলো ছিল একেবারেই তুচ্ছ। তবে শেষমেশ ‘নাইটস অব প্লেগ’-এ আমি আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসি। এই উপন্যাসটিকে জাতীয়তাবাদ ধারণার একটি বিশ্বকোষীয় বিশ্লেষণ বলা চলে। আমার নিজের কল্পনায় তৈরি ভূমধ্যসাগরের একটি ছোট্ট দ্বীপে জাতীয়তাবাদের ধারণা কীভাবে জন্ম নেয়, টিকে থাকে এবং বিকশিত হয়– তা-ই এখানে দেখানো হয়েছে। দ্বীপটির নিজস্ব একটি অদ্ভুত ভাষা রয়েছে, আর সেখানকার জাতীয়তা, জাতিসত্তা এবং পরিচয়ের ভিত্তিই হলো সেই কাল্পনিক ভাষা। আসি ‘মিউজিয়াম’ প্রসঙ্গে। যখন আমরা জাদুঘর বা বস্তুর কথা বলি, মানুষ সব সময় সেটাকে দামি আর অভিজাত জিনিসের সাথে মিলিয়ে ফেলে। যেমনটা দেখা যেত ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকের ‘ক্যাবিনেট অব কিউরিওসিটিস’-এর ক্ষেত্রে; যা ছিল মূলত আজকের আধুনিক জাদুঘরগুলোর শুরুর দিকের রূপ।
কিন্তু আমার ‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ আমাকে শিখিয়েছে যে, এমন একটি জাদুঘরও তৈরি করা সম্ভব, যেখানে শুধু সস্তা, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এবং এমন সব সাধারণ জিনিস থাকবে, যা আমরা সাধারণত হেলায় ফেলে দিই। একটা জাদুঘর তখনই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যখন সাধারণ যে কোনো কিছু– হোক তা সিগারেটের টুকরো, একটা পুরোনো টিকিট কিংবা ফেলে দেওয়া সামান্য একটা টিস্যু পেপার– একটি বেদির ওপর, ফ্রেমে বা কাচের ভেতর অন্য জিনিসের পাশে পরিপাটি ও সুশৃঙ্খলভাবে রাখা হয়। সঠিক আলো আর আবহ তৈরি করতে পারলে হঠাৎ করেই সেই তুচ্ছ জিনিসগুলোর একটি নতুন আভা, একটি নতুন অর্থ তৈরি হয়। ‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ আমাকে বস্তুর এই ‘আভা’ বা অন্তর্নিহিত শক্তির সঙ্গে পরিচিত করেছে। আপনি যখন কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগ দেবেন, সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজাবেন, তখন সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার কাছে একটি গল্প বলতে শুরু করবে। ‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’-এর গঠন ও নির্মাণের পেছনের মূল ভাবনা এটিই। সেই সাথে রয়েছে বস্তুর কালহীনতা। জাদুঘরে আমরা সেই কালহীনতার অনুভূতি লাভ করি। ইমানুয়েল কান্টের দুটি ক্যাটেগরির কথা বলতে চাই। জাদুঘর হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে সময় রূপান্তরিত হয় শূন্যস্থানে বা স্পেসে। আপনি যখন জাদুঘরে হাঁটেন, তখন সময়ের এক ধরনের কৃত্রিম, নতুন অনুভূতি টের পান। বস্তুর চারপাশ দিয়ে হাঁটার সময় আপনার শরীর তা আবিষ্কার করতে পারে। সামগ্রিক বিন্যাসটাই একে অর্থবহ করে তোলে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে জাদুঘরগুলো অনেকটাই উপন্যাসের মতো। আমরা ছোট ছোট অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ের মুখোমুখি হই ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে এর সামগ্রিক গঠন ও অন্তর্নিহিত বোধটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

আরও পড়ুন

×