ক্ষত ও আলোর মানচিত্র
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
লোহার পাতে আগুনের তাপ পড়লে যে তীব্র গন্ধ আর ঝাঁঝ ছড়ায় তা কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গ্যালারির দেয়ালে সহজে ধরা পড়ে না, অথচ লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে ঢুকলেই মনে হয়, এখানে নীরব কারখানার দীর্ঘশ্বাস থমকে আছে। চারপাশের ভাস্কর্য, ধাতুর খসখসে পৃষ্ঠ, ওয়েল্ডিংয়ের পোড়া দাগ আর আলো-ছায়ার খেলা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক পরিসর যেখানে সৌন্দর্যের শরীরে লেগে আছে শ্রম, ক্ষত ও জীবনের রূঢ়তা। কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমানের বিন্যাসে ভাস্কর তৌফিকুর রহমানের একক প্রদর্শনী ‘লাইন-ফর্ম-ব্যালেন্স’ (রেখা-গড়ন-স্থিতি) তাই কোনো গতানুগতিক সৌন্দর্য পরিবেশন করে না। লোহা ও ইস্পাতের কাটাকুটির মধ্য দিয়ে এটি সময়ের ক্ষত, ক্লান্তি এবং বেঁচে থাকার ব্যাকুলতাকে দর্শকের সামনে দাঁড় করায়।
আন্তর্জাতিক শিল্পের ইতিহাসে লোহা ও ইস্পাত যখন আধুনিক ভাস্কর্যের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে, তখন স্প্যানিশ ভাস্কর হুলিও গোনসালেস ও আমেরিকান ভাস্কর ডেভিড স্মিথ ঝালাই করা ধাতুর রেখা, ভর ও শূন্যতার ভেতর নির্মাণ করেন ভাস্কর্যের নতুন ভাষা। অন্যদিকে আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের শীর্ণ, নিঃসঙ্গ মানবঅবয়বে ধারণ করেন মানুষের ভঙ্গুরতা, বিচ্ছিন্নতা ও অস্তিত্বগত উদ্বেগ। ফলে ধাতু ও আধুনিক ভাস্কর্য কেবল নতুন নির্মাণপ্রযুক্তির সম্ভাবনাই উন্মোচন করেনি। তা হয়ে উঠেছিল আধুনিক মানুষের অভিজ্ঞতা, ভঙ্গুরতা ও অস্তিত্বের নানা সংকট প্রকাশেরও শক্তিশালী মাধ্যম।
তৌফিকুর রহমান সেই আন্তর্জাতিক ধাতব ওয়েল্ডিং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ভাষাকে আত্মস্থ করেছেন নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বিএফএ এবং ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সালে বেইজিংয়ের সেন্ট্রাল একাডেমি অফ ফাইন আর্ট থেকে এমএফএ সম্পন্ন করা এই ভাস্কর বিশ্বশিল্পের এই ধারাকে গভীরভাবে ধারণ করেছেন। তবে তাঁর শিল্পভাষা নিছক আন্তর্জাতিক কোনো প্রবণতার অনুসরণ নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে তাঁর নিজের জীবন ও বেড়ে ওঠার স্মৃতি।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাস্কর্য চর্চা করা তৌফিকুর রহমানের শৈশব কেটেছে তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। সেখানে মাটির দলার বদলে তাঁর হাত খেলেছে ধাতুর পাতের কাটা টুকরো নিয়ে। ফলে কারখানার লোহা বা ইস্পাত তাঁর কাছে কোনো শীতল, বস্তুনিরপেক্ষ মাধ্যম নয়। সেটি অতি পরিচিত এক জীবনের স্মারক। শিল্পের উপাদান আর ব্যক্তিগত স্মৃতির এই সংযোগই তাঁর কাজকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
তৌফিকুর রহমানের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর নিজ হাতে ধাতু নিয়ে কাজ করা। কোনো সহায়কের ওপর নির্ভর না করে তিনি অগ্নিশিখা আর হাতুড়ি নিয়ে ধাতুর সঙ্গে লড়াই করেন। লোহার কঠিন প্রতিরোধ ভেঙে তাকে পিটিয়ে বাঁকানো, ওয়েল্ডিংয়ের এবড়োখেবড়ো দাগ রেখে দেওয়া-এসব তাঁর কাছে শুধু নির্মাণপ্রক্রিয়া নয়,ধাতুর শরীরে নিজের শারীরিক ও মানসিক উপস্থিতি খোদাই করারও এক প্রক্রিয়া।
প্রদর্শনীর ভাস্কর্যগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, তৌফিকুর রহমানের কাছে ধাতু নিছক নির্মাণের উপকরণ নয়। এগুলো।এর নিজস্ব কঠোরতা, ওজন, রেখা ও ক্ষতই তাঁর শিল্পভাষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই ভাষায় কখনও জীবনসংগ্রাম মূর্ত হয় মাতৃত্বে, কখনও মুক্তি ও বন্দিত্বের দ্বন্দ্বে, কখনও কবিসত্তার অন্তর্গত বিষাদে, আবার কখনও শ্রমজীবী মানুষের শরীরী গতিতে। ফলে কাজগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অবয়বের সমষ্টি না হয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এক মানবিক ও অস্তিত্ববাদী পরিসর তৈরি করে।
এর একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ হলো ‘মাদারহুড’ ভাস্কর্যটি। ওয়েল্ডেড স্টিলে তৈরি ৯৮ সেন্টিমিটার উচ্চতার এই ভাস্কর্যে শক্ত লোহার পাতকে বাঁকিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ছাগল-জননীর অবয়ব। যেন শিল্পীর দৃষ্টিতে এটি কেবল একটি প্রাণীর শরীরের পুনর্নির্মাণ নয়। ধাতুর কঠোরতা ও মাতৃত্বের কোমলতার মধ্যে যে আপাত বৈপরীত্য, কাজটি তার মধ্যেই তৈরি করে নিজস্ব নাটকীয়তা। শক্ত ও ধারালো ধাতব পৃষ্ঠের ভেতর অনিশ্চিত জীবনসংগ্রামের ব্যাকুলতা এবং পরম চঞ্চলতা যেন একসঙ্গে অবস্থান করে। ফলে মাতৃত্ব এখানে নিছক মমতার প্রতীক না হয়ে হয়ে ওঠে উদ্বেগ, সুরক্ষা ও টিকে থাকার এক সক্রিয় অস্তিত্ব।
এই জীবনবোধই অন্য মাত্রা পায় ‘বার্ড বিং’ ভাস্কর্যে। ‘মাদারহুড’-এ যেখানে শরীরের ভেতর জীবনরক্ষার তাগিদ, সেখানে এই কাজে শরীর যেন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও বন্দিত্বের দ্বন্দ্বের বাহন। পাখির স্বাভাবিক উড়ে বেড়ানো এবং মানুষের চার দেয়ালের বন্দিত্ব এখানে এক শংকর রূপে মিলেছে। রডের রৈখিক বিন্যাসে স্প্যানিশ ভাস্কর হুলিও গোনসালেসের ধাতব রেখা-নির্ভর ভাস্কর্যভাষার কথা মনে পড়ে। তবে এই রৈখিকতা নিছক আকার নির্মাণে থেমে থাকে না। উন্মুক্ত ও আবদ্ধ পরিসরের পারস্পরিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এটি তৈরি করে এক মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। ফলে পাখি এখানে কেবল পাখি নয়-মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যবর্তী এক মানসিক অবস্থারও প্রতীক।
শরীর, অস্তিত্ব ও অন্তর্গত অনুভূতির এই অনুসন্ধান আরও গভীর হয়ে ওঠে ‘এটার্নাল পোয়েট’ এ। রবীন্দ্রনাথের অন্তর্মুখী কবিসত্তাকে ভিত্তি করে দীর্ঘ নয় বছর ধরে গড়ে তোলা এই ভাস্কর্যে শিল্পী অবয়বের চেয়ে অনুভূতির আবহ নির্মাণে বেশি মনোযোগী। ওয়েল্ডিংয়ের পোড়া পোড়া টেক্সচার এবং আলো-ছায়ার বিন্যাস রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তাকে সরল প্রতিকৃতির বাইরে নিয়ে যায়। সেখানে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এক ধরনের অসীম বিষাদ ও তৃষ্ণা। ধাতুর পোড়া দাগ যেন সময়েরও দাগ।যা কবির অন্তর্জগতকে একটি স্থির অবয়বের বদলে চলমান অনুভূতিতে রূপ দেয়।
আবার ‘ডুয়াল বিং’ এর দিকে তাকালে তৌফিকুর রহমান যে শরীরের সঙ্গে শ্রম ও গতির ধারণা যুক্ত করেছেন তা বোঝা যায়। ১৬৮ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এই কাজটিতে নারীর শ্রমজীবী হাত এবং কাজের গতিকে ধাতুর সচল বাঁকে ধারণ করা হয়েছে। এখানে লোহার ভার আর শরীরের গতিশীলতার মধ্যে তৈরি হয় একটি আকর্ষণীয় দ্বন্দ্ব। ভারী ধাতু যে একই সঙ্গে গতিশীলতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে, কাজটি তারই দৃষ্টান্ত। এর ফলে ভাস্কর্যটি শুধু নারীর শ্রমের উপস্থাপন নয়। যেন এটি বস্তু ও শরীর, স্থিরতা ও গতি-এই দুই বিপরীত অবস্থার মধ্যকার সম্পর্কও অনুসন্ধান করে।
এই ভাস্কর্যভাষারই আরেকটি বিস্তার দেখা যায় প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ড্রয়িংগুলোতে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘হাইব্রিড রিয়েলিটি’ সিরিজে মানুষ, পাখি ও পশুর শরীরের টুকরোগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি করেছে এক জৈবিক রূপক। এখানে পরিচিত শরীর ভেঙে গিয়ে নতুন এক সত্তার জন্ম নেয়। মানুষ ও প্রাণীর সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে শিল্পী যেন বাস্তবতার প্রচলিত কাঠামোকেই প্রশ্ন করেন। শরীর তখন আর একক কোনো পরিচয়ের বাহক থাকে না।সেগুলো নানা অস্তিত্বের সংমিশ্রণে নির্মিত এক পরিবর্তনশীল সত্তায় পরিণত হয়।
এর বিপরীতে ‘আনস্পোকেন ডার্কনেস’ সিরিজ আরও সরাসরি অন্ধকার ও সহিংসতার দিকে তাকায়। প্রথাগত তুলি ব্যবহার না করে লোহার তার ও পেপার রোলার দিয়ে তৈরি করা এই ড্রয়িংগুলোর কালো ছোপ এবং হঠাৎ উন্মোচিত সাদা রেখার মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের টানাপোড়েন। কালোর ঘনত্ব যেমন ভীতি ও ক্ষমতার দাপটকে ইঙ্গিত করে, তেমনি সাদা রেখাগুলো সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে হঠাৎ প্রকাশ পাওয়া কোনো নীরব সত্যের মতো সামনে আসে। মানুষের ক্ষমতার দাপট, ভীতি ও নীরব সহিংসতার অন্ধকার দিক এখানে কোনো সরাসরি বর্ণনায় নয়, বরং রেখা, দাগ, শূন্যতা ও ঘনত্বের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
পুরো প্রর্দশনী হেঁটে দেখতে দেখতে মনে হয়, শিল্প যে কেবল গ্যালারির শোভা নয়, জীবনের রুক্ষ তলে দাঁড়িয়ে থাকা এক তীব্র অনুভূতিও হতে পারে। ‘লাইন-ফর্ম-ব্যালেন্স’ প্রর্দশনীটি সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় একজন দর্শককে। এখানে প্রতিটি কাজই আলাদা বিষয়কে ধারণ করলেও তাদের অন্তর্গত অনুসন্ধান এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। তা হলো শরীর, অস্তিত্ব, শ্রম, স্বাধীনতা, ভয় ও টিকে থাকার প্রশ্নে। তৌফিকুর রহমানের ভাস্কর্য তৈরির মূল উপাদান ধাতু তাই কেবল কাঠিন্য প্রকাশ করে,তা নয়,এর ভেতর রয়েছে অনুভূতির নমনীয়তা। আর তাঁর রেখা কেবল আকৃতি আঁকে না-তা মানুষের দৃশ্যমান শরীরের আড়ালে থাকা অদৃশ্য মানসিক ভূগোলেরও মানচিত্র তৈরি করে। তাঁর কাজে ধাতু কখনও শরীর, কখনও স্মৃতি, কখনও ক্ষত, আবার কখনও হয়ে উঠেছে অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এই ভাস্কর্য ও ড্রইং এর মিশেলে প্রদর্শনীটি গত ১১ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ০৫ অক্টোবর শেষ হয়।
- বিষয় :
- গল্প